বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী ৫
‘কেউ কথা রাখেনি…।’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও কথা রাখেননি। বলেছিলেন, আমার প্রথম উপন্যাসের বই ‘ছিন্ন পালের কাছি’ পড়ে ফোন করবেন, কিন্তু করেননি। আর কোনদিনই সে ফোন আসবে না। কারণ শুধু কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করে এখন তিনি অন্য গ্রহে।
সুনীল আমার মামা হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই প্রিয় কাকু, প্রিয় কবি, প্রিয় লেখক। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ পড়ে আমি তখন মুগ্ধ। আর কবি যখন লেখেন ‘নীরার অসুখ হলে কলকাতায় সবাই বড় দুঃখে থাকে/সূর্য নিবে গেলে পর নিয়নের বাতিগুলি হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়/নীরা আজ ভালো আছে…?’ তখন বড় সাধ হয় নীরাকে দেখতে। তখন তাঁকে সেভাবে চিনিনি। যদিও বাবার সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল এবং ‘অনুবাদ’ পত্রিকার প্রথম দিকের সংখ্যায় তিনি কতগুলো অনুবাদও করেছিলেন। এমনকী ট্রিভোলি পার্কে সঞ্জন সেনের বাংলোয় তাঁকে এক সময় অনুবাদ পত্রিকা থেকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল, তবু তাঁর সঙ্গে মৌখিক আলাপটুকু ছিল।
সবে গোগোল, কাকাবাবু-সন্তু পড়ছি। তখন আর আমার বয়স কত! আট-নয়। সিঁথির বাড়িতে সেই সময় আমার পিসি শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েকবার এসেছেন। খুব বেশিকিছু কথা নয়। বই পড়তে ভালোবাসি কি না! বড়ো হয়ে কী হতে চাও? এসব মামুলি প্রশ্ন। আমি তখন প্রায়ই বাবার সঙ্গে শ্মশানে কাটাই, ডোমেরা আমার দারুণ বন্ধু, তাঁদের মামা বলে ডাকি। তাঁরাই বাবা যখন ধ্যান করেন আমাকে সামলান। আবার আজিমগঞ্জ, রামপুরহাট প্রায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেট, ডাংগুলি, পিট্টি খেলি, ঘুড়ি ওড়াই, নাচ করি, প্রচুর বই পড়ি। কিন্তু কী হতে চাই এই প্রশ্নের উত্তর হত – সন্ন্যাসী বা ডোম। আবার বাসনওয়ালিও হতে পারি। সুনীলকে শেষেরটা বাদ দিয়েই বলা মাত্র বললেন, সন্ন্যাসী হওয়ার থেকে ডোম হওয়া ভালো।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- তুমি কী হতে চেয়েছিলে?
তিনি বলেছিলেন – “ছোটোবেলায় স্বপ্ন দেখতাম, জাহাজে চাকরি নিয়ে নাবিক হব, ঘুড়ির দোকান দেব, এত এত ঘুড়ি ওড়াব।”
- আর লেখা? গোগোল তুমি লেখোনি?
- না।
পরে পিসি বলেছিলেন, “সুনীলদা সাহিত্যিক হবেন ভাবেননি কোনোদিন। পাকেচক্রে হয়ে গেছেন।”
যাইহোক, আমি পত্রিকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবশ্য অনুবাদক সুনীলকে আর পাইনি। আমাকে বলেছিলেন, ‘যদি আবার কোনোদিন অনুবাদ করি তবে তোমাকেই দেব’। উনি সম্ভবত আর অনুবাদ করেননি। আর যাবার আগে ব্যস্ত ছিলেন ছোটদের জন্য সহজ মহাভারত লেখার কাজে।
সুনীলের সঙ্গে বড়ো হয়ে আমার আবার যোগাযোগ তৈরি হল লেখিকা কঙ্কাবতী দত্তের সৌজন্যে। তাঁদেরই গলফ ক্লাবের বাড়িতে। জ্যোতির্ময় দত্ত, মীনাক্ষী দত্ত কলকাতায় এলে তাঁদের বাড়িতে ক’দিন ধরে নানান অনুষ্ঠান, আড্ডা, হৈ হুল্লোড় চলত। সেখানেই সুনীলও আসতেন। এই যে আবার যোগাযোগ হল এটাকে তিনি মজা করে বলতেন – দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠক।
তাঁর সঙ্গে সাহিত্য আকাদেমির সূত্রে প্রায়ই যোগাযোগ ও কথোপকথন হত। দেখা হলেই কী অনুবাদ করছি, কী লিখছি জানতে চাইতেন। পাঞ্জাবি লেখক কর্তার সিং দুগ্গালের গল্প অনুবাদ করছি শুনে খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘দুগ্গাল সাহেব খুব বড় মাপের লেখক, তাঁর লেখা অনুবাদ করা জরুরি।’
আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার অনুবাদ করতে ইচ্ছে করে না?’
