(The Blind Owl)
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
পর্ব এক
মুখগহ্বরের গোপন ক্ষতের মতই এমন কিছু ক্ষত থাকে মানুষের জীবনে যা তার আত্মাকে কুরেকুরে খেয়ে ক্লিষ্ট করে।এই অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখাই দস্তুর।এগুলি নিয়ে কারোর সঙ্গে কথা বলাও সম্ভব হয় না।আর যদি কেউ এই বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলে অথবা লেখে তাহলে তাকে ব্যাঙ্গ করা হয় নয়ত ঠোঁটে খানিকটা সন্দিগ্ধ হাসি ঝুলিয়ে মেনে নেবার ভান করা হয়।বাস্তবে এই যন্ত্রণার কোনো নিদান নেই।একমাত্র পরিত্রাণ হয়ত মদের নেশায় চুর হয়ে ভুলে থাকা অথবা আফিম জাতীয় কোনো মাদক সেবন করে গভীর নিদ্রায় ডুবে থাকা।ভুলে থাকার বিষয়টা সাময়িক কারণ কিছুক্ষণ পরেই তা আরামের পরিবর্তে যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে তোলে।হয়ত কোনোদিন এমনও হতে পারে,কেউ হয়ত অলৌকিকভাবে সব রহস্য ভেদ করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ চিনতে পারল।যা ঘুম ও জাগরণের মাঝে সুষুপ্তির মত নিজেকে প্রকাশ করে।
আমি এখানে আমার ব্যক্তিগত অনুভবের কথা বলব যা আমাকে ভেতর থেকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।যা আমি কখনোই ভুলতে পারব না।সেই ঘটনার অশুভ নিশান আমার জীবনের আদ্যন্ত বিষিয়ে দিয়েছে।সেই বিষের প্রকৃতি কেউই বুঝবে না।তবু যেটুকু স্মরণে আছে সেটুকু লেখার চেষ্টা করব।ঘটনা ও তাদের নিহিত আন্ত:সম্পর্ক আমার স্মৃতিতে বেঁচে আছে।এভাবেই এর অর্থ অন্বেষণ করব।যা আমায় ক্ষত বিক্ষত করে ছিল।বাকি জীবন যা আমার নৈতিকতার ওপর কালো ছায়া বিস্তার করেছে।
আমি চেষ্টা করব যেটুকু স্মরণ করতে পারি তার সবটুকুই লিখে ফেলতে।সেই ঘটনা এবং তার অন্তর্নিহিত অবশেষ যা আমার স্মৃতির ভিতর অবশিষ্ট আছে।হয়ত লিখতে গিয়ে এর কিছু অর্থও নিষ্কাসিত হবে।নাহ্ আমি নিশ্চিত হতে চাই।আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করতে চাই।আমাকে কেউ বিশ্বাস করলো কিনা সেটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক।ভয় হয় পাছে নিজেকে না জেনেই মরে যাই কাল! আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি কিভাবে একটা ভয়ংকর ফাটল আমাকে সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।সেই অভিজ্ঞতা একইসঙ্গে আমাকে নিজের সমস্ত ভাবনাকে নিজের মধ্যে চেপে রেখে মৌন হতে শিখিয়েছে।আমি ঠিক করেছি আমি লিখব যা আমাকে আমার ছায়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে।দেয়ালের ওপর সেই ঝুঁকেপড়া ছায়াখানি যা সর্বভূখের মত আমার সমস্ত সত্তাকে গিলে ফেলছে।আমি তারজন্যেই এই পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি যাতে পরস্পরকে জানতে পারি।একটা সময় পর্যন্ত আমি সকলের সঙ্গে শক্তভাবে বাঁধা পড়েছিলাম।আদপে আমি নিজেকেই জানতে চাই।
অবাস্তব চিন্তাভাবনা!বেশ তো।এখনো পর্যন্ত বাস্তবের থেকে বরং এই চিন্তা ভাবনাগুলোই আমাকে বেশি যাতনা দিচ্ছে।
যে সব লোকেরা আমার মত।প্রয়োজনগুলিও এক আর বাতিকগুলিও।তাদের আকাঙ্খাগুলি আমাকে প্রতারণা করার জন্যেই কি একত্রিত হয়েছে?আমার অনুভূতি পর্যবেক্ষণ ও হিসেব কাল্পনিক এবং বাস্তব থেকে আলাদা নয় কি?আমি কেবল দেয়ারের ওপর আমার আপতিত ছায়ার মঘ্গলের জন্যই লিখব।আমি নিজেকে তার সঙ্গে পরিচিত করাতে চাই।
আমার ধারণা ছিল এই মরজগতে দারিদ্র ও যন্ত্রণা ছাড়া যেন আর কিছু নেই।সেই প্রথমবার আমার জীবনের ওপর রোদ্দুর এসে পড়ল।কিন্তু হায় সে তো সূর্যরশ্মি নয় যেন কোনো উল্কা নির্গত ক্ষণপ্রভা।একটি নারী অথবা পরীর রূপে সে যেন আকাশ থেকে খসে পড়া এক তারা।সে ছিল মুহূর্তের ঝলক।সেই আলোয় আমি আমার আজন্মের দুর্ভাগ্যকে দেখতে পেয়ে ছিলাম।আবিষ্কার করেছিলাম তার বিপুলতা ও আড়ম্বর।তারপরেই সেই আলোকরশ্মি হারিয়ে গিয়েছিল নিয়তির অতল অন্ধকারে।নাহ্ আমি সেই ক্ষণপ্রভাকে নিজের জীবনে ধরে রাখতে পারিনি।
তিন মাস।না না দু মাস চার দিন আগে আমি তাকে হারিয়ে ফেললাম!তার কুহকী চোখের মায়া অথবা আকর্ষণ আমার অবশিষ্ট জীবনের সাথী হয়ে গেল।কেমন করেইবা আমি তাকে ভুলব যে আমার জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে গিয়েছে ?
