এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস

পর্ব : পাঁচ

আমার নিজের শরীর থেকে তার শরীরে উত্তাপ সঞ্চারিত করতে হবে। তাকে আমার প্রাণের উত্তাপ দিয়ে তার শরীর থেকে মৃত্যুর শীতলতা গ্রহন করব আমি।আর এইভাবেই আমি আমার নিজের আত্মাকে তার শরীরে প্রবিষ্ট করাতে পারব। এই অভিপ্রায়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে তার বিছানায় উঠলাম। এবং তার পাশাপাশি এভাবে শুয়ে পড়লাম যেন পুরুষ এবং নারী ম্যানড্রেক পরস্পরকে জাপটে ধরেছে। আশ্চর্যজনক ভাবে তার শরীর ঠিক স্ত্রী-ম্যান্ড্রেকের মতই প্রতিভাত হচ্ছিল। সঙ্গীর জন্য সে ছটফট করছিল।একইভাবে পুরুষ ম্যানড্রেকও উন্মুখ ছিল। তার মুখের ভেতরটা ঝাঁজালো এবং তেতো। এটা অনেকটা শসার শেষ প্রান্তের যে তেতো ভাব।অনেকটা সেরকমই ছিল।তার পুরো শরীর ভীষণ ঠান্ডা। শিলাবৃষ্টির মত ঠান্ডা। মনে হচ্ছিল,আমার শিরার ভিতরের প্রবহমান রক্ত যেন বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে। সেই শীত ক্রমশ আমার হৃদপিন্ডের ভিতরে ঢুকে পড়ল। এক সময় আমি বুঝতে পারলাম যে আমার সমস্ত চেষ্টা প্রায় বিফলেই যাচ্ছে। আমি বিছানা থেকে নেমে পুনররায় সব পোশাক পরে নিলাম।এটা ঠিক যে,সে আমার সঙ্গে হেঁটে এসেছিল আমার ঘর পর্যন্ত। এমনকি আমার বিছানা পর্যন্ত। এবং তার শরীর আমাকে সমর্পণ করেছিল।আসলে সে তার শরীর এবং আত্মা দুইই আমাকে সমর্পণ করেছিল।