তিনি বললেন – ‘আমার সাহিত্যিক জীবনের সূচনার কথা বলতে গেলে মনে পড়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরের কথা। হাতে অঢেল সময়। বাবা চাইতেন ঘরে আটকে রাখতে। টেনিসনের কালেকটেড ওয়ার্কস থেকে প্রতিদিন দু’টি করে কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে বাবাকে দেখানো, এই ছিল আমার প্রতি নির্দেশ। তেমন মিলিয়ে দেখতেন না বাবা। প্রথম দিকে আমি ডিকশনারি দেখে বেশ কষ্ট করে অনুবাদ করতাম। পরে দেখলাম বাবা ইংরেজি কবিতার লাইন সংখ্যা দেখে নিয়ে তা বাংলা অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে টিক চিহ্ন মেরে ছেড়ে দেন। তখন আমিও আর অনুবাদে না গিয়ে ইচ্ছেমতো বানিয়ে কবিতা লিখে দিতাম। তুমিও একদিন দেখবে অনুবাদ করতে করতে কখন যেন নিজের লেখালিখি শুরু করে দিয়েছ। তখন আর অনুবাদ করতে ইচ্ছে হবে না। তবে আমি যদি সেদিন অনুবাদ না করতাম তবে কবিতা লিখতাম কি না জানি না। তবে এখন মনে হয় যে কোনো লেখাই লেখকের নিজের মনের সঙ্গে একান্ত অনুবাদের মাধ্যমে পরিপূর্ণ রূপ নেয়।’
একবার বইমেলায় দেখা হল। আমি গিয়ে সামনে দাঁড়ানো মাত্র বললেন, ‘তুমি কবিতাটা ভালো লিখছ। বই করেছ না কি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, এ বছরই বেরোচ্ছে। এখনও হাতে পাইনি।’
‘কী নাম দিয়েছ?’
‘অপ্রেমের প্রবেশ পথ’ বলা মাত্র হেসে বললেন, ‘বেশ ভালো নাম। তবে ব্যক্তি জীবনে প্রেম-অপ্রেম দুটোই রেখো। বই দিয়ে যেও। পড়ব।’
আমি বললাম, ‘গল্প হলে দিতাম। কবিতা ঠিক ভরসা পাচ্ছি না।’
শুনে বললেন, ‘বই নিয়ে বাড়িতে এসো। দেখব কেমন লিখেছ? আর ডোম হবার স্বপ্নটা মনে আছে তো!’
আমি মাথা নাড়াতেই বললেন – ‘একটা কথা মাথায় রাখবে, আমাদের যাত্রাপথে সবচেয়ে বড়ো বন্ধু ডোমই। ওদের মতো এত বড়ো দার্শনিক কেউ নেই। তুমি তো শুক্লার মুখে শুনি এখনও শ্মশানে সময় কাটাও। ওদের নিয়ে লিখো’।
- কী লিখব?