নাহ্!আমি তার নাম ধরে ডাকব না।সেই অতীন্দ্রিয় তন্বী রহস্যময় শরীর আর সেই অসামান্য দ্যুতিময় দুটি চোখ নিচে আমার জীবন ধীরে ধীরে যাতনায় জ্বলে এবং গলে গিয়েছিল।এখন সে আর এই মরপৃথিবীর কেউ নয়।আমি তার নাম কলুষিত করব না।তাকে দেখার পর আমি আমার চারপাশের লোকেদের সঙ্গ ত্যাগ করেছিলাম। সৌভাগ্যবান বোকাদের সঙ্গ পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলাম আমি।তাকে ভুলে থাকার জন্যে মদ ও আফিমের আশ্রয় নিয়েছিলাম।নিজেকে বন্দি করেছিলাম চার দেয়ালের অন্তরালে।আমি আমার প্রতিদিনের কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম কলমের খাপের ওপর ছবি আঁকা।আমার সমস্ত সময় কাটত এই কাজ আর মদ ও আফিম সেবনে। আমি এই হাস্যকর পেশা বেছে নিয়েছিলাম নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে ও সময়টাকে কোনো ভাবে কাটিয়ে দিতে।
সৌভাগ্যবসত আমার বাড়িটি শহরের বাইরে, এক নিঃস্তব্ধ ও শান্ত জায়গায়।মানুষের কোলাহল থেকে দূরে। উঁচু পাঁচিল ও চারিপাশে ধ্বংসস্তুপ ছড়ানো।এখানে থেকে নিকটবর্তী পরিখা পর্যন্ত কিছু নিচু কাদা-ইটের ঘর রয়েছে।শহর শুরু হয়েছে সেই পরিখার ওপারে। আমি ভাবি, কোন পাগল, বা কোন দুষ্ট স্থপতি বহু আগেকার দিনে এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন! আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন আমি চোখ বন্ধ করি, এর প্রতিটি কোণাকাঞ্চি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আর আমি অনুভব করি যেন বাড়িটা যেন আমার কাঁধের ওপর বোঝা হয়ে আছে। এই সেই বাড়ি, যেটি কোনো প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক কলমের গায়ে এঁকে রাখা যেত।
আমাকে এই সমস্ত ঘটনাগুলি লিখে রাখতে হবে।এগুলো যে কোনো প্রকার কল্পনার ফসল নয় সে বিষয়ে নিজেকে নিশ্চিত করতে হবে।নিজের ছায়ার কাছে সমস্ত কিছু বিবৃত করতে হবে আমাকে। শুরুটা হবে ঘটনার পূর্ব থেকে। এর মধ্যে কেবল একটিই বিষয় আমাকে আনন্দ দিয়েছিল, যে আমি কলমের খাপের উপর নকশা আকতাম এবং আনন্দ পেতাম। তাকে দেখার পর, তার সেই চোখ দুটি দেখার পর আমার সমস্ত কাজ তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ, মূল্য ও উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে।
অদ্ভুতভাবে, শুরু থেকেই, কোনো এক কারণে, আমার আঁকা সব দৃশ্যের ভাব ও গঠন একই রকম ছিল। আমি আঁকতাম,একটি সরু চিরসবুজ সাইপ্রাস গাছ, যার নীচে একজন বৃদ্ধ কাঁধ ঝুঁকিয়ে, গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে আছেন যেন তিনি কোনো ভারতীয় যোগী… (চলবে)