যখন সে বেঁচে ছিল এবং তার চোখ দুটি প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিল। কেবলমাত্র তার চোখ দুটির স্মৃতি আমাকে তাড়িত করত।এখন তার এই অনুভূতিবিহীন চোখ নিস্পন্দ এবং ঠান্ডা চোখ দুটি বন্ধ।এখনো সে নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ ই করেছে। চোখ বন্ধ করে সমর্পণ। এই সেই একই প্রাণী যে কিনা আমার জীবন বিষাক্ত করে তুলেছিল অথবা আমার জীবন বিষাক্ত হবার জন্যই উন্মুখ ছিল। অথবা আমার জন‍্য বিষাক্ত হওয়া ছাড়া আর অন্য কোন জীবনের যাথার্থ ছিল না। এখন এখানে,আমার এই ঘরে সে তার শরীর এবং ছায়া সমর্পণ করেছে। এখন ধীরে ধীরে এসে তার পলকা ক্ষণস্থায়ী আত্মা যার সঙ্গে এখন পৃথিবীর কোন শরীরধারীর কোন সম্পর্ক ছিল না। এমন কি এই কালো কোঁচকানো পোশাকেরও সম্পর্ক নেই। শরীর তাকে যন্ত্রনা দিয়েছে এবং তাকে এক ছায়া পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। হয়তো সে এভাবেই আমার ছায়াটিকেও সঙ্গে নিয়ে নেবে। তার অনুভূতিহীন নিস্পন্দ শরীর এখানে শুয়ে রয়েছে।তার শিথিল পেশী শিরা উপশিরা তার হাড় এবং তন্তু পচে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। যা কিনা এখন মাটির তলার কৃমির কীট ও ইঁদুরের জন্য এক উপাদেয় ভোজ।
আমার মনে হল এই দুর্দশাগ্রস্থ দুঃখজনক ঘর নিজেই একটা কবর। আমাকে ঘিরে থাকা অন্ধকারের মধ্যেই এক অনন্ত রাত্রির ভেতর দেওয়ালগুলো ডুবে যাচ্ছিল। একটা দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছিল এইভাবে এক মৃতদেহর পাশে। এক দীর্ঘ শীতল অনন্ত রাত্রি। তার মৃতদেহর পাশে। এমন আমার সঙ্গে ঘটেছিল শুরু থেকে অনন্ত পর্যন্ত। আমারই নির্মিত এক মূর্তিমতী শীতলতা, একটি মৃতদেহ যা সেই অন্ধকার ঘরের ভেতরে আমার সঙ্গে কোনো প্রকার অনুভূতিই ভাগ করে নিচ্ছিল না।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ভাবনা গুলো জমে যেতে থাকলো একটা একমাত্র এবং একক জীবন আমার মধ্যে গড়ে উঠছিল যা কিনা আমাকে ঘিরে থাকা সকল সমস্ত অস্তিত্ব ও ছায়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং আমাকে ঘিরে প্রকম্পিত হতো।আমি এই পৃথিবী ও তার সমস্ত সচল প্রাণের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ‍্য বন্ধন অনুভব করতাম।
আমি সকল কিছুর সঙ্গেই সংযুক্ত বোধ করলাম। ভাবনাকে বিক্ষিপ্ত ও বিরক্ত করে তোলার মতো এক আশ্চর্য স্রোত আমার অন্তর্গত উপাদানগুলিকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করছে। কোন ভাবনা অথবা ছবি ও আর আমার অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না।
প্রাচীন চিত্রকলার গুপ্তকথা, দার্শনিক গ্রন্থের রহস্য, আর রূপ ও নিয়মের বিমূর্ততা।সব আমি বুঝতে পারছিলাম। আমি পৃথিবী ও গ্রহগুলির ঘূর্ণনের অংশ হয়ে উঠেছিলাম।
উদ্ভিদের বৃদ্ধি, প্রাণিকুলের কর্মকাণ্ডেও যেন আমি অংশ নিচ্ছিলাম। অতীত ও ভবিষ্যৎ, দূর ও নিকট,সব একাকার হয়ে গিয়েছিল আমার চেতনায়।

এমতাবস্থায় কেউ নেশার আশ্রয় নেয়। মদ্যপ মদ খায়, লেখক লেখে, পাথর-কাটার শ্রমিক পাথর কাটে।এভাবেই নিজের উদ্বেগ ও ক্রোধকে জীবনের নিজস্ব উত্তেজনায় প্রশমিত করে। এমন সময়েই এক প্রকৃত শিল্পী তার প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করে এক অনন্য শিল্পকর্ম। কিন্তু আমি? আমি তো প্রতিভাহীন, এক সামান্য কলমখাপের চিত্রকর! আমার এই নিষ্প্রাণ, চকচকে, একঘেয়ে নকশা দিয়ে আমি কীভাবে কোনো শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি করতে পারি? তবু, আমার মধ‍্যে প্রতিভার স্ফুরণ ঘটল।আমি আঁকতে চাইলাম সেই দুটি চোখ।যা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।কাগজে ধরে রাখতে চাইলাম তাদের স্মৃতি।আমার নিজের জন‍্যেই।স্নায়ুর উত্তেজনা আমায় কাজে প্রেরিত করল।আমি সেসব স্বেচ্ছায় করছিলাম না।সেটা সম্ভবই বা কিভাবে?যখন একজন ব‍্যক্তি একটি মৃতদেহের সঙ্গে অবরূদ্ধ রয়েছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার ভাবনা গুলো যেন স্থবির হয়ে গেল আমার ভেতর এক ভিন্নতর প্রাণের সূচনা হলো যা জগত সংসারের সমস্ত অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত চারপাশে দুলতে থাকা সমস্ত ছায়ার সঙ্গেও আমি এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ অনুভব করলাম। এমনকি প্রকৃতি ও তার সমস্ত প্রাণীর নড়াচড়ার সঙ্গেও আমি যুক্ত বোধ করলাম। ভাবনাকে বিক্ষিপ্ত ও বিরক্ত করে তোলার মতো এক আশ্চর্য স্রোত আমার অন্তর্গত উপাদানগুলিকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করছে কোন ভাবনা অথবা ছবি ও আর আমার অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না।আমি যেন প্রাচীন চিত্রকলার গুপ্তকথা, দার্শনিক গ্রন্থের রহস্য, আর রূপ ও নিয়মের বিমূর্ততা,সব বুঝতে পারছিলাম। পৃথিবীর গতি, সৌরমন্ডলের বিস্ফারের অংশ উদ্ভিদের বৃদ্ধি, প্রাণিকুলের কর্মকাণ্ডেও যেন আমি অংশ নিচ্ছিলাম। অতীত ও ভবিষ্যৎ, দূর ও নিকট,সব একাকার হয়ে গিয়েছিল আমার চেতনায়।

