কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
পর্ব:দুই
ঘুলঘুলি দিয়ে দেখলাম, মাথায় পাগড়ী বাঁধা একজন ভারতীয় যোগী উবু হয়ে বসে আছেন। তাঁর বাঁ হাতের তর্জনীটি খানিকটা আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গিতে ঠোটের উপর ন্যস্ত রয়েছে। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বালিকা যার অঙ্গে দীর্ঘ কালো পোশাক। বালিকাটি সামনের দিকে একটু ঝুঁকে একটি কালো লিলি অর্পণ করছে।তাকে নিচু হতেই হতো কারণ তাদের দুজনের মাঝখানে একটি ক্ষীণ তোয়া নদী বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার মনে হল আমি কি এই দৃশ্যটা আগে কখনো কোথাও দেখেছি? অথবা এই ছবিটা আমার স্বপ্নের ভেতর থেকে আমাকে প্রানিত করছে! আমি কোন কিছুই ঠিক মতো বলতে পারব না শুধু জানি এই দৃশ্যটি আমার ছবির মূল বিষয় হয়ে উঠল। আমার হাত নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে এই ছবিটি এঁকে চলল! সবথেকে আশ্চর্যের বিষয়,ক্রেতাদের মধ্যে এই ছবিটির বেশ চাহিদা ছিল।আমি নিয়ম করে ভারতে আমার কাকার কাছে এই ছবি পাঠাতাম।তিনি ছবিগুলি বিক্রি করে টাকা পাঠিয়ে দিতেন আমাকে।
আজ আর ঠিকমতো মনে নেই ছবিটা কখন কিভাবে আমার মনে এসেছিল!শুধু একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে।তা আমাকে লিখতেই হবে।যদিও লেখা সংক্রান্ত নোটগুলি আরো অনেক পরে নেওয়া।এমনকি এগুলি সরাসরিভাবে বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিতও নয়।
তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই,যে আমি কলমের খাপের উপর ছবি আঁকা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলাম।ফলত: আমার সমস্ত সময়টা লেখার কাজে নিয়োগ করা গিয়েছিল। দুমাস আগে, না না! দু মাস চারদিন আগে।সেদিন ছিল নতুন বছরের প্রথম দিন।পরিবারের সকলে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। নির্ঝঞ্ঝাটে ছবি আঁকবো বলে আমি জানলা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সূর্যাস্তের সময় যখন ছবি আঁকায় বুঁদ হয়ে আছি হঠাৎ আমার কাকা দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। কেবল এইটুকুই জানাতে,যে তিনি আমার কাকা! আমি তাকে আগে কখনো দেখিনি।তিনি বেশ কম বয়সেই দূরে কোথাও চলে গিয়েছিলেন। অল্প দিনের জন্য তিনি জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবেও কাজ করেছিলেন।আমি ভাবলাম তিনি বোধহয় আমাকে সঙ্গে নিয়ে কোন বড় ধরনের ব্যবসা করার পরিকল্পনা করছেন।কারণ তিনি জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়া ছাড়াও একই সঙ্গে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি চেহারায় একজন ন্যুব্জ দেহ বৃদ্ধ। ভারতীয় সাধুদের মতো একটি হলুদ রঙের পাগড়ী বেঁধেছিলেন মাথায়।গায়ে জড়ানো ছিল একটি ছেঁড়া চাদর এবং একটি ছেঁড়া উত্তরীয় দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন নিজের মুখ ও ঘাড়। পাতলা কাপড়ের ভেতর দিয়ে তার মুখের দাড়ির রোমগুলি পর্যন্ত গোনা যাচ্ছিল। খোলা কলারের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল তাঁর রোমশ বুক। তার সরু লালচে চোখের পাতা এবং কুষ্ঠরোগগ্রস্থগ্রস্ত ঠোঁট হাস্যকর ভাবেই আমার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ! তাকে দেখে আমি আমার বাবাকেও কল্পনা করতে পারলাম। তিনি যেন কোন মায়া-মুকুরে প্রতিফলিত আমারই প্রতিবিম্ব ।
