তৃষ্ণা বসাক
প্রথম পর্ব
শুরু থেকে শুরু
১৯৭৬ সালে সাহিত্য আর অনুবাদের ওপর একটি আলোচনাচক্র হয়, দু বছর পরে ১৯৭৮ সালে যখন সেই বক্তব্যগুলো একত্র করা হচ্ছিল, তখন তার পরিশিষ্টে আন্দ্রে লেফেভার একটা প্রস্তাব দিলেন। এই যে নতুন একটা বিদ্যায়তনিক শাখা তৈরি হচ্ছে, যা অনুবাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে, পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে চায়, , তার নাম দেওয়া হোক অনুবাদ চর্চা, ট্রান্সলেশন স্টাডিজ।
যদিও এর চিন্তাভাবনা শুরু অনেক আগে। ১৭৯১ সালে আলেক্সান্ডার টাইটালার একটি নিবন্ধ লেখেন যার নাম ‘এসে অন দা প্রিন্সিপলস অব ট্রান্সলেশন’
এখন অনুবাদ কী? খুব গোদাভাবে বললে অনুবাদ হচ্ছে একটা ভাষার টেক্সট অন্য ভাষায় নিয়ে যাওয়া। যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে তাকে বলা হয় সোর্স ল্যাঙ্গয়েজ বা উৎস ভাষা। আর যে ভাষায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাকে বলা হয় টার্গেট ল্যাঙ্গয়েজ বা লক্ষ্য ভাষা। যদি একটি ভাষা থেকে আর একটি ভাষায় সরাসরি অনুবাদ করা হয়, মাঝখানে অন্য কোন ভাষার অস্তিত্ব না থাকে, তবে এই সোর্স আর টার্গেট নিয়েই আমাদের কাজ চলে যাবে। কিন্তু আমাদের অনুবাদ চর্চার অনেকখানি এখনো তৃতীয় আর একটি ভাষার ওপর নির্ভরশীল, যাকে বলা হচ্ছে লিংক ল্যাঙ্গোয়েজ বা সংযোগকারী ভাষা। একটু পরিষ্কার করে বলা যাক। ধরা যাক একজন একটি ফরাসি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করছেন, কিন্তু তিনি ফরাসি জানেন না, তিনি অনুবাদ করছেন কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ থেকে। এ ক্ষেত্রে সোর্স ল্যাঙ্গয়েজ ফরাসি, টার্গেট ল্যাঙ্গোয়েজ বাংলা আর লিংক ল্যাঙ্গোয়েজ কিন্তু ইংরেজি। অর্থাৎ মূল টেক্সট ফরাসিতে থাকলেও তাকে অনুবাদ করা হচ্ছে লিংক ল্যাঙ্গোয়েজ ইংরেজির মাধ্যমে। আমরা যত বিশ্বজোড়া অনুবাদ অভ্যাসের মধ্যে ঢুকব, তত দেখব যে লিংক ল্যাঙ্গোয়েজ হিসেবে ইংরেজির গুরুত্ব অপরিসীম।
এখন উৎস ভাষা থেকে লক্ষ্য ভাষায় অনুবাদের সময় দুটি জিনিস খেয়াল রাখতে হয়-
১- দুটি ভাষার সারফেস মিনিং মানে উপরিভাগের মানে যেন এক থাকে।
২- উৎস ভাষার কাঠামো যেন যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, এতে করে আবার লক্ষ্য ভাষার কাঠামো যেন বিকৃত না হয়ে যায়। অর্থাৎ দুটি ভাষার কাঠামোর স্বাতন্ত্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটা অপ্টিমাম ব্যালেন্স দরকার। আর সেজন্য অনুবাদককে যা করতে হয়, তা হচ্ছে সমঝোতা। এই কারণেই বলা হয় ট্রান্সলেশন ইজ নাথিং বাট নেগোশিয়েশন অর্থাৎ অনুবাদ মানেই হচ্ছে সমঝোতা।
all translation is a compromise – the effort to be literal and the effort to be idiomatic’.
উৎস ভাষা থেকে লক্ষ্য ভাষায় নিয়ে আসাটা ঠিক কেমনভাবে হবে, তা খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন প্রখ্যাত হিন্দি কবি অনামিকা। তিনি বলেছেন একটি ভাষা থেকে অন্য ভাষায় টেক্সট নিয়ে আসা অনেকটা বিয়ের পর বাপেরবাড়ি থেকে মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি আসার মতো। আর অনুবাদকের কাজ এখানে আদর্শ শাশুড়িমায়ের মতো। শাশুড়ি যেমন সাদরে নতুন বউকে ঘরে ডেকে নেন, তাকে আপন করে নেন, তাকে সহজ হতে সাহায্য করেন, তার ফেলে আসা সংস্কৃতিকে অসম্মান না করেই তাকে নতুন রীতিনীতিতে অভ্যস্ত করে তোলেন, অনুবাদকও তেমনি ভিন ভাষার সাহিত্যকে নিজের ভাষায় নিয়ে আসেন অন্য ভাষাটিকে অমর্যাদা না করে, আবার নিজের ভাষার বৈশিষ্ট্যও বজায় রেখে। এ এক চমৎকার রসায়ন। শুধু তাই নয়, এ এক কঠিন সাধনাও বটে। ক্ষুরস্য ধারা। একেবারে দড়ির ওপর দিয়ে চলা।
চারপাশ থেকে এর উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরা যাক, পুরনো একটি বাড়ি আছে, লাগোয়া বাগান। সেখানে গাছপালা তেমন কিছু পরিকল্পনা করে লাগানো হয়নি, যেমন ইচ্ছে গড়ে উঠেছে। যেন প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া বাগান। হঠাৎ সরকারের মতি হল জায়গাটির সৌন্দর্যায়ন করবে, ঘাস ছেঁটে, শুখনো পাতা ঝাঁটিয়ে, বেঁটে গাছকে কেটে ছেঁটে হাতি ঘোড়ার রূপ দিয়ে, বসার অনেক বেঞ্চ পাতা হল, কৃত্রিম ঝরনা লাগানো হল। কিন্তু জায়গাটি নিজস্ব চরিত্র হারিয়ে ফেলল। অনুবাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই। সুন্দর অনুবাদ করতে গিয়ে যেন মূলের চরিত্রটি হারিয়ে না যায়, আবার অতিরিক্ত মূল অনুসারী করতে গিয়ে লক্ষ্য ভাষাটিও যেন কৃত্রিম হয়ে না পড়ে। এরকম আমরা অনেক দেখেছি। খুব সুন্দর অনুবাদ, কিন্তু স্বয়ং লেখক অভিযোগ করেছেন মূল থেকে সরে এসেছে। আবার মূলকে অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময়েই মূলের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। এই কারণেই ইতালীয় প্রাচীন প্রবাদে বলছে “Traduttore, traditore” (The translator is a traitor.)
