এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

পর্ব : তিন

ভৃঙ্গারটি হাতে নিয়ে ভয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম টুল থেকে। আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সে এক এমন কাঁপন যাতে ভয় আর আনন্দ মিলেমিশে ছিল। আমি যেন এক আরামদায়ক দুঃস্বপ্নের মধ্যে থেকে লাফিয়ে উঠলাম।ভৃঙ্গারটি মাটিতে নামিয়ে রেখে দুই হাতে মাথাটা চেপে ধরে কত ঘন্টা না মিনিট বসে ছিলাম জানি না।সম্বিত ফিরলে নিজের ঘরে ফিরে গেলাম।আমার কাকা দরজা খুলে রেখেই চলে গিয়েছিলেন যেন মৃত মানুষের খোলা মুখ। সেই বৃদ্ধের কাংস‍্য হাসির শব্দ আমার কানে তখনও বাজছিল। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছিল আর হ্যারিকেন থেকে ধোঁয়া উঠছিল।এই ভয়ংকর ও সুখকর শিহরণ যা আমি অনুভব করেছিলাম তা যেন আর আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিলই না।এই মুহূর্ত থেকে আমার জীবনের গতিমুখ বদলে গেল।সমস্ত কিছু বদলে ফেলতে তার এক ঝলকই যথেষ্ট ছিল।সেই স্বর্গের পরী। সূক্ষ্মতম মেয়েটি অন্য যে কোন মানবীর তুলনায় আমাকে আরো গভীরে অনুধাবন করেছিল।
নিজের ওপর আমার আর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না।আমার মনে হচ্ছিল তার নাম যেন কতকালের চেনা।তার অশুভ দুটি চোখের সঙ্গে আমি বহু যুগের পরিচিত।রং গন্ধ গতি সবকিছুর সঙ্গে আমার আত্মা গতজন্মে অথবা কল্পনায় তার আত্মাকে জড়িয়ে নিয়েছিল এক অপূর্ব মিলিত সুগন্ধে। যা ছিল প্রকৃতই আমাদের ভবিতব্য। আমাকে অবধারিতভাবেই তার সাথে তন্নিষ্ঠ জীবন কাটাতে হত। তাকে বাহ্যিকভাবে স্পর্শ করার কোন অভিলাষ আমার ছিল না।আমাদের দুজনের শরীর নির্গত যে অদৃশ্য বিভা মিলেমিশে এক হয়ে যেত আমি তাতেই সন্তুষ্ট ছিলাম। এটা কি একপ্রকার অদ্ভুত চাওয়া নয়? যখন দুজন জন্মান্তরের পরিচিত মানুষ, যারা জানে যে পূর্বজন্মে তারা এক রহস্যময় সম্পর্কে ছিল। যা এখনো বিদ্যমান আছে। এই পার্থিব জগতে আমি তাকে কেবল ভালবাসতেই চেয়েছিলাম এবং কেবল তার ভালোবাসা পেতে।এটা কি আর কারোর সঙ্গে সম্ভব হতো? দুর্ভাগ্যবশত বৃদ্ধের সেই শুষ্ক বিভৎস অশুভ হাসি আমাদের সেই জন্মান্তরের বন্ধন ছিন্ন করে দিয়েছিল। এই চিন্তাটাই রাত ভোর আমার মাথায় ঘুরতে লাগলো। বহুবার আমি সেই ঘুলঘুলির দিকে দেখার কথা ভাবছিলাম কিন্তু বৃদ্ধের বিকট হাসির ভয়টা বাধা হয়ে দাঁড়ালো। পরেরদিন ওই একই চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগল। আমার কি তাকে দেখার চেষ্টা ত্যাগ করা উচিত?ঘটনাক্রমে পরের দিন আরো বেশি মাত্রায় ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে আমি সেই ভৃঙ্গারটি পুনরায় যথাস্থানে রেখে আসব স্থির করলাম। যে পর্দাটা আলমারির উপর ঢাকা ছিল সেটা সরাতেই দেখা গেল একটি অন্ধকার কালো প্রাচীর। যা শেষ পর্যন্ত আমার সারা জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম সেখানে কোন ঘুলঘুলিই নেই। আমি টুলের উপর উঠে দেয়ালটা পরীক্ষা করলাম।হাতের মুঠো পাকিয়ে ঘুসি মারলাম এবং কোন পার্থক্যই হলো না।আমি আলো নিয়ে দেয়ালটি পরীক্ষা করে দেখলাম,কোন প্রকার ঘুলঘুলির চিহ্ন মাত্র নেই সেখানে ।আমার ঘুষি হয়ত সেই প্রকান্ড দেয়ালের ওপর কিছু প্রভাব ফেলেছিল তাই সেটিকে এখন শীশার তৈরি বলে মনে হচ্ছিল।
আমি কি সবকিছু চিরতরে ভুলে যাব?কিকরে সম্ভব?সমস্তটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।আমার আত্মার পীড়ন চলছিল।যতই কেন না আমি তার জন‍্যে অপেক্ষা করি,আগলে রাখি অথবা খোঁজ করি।কোনো কিছুই আর হবার নয়।যেভাবে খুনি তার অপরাধের জায়গায় ফিরে ফিরে আসে অথবা একটা মুন্ডুহীন মুরগি ছটফট করে আমি সেভাবে আমার বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।একদিন দুদিন নয় বরং দু মাস চারদিন।