তিনি ঘরের এক কোণে উবু হয়ে বসলেন। আমার কেন জানি মনে হল তার জন্য কিছু তৈরি করে আনা দরকার। আমি আলো জ্বেলে রান্নাঘরের মিটকেস খুললাম। তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম কোন বৃদ্ধকে দেওয়ার মতো কোনো খাবার আছে কিনা সেখানে। যদিও আমি ভালো করেই জানতাম সেখানে আদৌ কিছু নেই।কারণ সমস্ত আফিম এবং মদ আমি ইতিমধ্যেই খেয়ে শেষ করে ফেলেছিলাম। হঠাৎ ছাদের নিচে একটি কুলুঙ্গি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।সেখানে রাখা ছিল পারিবারিক সূত্রে পাওয়া একটি ভৃঙ্গার।ভৃঙ্গারের মধ্যে যে মদটি রাখা ছিল সেটি আমার জন্মদিনের দিন প্রস্তুত করা হয়েছিল। ভৃঙ্গারটি কুলুঙ্গিতেই রাখা ছিল এতগুলো বছর ধরে। কিন্তু আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম সেটির কথা। সেটি পাড়ার জন্য একটি টুলে উঠতেই ঘুলঘুলির ছিদ্র দিয়ে যে দৃশ্যটি আমার চোখে পড়ল সেটি খানিকটা এরকম,
আমার ঘরের পিছনের মাঠে একটি সাইপ্রাস গাছের নিচে উবু হয়ে ঝুঁকে বসে আছেন এক ন্যুব্জদেহ বৃদ্ধ।এক নব্য যুবতী, না না বরং বলা ভাল স্বর্গের পরী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।সে সামনে ঝুঁকে তার ডান হাতে একটি কলো লিলি ধরে রয়েছে বৃদ্ধকে অর্পণ করার উদ্দেশ্যে।বৃদ্ধ মানুষটি নিজের বাম হস্তের তর্জনিটি চিবোচ্ছিলেন। মেয়েটি আমার বিপরীতেই দাঁড়িয়ে ছিল এবং তার পারিপার্শ্ব সম্পর্কে একেবারেই বেখেয়াল ছিল। সে দেখছিল কিন্তু কিছুই লক্ষ্য করছিল না।এক চিলতে অসতর্ক অনভিপ্রেত হাসি শুকিয়ে পড়ে ছিল তার ঠোঁটের কোণায়।যেন সে এমন একজনের কথা ভাবছে যে এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত নেই।আমি সেই টুলের ওপর চড়েই তার মারাত্মক কুহকী চোখদুটি দেখছিলাম।একইসঙ্গে সেটা ছিল মন্ত্রমুগ্ধকর ও ভর্ৎসনাকারী।তার উদ্বিগ্ন বিপদসঙ্কুল আমন্ত্রণী চোখের উজ্বল মণি দুটিই হয়ে উঠেছিল আমার জীবনের একমাত্র আলোক টান।সেই অতলান্ত চোখের গভীরে আমার জীবন ডুবে গেল।বিলুপ্ত হল।সেই মায়ামুকুর অভাবনীয়রূপে আমার সবটুকু গ্রাস করে নিল।তার মাদকতাময় আলোময়ী তুর্কমেনীয় বাঁকা চোখ দুটি আমায় একইসঙ্গে আকৃষ্ট ও সন্ত্রস্ত করে তুলল।
সে যেন তার চোখ দুটি দিয়ে সমস্ত কিছুর সাক্ষী হয়ে থাকছিল।যেন সে এমন অতিলৌকিক কিছু যেখছে যা এই মরপৃথিবীর কেউই দেখতে পায় না।তার মুখের উচ্চ হনু এবং প্রসস্ত ললাট এবং সরু জোড়াভুরু, ঈষৎ খোলা পুরু ঠোঁট যেন এইমাত্র কোনো অসম্পূর্ণ দীর্ঘ উষ্ণ চুম্বন ভেঙে অতৃপ্ত উঠে এসেছে!রুপোলি ঝকঝকে মুখমন্ডল ঘিরে ছড়িয়ে আছে এলোমেলো কালো চুলের গোছা।তারই কিছুটা কপালে আটকে রয়েছে।তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নমনীয়তা!তার উদাসীন সূক্ষ্ম স্বর্গীয় সঞ্চারণা!তার ছন্দবদ্ধ চলন কেবলমাত্র ভারতীয় মন্দিরের নৃত্যপটিয়সীদের সঙ্গেই তুলনীয়।
প্রশান্ত রূপ এবং বিষন্ন-আনন্দ তাকে সাধারণের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।তার সৌন্দর্য মোটেই সাধারণ ছিল না।আমার কাছে সেটা খানিকটা আফিম সেবনের ধুমকিতে আসা ছবির মত যা আমার মধ্যে ম্যান্দ্রেকের সকাম প্রেমের উদ্রেক করত।তার গড়নটি ছিল দীর্ঘ ও দোহারা।যেন একটি সমান্তরাল রেখাতার কাঁধ বাহু স্তন শ্রোণী ও পা বরাবর সুসমরূপে ভাগ করেছে।সে যেন প্রিয়তম হতে বিচ্ছিন্ন লেডি ম্যান্ড্রেক ।
তার পরণে ছিল একটি আঁটোসাটো কোঁচকানো কালো পোশাক।আমি যখন তাকে দেখেছি তখন সে সরু নদীটি পার হওয়ার জন্যে লাফ দিয়ে ছিল যা তাকে বৃদ্ধ মানুষটির থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।বিফল হতেই বৃদ্ধ মানুষটি অট্টহাস্য করে উঠল।লোকটা বীভৎস শুষ্ক হাসি হাসছিল।লোকটার জান্তব বিদূপকারী হাসির শব্দে যেকোনো মানুষের লোম খাড়া হয়ে যেত।কারণ তার মুখের ভাব পরিবর্তন না হলেও সেই হাসির অনুরণন সৃষ্টি হচ্ছিল নাভি গহ্বর থেকে।


