: ঊর্ণনাভ

 : ঊর্ণনাভ

ঊনবিংশতি অধ্যায় 

যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা!

বিকেলে জবজবে করে চুলে জবাকুসুম তেল দিয়ে, সুন্দর করে চুল আঁচড়ে পরিপাটি করে বেণি বেঁধে, খোঁপায় রুপোর কাঁটা দিয়ে চুল বেঁধে দিয়েছিল মা! বর্ষাকাল! ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি পড়ছিল! সারাদিন ধরে ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি! রোজ বিকেল হলেই মা খুব সুন্দর করে চুল বেঁধে দিত। খুব সুন্দর সুন্দর রুপোর কাঁটা বানিয়ে দিয়েছিল খোঁপায় দেবে বলে। ছয় বিনুনি করে মাথা জুড়ে খোঁপা বেঁধে দিত! তারপর খোঁপার ওপর কালো জাল পরিয়ে দিত। কালো গুলিসুতোর জাল দিয়ে আটকে রাখত খোঁপা! তার জন্য স্টিলের ক্রুশ দিয়ে জাল বুনত।

মা সেলাই করতে খুব ভালোবাসত। কত রকমের হাতের কাজ করত মা! সায়ার লেস বুনত। মাথার জাল, সোয়েটার, টুপি, মোজা—সবকিছুই বুনতে পারত মা! আর ছিল পিটুগ্রাফ বানানো! কত রকমের রঙবেরঙের সুতো দিয়ে সেলাই করে করে ছড়া, কবিতার পঙ্‌ক্তি এসব লিখত কার্পেটের কাপড়ের ওপর! সেই কাপড়ে লেখা পঙ্‌ক্তি ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখত। এখনও ঘরের দেওয়ালে মায়ের হাতের বোনা পিটুগ্রাফ টাঙানো আছে দু-তিনটে! এসব বাবার খুব পছন্দের ছিল!

ভাবতে ভাবতে শোবার ঘরের উত্তরের দেওয়ালের দিকে তাকাল মালবিকা। সেখানে নীল, লাল আর সাদা সুতো দিয়ে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে—

“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

একা একাই বসে বসে জোরে জোরে উচ্চারণ করে পড়ছিল মালবিকা। পড়তে পড়তে কেন জানি আজ তার বাবার কথা বড্ড মনে পড়ছে!

সেদিন সেই বর্ষণমুখরিত বিকেলে মা চুলটুল বেঁধে দেবার পর, প্রতিদিন যেমন মায়ের আঁচল দিয়ে মুখটা টিপে মুছে দেয়, সেদিনও তেমনই করে আঁচল টানিয়ে ঘাড়টা ধরে মুখটা এক পোঁচ টিপে মুছে আবার যখন দ্বিতীয়বার মুছতে গেল, তখন মায়ের চোখে পড়ল এই সাদা দাগটা! তখনও এমন স্পষ্ট সাদা ছিল না! কিন্তু ফর্সা গালে যে আরও সাদাটে একটা স্পট দেখা যাচ্ছিল, সেটা বোঝা যাচ্ছিল।

ওটা দেখার পরই মায়ের চোখমুখ কেমন থমথমে, ভারী হয়ে উঠেছিল! সঙ্গে সঙ্গে নানান জেরা—

“এই সাদামতো দাগটা কবে হয়েছে, মালু?”

“কী জানি মা! আমি তো দেখিনি আগে! তুমি বললে বলেই তো এই আয়নায় দেখছি! এখন মনে হচ্ছে, হ্যাঁ, একটা সাদা ছোপকা দাগ হয়েছে! আগে দেখিনি মা!”

মা সেদিন আর গা ধুল না! প্রতিদিন বিকেলবেলায় ইন্দারার ধারে বসে লাক্স সাবান মেখে ঠান্ডা জলে গা ধুত মা। তারপর গা-হাত মুছে সন্ধে দিয়ে গায়ে পন্ডস পাউডার মেখে শাড়ি-ব্লাউজ পরত। কিছুক্ষণ পরেই বাবা ফিরলে সসপ্যানে করে চায়ের জল চাপাত!

