অভিজিৎচৌধুরী
অভিজিৎ চৌধুরী
সত্তরের দশকের আগুন সম্পূর্ণ নিভে না গেলেও তখন প্রায় মৃত্যুর মুখে সেই ফিনিক্স পাখি। যমুনাবতীরা একের পর এক সেলে পুলিশি অত্যাচারের শিকার—হয় ধর্ষিতা হচ্ছেন, নয়তো চিরকালীন পঙ্গুত্ব লাভ করছেন। কলকাতার জনপথে যুবকদের লাশের পাহাড়ের স্মৃতি নাগরিক জনজোয়ারে মুছে গেছে। ভিস্তিওয়ালাদের নিপুণ জলসিঞ্চনে মুছে গেছে রক্তের যাবতীয় দাগ।
এই সময় শতাব্দী প্রাচীন বুড়ো রাইটার্স বিল্ডিং-এরও পিতামহ—বোর্ড অব রেভিনিউ—বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচুর কানুনগো নেওয়ার জন্য আবেদনের প্রঘোষণ দিলেন। নতুন করে জমি জরিপ হবে গোটা পশ্চিমবঙ্গে। তার নাম—ল্যান্ড রিফর্মস সার্ভে।
নতুন করে স্লোগান তখনও জোরদার হয়নি—“লাঙল যার, জমি তার।” জোতদারদের উচ্ছেদ করতে গিয়ে নিজেরাই মুছে গেলেন যাঁরা নাকি আনতে চেয়েছিলেন সাম্য সমাজব্যবস্থা। তাঁদের বজ্রনির্ঘোষ অচিরেই কালবেলার ধ্বংসস্তূপে ঠাঁই নিল—হঠকারী ও অপরিণামদর্শী আন্দোলনের সমার্থক হয়ে।
সীমাহীন বেকারত্ব ও দারিদ্র্য, শোষণ, বঞ্চনা আর দুর্নীতি গ্রাস করছিল বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ নামের রাজ্যটিকে। এদিকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। শরণার্থী যাঁরা এসেছিলেন, কেউ কেউ নতুন স্বাধীন দেশে ফিরে গেছেন, আবার কেউ থেকে গেছেন—যেখানে একদিন এসেছিলেন।
ভারত ছিল সেই নতুন বাংলাদেশের একরকমের জনক। তাই কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের মাঝে থাকলেও তা ছিল তুলনামূলক নমনীয়। আসা-যাওয়া অনর্গল চলেছে—এ যেন কোনও পাখির ভূগোল না মেনে দু’দেশের আকাশ এক করে উড়ে যাওয়া।
ন্যূনতম হাজারখানেক কানুনগো ছড়িয়ে পড়লেন প্রান্তরে প্রান্তরে। তাঁদের বলা যায় মেঠো আধিকারিক। এক জায়গায় স্থায়িত্ব কম, তাই অস্থায়ী ক্যাম্প—হালকা ক্যাম্প। কয়েকটি হালকা ক্যাম্প মিলেই একটি সার্কেল অফিস। সার্কেল অফিসগুলি থানাভিত্তিক, আর হালকা ক্যাম্পের ঠিকানা ভারী অস্থায়ী।
আধিকারিক নাম হলেও তাঁদের অবস্থা করুণ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঝড়ে উথাল-পাথাল হতে হতে অনেককেই আর চেনা যায় না। তার উপর সার্কেল অফিস বা চার্জ অফিসের চোখরাঙানি। আর তারও ওপরে ছিলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবির মতো এক জন সেটেলমেন্ট অফিসার। তাঁর হুংকারে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল পান করে।
একদল তরুণ কানুনগো এলেন উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসীকাটা মৌজায়। সন্ন্যাসীকাটায় একসময় ইতিহাসের আখর লেগেছিল। কখনও মুসলিম শাসক, কখনও ব্রিটিশদের সঙ্গে অসম লড়াই—সন্ন্যাসীদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের নানা সত্য-মিথ্যে গল্প আজও এই মৌজার মাঠঘাটে বেঁচে আছে।
আরও এক গল্প রয়েছে এক জন মানুষকে ঘিরে—তাঁর ঐতিহাসিক নাম, টোডরমল। কে এই টোডরমল? তিনি কি কোনও আধিকারিক, না কোনও সার্ভেয়ার? সঠিকভাবে কেউ জানে না। তবে ভূমি জরিপে তিনি এক জন ফাদার ফিগার।