এমতাবস্থায় কেউ নেশার আশ্রয় নেয়। মদ্যপ মদ খায়, লেখক লেখে, পাথর-কাটার শ্রমিক পাথর কাটে।এভাবেই নিজের উদ্বেগ ও ক্রোধকে জীবনের নিজস্ব উত্তেজনায় নিঃশেষ করে। এমন সময়েই এক প্রকৃত শিল্পী তার প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করে এক অনন্য শিল্পকর্ম। কিন্তু আমি? আমি তো প্রতিভাহীন, এক সামান্য কলমখাপের চিত্রকর! আমার এই নিষ্প্রাণ, চকচকে, পুনরাবৃত্ত নকশা দিয়ে আমি কীভাবে কোনো শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি করতে পারি? তবু, এক প্রবল উষ্ণতা ও তাড়না আমার সমস্ত দেহে সঞ্চারিত হচ্ছিল। আমি আঁকতে চাইলাম সেই চোখগুলো।যেগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।কাগজে ধরে রাখতে চাইলাম তাদের স্মৃতি।

এই ভাবনাটি আমার ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি নিয়ে এলো।ঘটনাক্রমে আমি বাতিটা নিভিয়ে ফেলতেই তার থেকে ধোঁয়া বেরোতে লাগল।তার মাথার কাছে দুটি মোমবাতি জ্বেলে দিলাম।মোমবাতির কম্পিত আলোয় তার মুখখানা আরো বেশি স্থানু মনে হচ্ছিল।
ঘরের ভেতরের আলোছায়ায় তার চারপাশে এক রহস্যময়, অতীন্দ্রিয় আবহ গড়ে উঠেছিল।
আমি একটি কাগজ আর আমার আঁকার সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে তার শয্যার পাশে দাঁড়ালাম।এখন এই শয‍্যা তারই।
আমি চেয়েছিলাম, নিরবচ্ছিন্নভাবে, সেই আকৃতি আঁকতে যা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল।সেই অভিব‍্যক্তিহীন মুখমণ্ডল।
আমি চেয়েছিলাম তার মূল রেখাগুলো কাগজে ধরে রাখতে।তার মুখের সেইসব রেখা বেছে নিতে চেয়েছিলাম যেগুলো আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।

একটি চিত্র, যতই রেখাসর্বস্ব ও অসম্পূর্ণ হোক না কেন, তার প্রভাব থাকা চাই, তার আত্মা থাকা চাই।
কিন্তু আমি তো এতদিন শুধু কলমের খাপে ওপর নকশা আঁকতে অভ্যস্ত।এখন নিজেকে বোঝালাম
আমাকে আমার কল্পনাকে রূপ দিতে হবে,
তার মুখের সেই দিকটিকে রূপ দিতে হবে যা আবিষ্ট করেছে।আমি চেয়েছিলাম, একবার তার মুখ গভীর ভাবে দেখে ,তারপর চোখ বন্ধ করে কাগজে আঁকব।
তার মুখের সেইসব রেখা, যেগুলো আমি নিজেই বেছে নেব।
এইভাবে হয়তো, আমার নিজের বুদ্ধি ও শিল্পবোধের মাধ্যমে,আমি আমার বিক্ষত আত্মার কিছুটা বিরাম খুঁজে নিতে পারব।।

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

Privious Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস পর্ব : পাঁচ আমার নিজের শরীর থেকে তার শরীরে উত্তাপ সঞ্চারিত করতে হবে। তাকে আমার প্রাণের উত্তাপ

Read More »