সন্ধ্যেবেলাটা খুব ভালো লাগত মালবিকার! মালবিকা চৌকিতে বসে পড়ত। বাবা এসে হাত-পা ধুয়ে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বকবক করত। মালবিকাও সারাদিনের নানান অভিজ্ঞতা গলগল করে বলত বাবাকে! চা-মুড়ি খেয়ে বাবা বেরোত তাসের আড্ডায়। মা রাতের জন্য রান্না চাপাত কয়লার উনুনে। এটাই ছিল প্রতিদিনের ছবি!

কিন্তু সেদিন একেবারে যেন বিধ্বস্ত হয়ে গেল মা! বাবা কখন আসবে, অধীর আগ্রহে শুধু এই অপেক্ষা! আশ্চর্য! বাবা কোনোদিন একটুও লেট হত না বাড়ি ফিরতে। সেদিনই হঠাৎ করে কেন যেন বাবার দেরি হচ্ছিল বাড়ি ফিরতে! মা কেন এত বিচলিত হচ্ছিল, কিছুতেই বুঝতে পারছিল না মালবিকা সেদিন! পরে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল মায়ের সেদিনের আতঙ্কের কারণ!

বাবার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে মা বলল,
“তুই আজ সন্ধেটা দে মা! আমার হাত-পা আসছে না! ঠাকুর, এ কী করলে তুমি! যা ভাবছি, তাই যেন না হয়! মেয়েটাকে ভালো রেখো ঠাকুর! ও তো কোনো অপরাধ করেনি! যদি অন্যায় করেই থাকি, সে তো আমরা! বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করে যদি কিছু ভুল করে থাকি, সে তো আমরা করেছি! তার শাস্তিও ওকে দিও না যেন!”

সেদিন বুকের ভেতরটায় তারও কেমন গুরগুর করছিল! সন্ধে দিতে দিতে সেও প্রার্থনা করল, “ঠাকুর, দেখো কিছু যেন হয় না! মাকে এত কষ্ট দিও না ঠাকুর!”

ততক্ষণে কাকভেজা হয়ে বাবা বাড়ি ফিরল। আসতে না আসতেই মা কেঁদে ফেলল বাবার কাছে! সব শুনে বাবার মুখও শুকিয়ে চুন হয়ে গেল!

বলল,
“ও, ভয় পেয়ো না! কাল দিনের আলোয় একবার ভালো করে দেখি। তারপর নয়তো একবার ভালো একজন স্কিনের ডাক্তার দেখিয়ে নেব। এখন তো আর আগেকার যুগ নেই! এখন অনেক ভালো ট্রিটমেন্ট বেরিয়েছে! অত দুশ্চিন্তা কোরো না! ঠিক হয়ে যাবে!”

সেদিন মালবিকা স্পষ্ট বুঝতে পারছিল, বাবারও খুব আতঙ্ক হচ্ছে! কিন্তু মায়ের কাছে সেটা চাপা দিতে চাইছিল। মা ধরতে না পারলেও মালবিকা ভালো করেই বুঝেছিল!

চা-মুড়ির আসর সেদিন জমল না! কেমন যেন তাল কেটে গেছে! কে যেন অদৃশ্য থেকে কেটে দিয়েছে তাল-লয় সব! সবথেকে বড়ো আশ্চর্যের, বাবা সেদিন তাদের আড্ডায় গেল না! বলল, “বৃষ্টিতে ভিজে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে! একটু শুয়ে পড়ি।”

বাল্বের আলোয় বাবার চোখমুখ দপদপ করতে দেখেছিল সেদিন!

তারপর থেকে খুব দ্রুত সবকিছু পাল্টে গেল তাদের!

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ  অষ্টম পর্ব চোদ্দো অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ

Read More »