আমি আমার বাড়ির চারপাশে এতবার ঘুরেছি যে প্রতিটি পাথর নুড়ি আমার মুখস্ত হয়ে গিয়েছে।অথচ আমি সেই সাইপ্রাস গাছ অথবা সেই ছোট্ট নদী কিম্বা মানুষদুটির কোন চিহ্ন খুঁজে পাইনি। সারাটা রাত চাঁদের আলোয় মাঠে ঘোরাফেরা করেছি। কাঁদতে কাঁদতে এবং চিৎকার করে আমি গাছপালা এমনকি প্রতিটি পাথর কে জিজ্ঞেস করেছি তারা তাকে দেখেছে কিনা?কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। শেষে আমার মনে হল এই সমস্তই আসলে বৃথা। সে আদৌ এই জগতেরই ছিল না। যে জলে সে নিজের চুল ধুয়ে নিতো তার নিশ্চয়ই কোন অচেনা উৎস ছিল। হয়তো কোন জাদু গুহা। যে সুতোয় তার পরনের পোশাকটি বোনা হয়েছিল সেটিও খুব সাধারণ সুতো বা পশম ছিল না। অথবা কোন সাধারণ দর্জির হাতে তৈরি ও হয়নি। তার হাতের লিলিগুচ্ছও খুব সাধারণ কোন লিলি ছিল না।শেষমেশ আমি সিদ্ধান্তে এলাম সে যদি কোন সাধারণ জলে তার মুখ ধুতো তাহলে তার মুখ শুকিয়ে যেত। সে যদি তার লম্বা সুন্দর আঙুল দিয়ে কোন সাধারণ লিলি তুলে নিত তাহলে যেমন সাধারণ ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে ঝরে যায় সেভাবেই ঝরে যেত।সত‍্যিই আমি অনেক কিছু শিখলাম। সেই পরীটিকে এক অদ্ভুত অসাধারণ আশ্চর্যের উৎস হিসেবে জানলাম।সে আমার অভূতপূর্ব প্রেরণা হয়ে দাঁড়ালো। তার এই সূক্ষ্ম অতিন্দ্রীয় উপস্থিতি আমার কাছে সাধনা হয়ে উঠল। আমি যদি তাকে খুব সাধারণ একজন আগুন্তকের দৃষ্টিতে দেখতাম তাহলে তাকে আগোছালো এবং শুকনো বলেই মনে হতো। ঠিক যে সময় আমি তাকে হারিয়ে ফেললাম ঠিক যখন সেই বিশাল প্রাচীর, শক্ত, সোঁদা শীশার প্রাচীর আমাদের মধ‍্যে স্থিত হল। ঠিক তখন থেকেই আমার জীবন অর্থহীন এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। তার মধুর দৃষ্টির আনন্দস্মৃতি থাকা সত্বেও আমার কাছে এই পরিস্থিতির কোন ব‍্যাক্ষা ছিল না।আমি তাকে দেখলেও সে তো আমাকে দেখেনি।যাইহোক,প্রেরণা হিসেবে তার চোখ দুটির প্রয়োজন ছিল আমার।তার চোখের একটিমাত্র দৃকপাতই আমার মনের সমস্ত দার্শনিক যন্ত্রণা এবং আধ্যাত্মিক হেঁয়ালির অবসান ঘটাতে পারত। তার একটিমাত্র নজর।আর কোন রহস্য ও গোপনীয়তা বজায় থাকত না।সেই সময় থেকে আমি আরও বেশি করে মদ্যপান ও আফিম সেবন শুরু করলাম।
কিন্তু হায় এই সমস্ত অর্থহীন নিদান আমার ভাবনা চিন্তা করার ক্ষমতাকে অসাড় করে দিল। নিদান অর্থে,আমাকে তার ভাবনা ভুলিয়ে দেবে দিনের পর দিন,ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি মুহূর্তের পর মুহূর্ত।অথচ তার মুখ ও শরীর আমার ভাবনায় আরো দৃঢ় হয়ে বসল। এবং আরো বেশি অর্থব্যঞ্জক হয়ে উঠল।কেমন করে ভুলব? এমনকি যখন আমার চোখ খোলা থাকে অথবা বন্ধ।নিদ্রা অথবা জাগরণে সে আমার সামনে উপস্থিত থাকে আমার ঘরের আলমারির ভিতর থেকে যে ঘুলঘুলি আছে তার ছিদ্রের ভিতর দিয়ে আমার মন সেই অন্ধকার রাতেও অযৌক্তিকভাবে বাইরের মাঠে তাকেই দেখতে থাকে।