সেই টোডরমল আসছেন সন্ন্যাসীকাটা মৌজায়। তিনি বলবেন জরিপের নানান কথা। তিনি নাকি খরাকেও বদলে দিতে পারেন রূপকথায়। নদী, বৃষ্টি আর কর্ষণের প্রবহমান সৃজনে তিনি এক আত্মমগ্ন মানুষ।
এক জন খ্যাংরা চেহারার মানুষ—মাথায় টুপি, খচ্চরের পিঠে চেপে। তাঁর সামনে মাঠে বসে রয়েছেন কয়েক জন যুবক। এঁদের বলা হয় কানুনগো আধিকারিক। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁরা এসেছেন।
কলকাতা জুড়ে নকশাল আন্দোলনের দামামা তখনও থাকলেও অনেকটাই স্তিমিত। মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে খানাপুরি বুজারত। কানুনগোদের সঙ্গে রয়েছেন কয়েক জন আমিন ও এক জন চেন পিয়ন। মাঠে ফসল থাকায় খুব সাবধানে লোহার শিকলের মতো চেইন ফেলা হচ্ছে।
আজ যিনি ফিল্ড ট্রেনিং দেবেন, তাঁকেই উত্তরবঙ্গে ডাকা হয়—টোডরমল। আকবরবাদশার টোডরমলের পর যেন আর এক টোডরমল।
খতিয়ান খোলা রয়েছে টিনের ফোল্ডিং টেবিলে। একটি টিনের চেয়ার—বেশ নড়বড়ে। মাঠে বসে রয়েছেন প্রশিক্ষণ নিতে আসা যুবক আধিকারিকেরা।
“সি এস কী, তোমরা জানো?”
টোডরমল বললেন।
সবাই চুপ। ভোর থেকে মাঠে থাকতে হয়েছে। মাথার উপর রোদ আগুন ছড়াচ্ছে।
“ক্যাডাস্টাল সার্ভে,” এক জন উত্তর দিল।
টোডরমল খুশি হলেন।
“সালটা বলা যাবে?”
“স্বাধীনতার আগে।”
“ঠিক। কিন্তু সাল কত?”
নীরবতা।
“ইন-সার্ভিস ট্রেনিং—পাশ করতেই হবে,” বললেন টোডরমল।
“১৯৩৪,” এক জন বলল।
“বাহ! তারপর?”
“কুড়ি বছর পর—১৯৫৪,” সমীর বসু বলল।
“আমরা এখন ১৯৭৪-এ,” টোডরমল বললেন। “শুরু হল এল আর সার্ভে। তোমরা করবে খানাপুরি বুজারত।”
“যাকে জমিতে যেমন পাব, সবুজ কালিতে নাম লিখব,” সমীর বলল।
“হ্যাঁ।”
“অনেকে তারকাঁটা পেরিয়ে ঢুকছে,” স্বপন বলল।
“অনুপ্রবেশকারী,” টোডরমল হেসে বললেন। “দালালকে টাকা দিয়ে।”
“এক দিন জনবিন্যাস বদলাবে,” স্বপন বলল।
“বিদেশি সাহেব একটা লাইন টেনে দিলেন—দুটো দেশ ভাগ হয়ে গেল,” টোডরমল বললেন।
ব্যথার ছবি ফুটে উঠল তাঁর মুখে।
“স্যার, এটা তো আপনার আসল নাম নয়,” সমীর বলল।
“আসল-নকল সব মিশে গেছে,” তিনি বললেন।
“এই জনপদের আদিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত,” স্বপন বলল।
“এই ক্ষত এক দিন ভারতের সেকুলারিজমকেও গ্রাস করবে।”
সেদিন মাঠে বসে সবাই একসঙ্গে খেয়েছিল। এনামেলের থালায় মোটা চালের ভাত আর মাগুর মাছের ঝোল। হেড আমিন হোসেন সাহেব রান্না করেছিলেন—তিনিও তো ওপার থেকে এসেছিলেন।
ক্রমে সবাই মিশে গেল। আর টোডরমল—তিনি হিন্দু, মুসলিম, পার্সি না বৌদ্ধ—কেউ জানল না। তিনি হয়ে রইলেন ভারতবর্ষের বহুত্ববাদের ইতিহাস।
হালকা ক্যাম্পে ভোর হয়। টোডরমল আবার আসেন। খরা হোক বা বালুভূমি—তিনি হাত লাগান। ভালোবেসে তৈরি হয় ল্যান্ড রিফর্মস সার্ভের খতিয়ান। সবুজ কালিতে লেখা হয় নাম।
এক দিন হয়তো সূর্যোদয় হয়—
“লাঙল যার, জমি তার।”
কিন্তু তত দিনে টোডরমল আর দেখা দেন না। শুধু মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে রূপকথা—গরিব, সর্বহারাদের জয়ের রূপকথা।