পাঠককে মনে করিয়ে দিচ্ছি এখানে অনুবাদ বলতে শুধু সাহিত্যের অনুবাদের কথাই উঠে আসবে না, সমান গুরুত্বপূর্ণ অ-সাহিত্য বা নন ফিকশনের অনুবাদও। হয়তো গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ সেখানে একটি মাত্র অনুবাদের ভুলে বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে, প্রাণ সংশয় হতে পারে। কোন গ্যাজেটের ম্যানুয়ালে যদি তার কার্যপ্রণালীর অনুবাদে ভুল থাকে, তবে সে যন্ত্র চালাতে গিয়ে বিপদ হতেই পারে। রাজনীতির জগতে দোভাষী এবং অনুবাদকদের কাজটা ভয়ানক কঠিন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণের অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদকরা বড় মুশকিলে পড়েন। ট্রাম্পের ঝোঁক malapropisms and vague terminology দিকে, যা তর্জমা করতে গিয়ে ধন্দে পড়েন অনুবাদকরা। দা গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি নিবন্ধ “Trump in translation: president’s mangled language stumps interpreters”, এক অনুবাদক বলেছেন “We try to grasp the context, but it’s so incoherent.” ট্রাম্পের কথার যাতে কিছু মানে দাঁড়ায়, তার জন্যে অনুবাদককে প্রায়ই তাঁর ব্যবহৃত শব্দ বদলাতে হয়। ট্রাম্প যখন এফ বি আই ডিরেক্টর জেমস কামিকে বরখাস্ত করার ঘটনাকে জাস্টিফাই করার জন্যে ‘নাট জব’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন, তখন তার অনুবাদ বেশ দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, সংস্কৃতিগত দিক থেকে বিচার করলে তাঁর ‘lewd banter’ সেক্সিস্ট এবং রেসিস্ট বিবেচিত হতে পারে। সেটা লক্ষ্য ভাষার একটু অপেক্ষাকৃত নরম ও নিরাপদ শব্দ দিয়ে বদলে দেওয়া অনুবাদকের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনীতির ক্ষেত্রে ভুল অনুবাদ যে কতটা বিপদ ডেকে আনতে পারে, তার উদাহরণ ঠাণ্ডা যুদ্ধের উত্তুঙ্গ সময়ে সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ -র ভাষণে একটি কথা ছিল “Мы вас похороним”, যা ইংরেজিত আক্ষরিক অর্থে অনুবাদ করা হয়েছিল We will bury you – আমরা তোমাদের পুঁতে দেব বা কবরস্থ করব’। মার্কিন মুলুক এই কথাটি সত্যই ধরে নিল। তারা এটাকে নিউক্লিয়ার যুদ্ধের হুমকি ভাবল, আর তার জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। যদিও রুশ ভাষার ব্যঞ্জনার্থে কথাটির সঠিক মানে ছিল ‘We will outlast you.’
শব্দ শুধু না, একটি অক্ষরের এদিক ওদিকে ভয়ানক ব্যাপার হতে পারে। ছোটবেলায় চাঁদমালায় পড়া একটা গল্প মনে পড়ে। একটি বীর যুবক রাজকুমারী বিষয়াকে ভালবাসে। রাজা তাকে বিষয়াকে বিয়ের অনুমতি দিয়ে তার হাত দিয়ে একটা চিরকুট পাঠালেন আমলাস্থানীয় কাউকে দেবার জনযে।
তাতে লেখা ছিল ‘অশোককে বিষয়া দাও’। মাঝপথে একটি কুচক্রী লোক বিষয়া কেটে বিষ করে দিল। ‘অশোককে বিষ দাও’। শেষ পর্যন্ত সেই যুবক বুদ্ধিবলে হত্যার চক্রান্ত থেকে রক্ষা পেয়েছিল বটে, কিন্তু এই যে এত বিপদে পড়েছিল তা কেবল একটি অক্ষরের এদিক ওদিকের জন্যে। অনুবাদের ভুলেও বিরাট সমস্যা হতে পারে। তাই অনুবাদককে বিশ্বাসঘাতক বলে আগেই একটা সাফাই গেয়ে রাখা হল। এর এক ধাপ এগিয়ে বলা হয় যে অনুবাদ হচ্ছে সুন্দরী নারীর মতো, যে অনুবাদ যত বেশি সুন্দর সে তত বেশি বিশ্বাসঘাতক! এরকম একটা নারী অবমাননাকর কথাতেই স্পষ্ট, অন্য বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রের মতো অনুবাদ চর্চাও মিসোজেনেস্ট, সেক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত নয়।