আমার বিশ্রাম নেওয়ার উপায় ছিল না। আমি কি করে বিশ্রাম নিতে পারতাম?বরং একটু বেশিক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস তৈরি করেছিলাম। সূর্যাস্তের সময় আমি যেন বাধ্য থাকতাম সেই নদীর জল সাইপ্রাস গাছ এবং লিলি ফুলগুলি খুঁজে বেড়াতে।রোজ ওই একই পথে হাঁটাহাঁটির নেশা ধরে গিয়েছিল। কোন একটা অদৃশ্য শক্তি আমাকে বাধ্য করত। সবসময় কেবল তারই কথা চিন্তা করতাম। তাকে প্রথম দেখার সেই দৃশ্য গুলি মনে করার চেষ্টা করতাম। চাইতাম সেই স্থান খুঁজে বার করতে যেখানে তাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম উৎসবের এয়োদশতম দিনে। যদি আমি সেই স্থানটি আবিষ্কার করতে পারতাম আর যদি সেই সাইপ্রাস গাছটির নিচে বসতে পারতাম তাহলে হয়তো আমার জীবনে একপ্রকার শান্তি আসতো কিন্তু হায় এখানে প্রত্যাখ্যান তপ্ত বালুকা, ঘোড়ার পাঁজর অস্থি ও সমস্ত আবর্জনার ওপর কুকুরের মত শুঁকে ফিরছিলাম।

আমি কি আদৌ তাকে দেখেছিলাম কখনো? একটা ছিদ্র দিয়ে তাকে গোপনে দেখেছিলাম! একটা দুর্ভাগ্য পীড়িত ছিদ্র যা আমার ঘরের আলমারির ভিতরেই ছিল। একটা ক্ষুধার্ত কুকুরের মতই ময়লার উপর ঘ্রাণ নিয়ে খাবার খুঁজে ফিরছিলাম আমি। মানুষ যখন আরও বেশি বেশি ময়লা ফেলছে তখন সে ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। লুকিয়ে পড়ছে। তারপর সে আবার বেরিয়ে আসছে তার পছন্দের জিনিস টুকু খুঁজে নেওয়ার জন্য। আমারও ঠিক সেরকম অবস্থা হয়েছিল।আমার জন্য সেই ছিদ্রটি যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার কাছে সে ছিল সমস্ত আবর্জনার ওপর ছুঁড়ে ফেলা
একটি তরতাজা ফুলের গুচ্ছ।

অন্যান্য দিনের মতোই গতকাল বিকেলেও আমি হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।সহসা অন্ধকার হয়ে এসেছিল যেন এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে। ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল চারিদিক। এমন বৃষ্টি বাদলায় যে কোনো বস্তুরই রংয়ের তীব্রতা কমে আসে। যে কোন বস্তুর তীক্ষ্ণ রেখা গুলো ভোঁতা হয়ে যায়।আমি কেমন যেন একটা স্বাধীনতা আর আরাম অনুভব করলাম। যেন বৃষ্টির ফোঁটা গুলো আমার কালো ভাবনা গুলোকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবে এই রাতে।।

( চলবে )

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »

Privious Cover Stories

দুটি কবিতা 

অভিরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক যুদ্ধ কবে ফুরোবে জানা নেই,তবু চাঁদ আকাশে—অথবা নিকষ কালোয় তারা খসা। বারুদ, রক্ত, অভিশাপ বা চিতার আগুন—নেভার খবর না এলেওকখনও স্নিগ্ধতার ছায়ার

Read More »

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত  তৃতীয় পর্ব  মিতা রান্নাঘরেই ছিল।  দিপালীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ার পর থেকেই তার নিজের ভেতরটা খুব খারাপ লাগছিল। টেনশনও হচ্ছিল ভীষণ। সত্যিই সত্যিই যদি

Read More »