- গল্প, উপন্যাস, যা মনে হবে।
‘অপ্রেমের প্রবেশ পথ’ আর দিতে যেতে পারিনি। যে কবি লেখেন “শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা তিন সন্ধেবেলা/ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য” তাঁর কাছে আমার কবিতা নিয়ে যাওয়ার সাহস হয়নি।
প্রসঙ্গত বলি, সুনীলের জন্ম ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ বাংলাদেশের ফরিদপুরে। বাবা কলকাতায় শিক্ষকতা করতেন। তেমন প্রাচুর্য ছিল না সংসারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মন্বন্তরের সময় গ্রামেই ছিলেন। চালের বড় অভাব ছিল সে সময়। স্কুলে আলুসিদ্ধ খেতেন। রাতে বেশ ভয় করত। চারদিকে থমথমে অন্ধকার। দেশ বিভাগের আগে কলকাতা চলে আসেন। ‘অর্ধেক জীবন’-এ সুনীল লিখেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হল, আমরা দেশ হারালাম …। দেশ বিভাগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, আমি আর সে জঞ্জাল বাড়াতে চাই না। তবে সেই প্রসঙ্গ উঠলে এখনও ক্রোধবহ্নি জ্বলে ওঠে। সেই দুষ্কর্মের হোতাদের ক্ষমা করতে পারি না।’ সুনীল মন্তব্য করেন, ইংরেজরা ‘শাসন করেছে, ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এই নীতিতে, তাদের শেষতম নীতি ‘ডিভাইড অ্যান্ড কুইট’ (পৃ ৬৪)।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি কীভাবে লেখা শুরু করলেন বলতে গিয়ে বলেছেন – বাবার নির্দেশে প্রতিদিন অনুবাদ পর্ব চলাকালীনই আমি একটি মেয়ের প্রেমে পড়ি। চিঠি দিয়ে প্রেম নিবেদন করা বহু মুশকিল। তাই একটি কবিতা লিখলাম, ‘একটি চিঠি’ নাম দিয়ে। যাকে উদ্দেশ্য করে এই প্রেম নিবেদন সে বুঝবে অবশ্য। অন্য কেউ নয়। লেখাটা দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম। চারমাস পরে বাদামি খামে চিঠি এলো আমার নামে। বুক দুরুদুরু করছে। আমাকে আবার চিঠি দিতে যাবে কে? তাও এতবড় ভারী চিঠি। শঙ্কিত মনে খুলে দেখি দেশ পত্রিকার একটি কপি। আমার কবিতাটি ছাপা হয়েছে। সবাই দেখে কিন্তু শেষমেশ বিশ্বাস করতে চায় না। বলে, ওরে, তোর নামে নাম কোনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ওটা লিখেছে। কারো সঙ্গে নাম মিলে গেছে। আর সুনীল নামটা খুবই কমন। বাড়ির চাকরবাকর থেকে শুরু করে অনেকের নামই হতো সুনীল। কবিতাটি যে আমার, তা সেই প্রেমিকাও বিশ্বাস করতে চায় না। বড়বড় সন্দেহের চোখে তাকায়, যার অর্থ হচ্ছে অন্য কোনো সুনীল লিখেছে বোধহয়।
এরপর শ্যামল কান্তি দাস খুঁজে বের করেছিলেন তাঁকে। সেই সময় দীপক মজুমদার নামে তাঁদের এক বন্ধু ছিল। কবিতা লিখতেন। বহু পত্রপত্রিকায় ছাপা হত। বড়বড় সব সাহিত্যিকদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। সবাই বেশ দাম দিত। তাঁর এসব দেখে খুব রাগ লাগত। কবিতা লেখা আর এমন কী? লিখে ফেললেই হল। তিনিও বসে লিখে ফেললেন দু’চারটে। সেই প্রথম কবিতাটি তাঁর কোনো বইয়ে নেই। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা বের হয় দু’টি চটি পত্রিকায়। অগ্রণী ও শতভিষায়। বুদ্ধদেব বসুর বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় চতুর্থ কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ ১৯৫৮ সালে প্রকাশের আগেই তিনি ও আরও তিন বন্ধু মিলে ততদিনে বের করে ফেলেছেন ‘কৃত্তিবাস’ নামক পত্রিকা। উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে কবিতা লেখা, নতুন কবিদের লেখার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। কৃত্তিবাস পত্রিকার একেবারে গোড়ার দিকে মলাটে লেখা থাকতো ‘তরুণতম কবিদের মুখপত্র’। তরুণদের কবিতা ছাপা হতো। বয়স্কদের নয়। অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো কেউ কেউ ভুল করে দপ্তরে কবিতা পাঠিয়ে দিলে, সবিনয়ে তা ফেরত পাঠানো হত। বয়স্কদের যেমন অম্লান দত্ত বা কেউ কেউ… তাদের কাছে প্রবন্ধ চাওয়া হত। গল্পকার, ঔপন্যাসিক সুনীলকে অনেক পরে পান পাঠক। ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৬৩ সালে ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাস প্রকাশের পরই বৃহত্তর পাঠক সে অর্থে সুনীলের সঙ্গে পরিচিত হলেন।
লেখক সুনীলকে নিয়ে অনেকে আলোচনা করেন, ভবিষ্যতেও তাঁকে নিয়ে অনেক কাজ হবে। তাঁকে বিচার করার ধৃষ্টতা নেই আমার। কিন্তু আমি গায়ক সুনীলকে দেখেছি যিনি উদাত্ত গলায় আপন খেয়ালে গেয়ে উঠতেন ভাটিয়ালি, রবীন্দ্রসংগীত কিংবা বাউল গান। আমার মাঝে মাঝে সেই সব দিনে মনে হত তিনি যদি লেখক না হয়ে সংগীতকেই পেশা হিসাবে নিতেন তাতেও চূড়ান্ত সফল হতেন।
মনে পড়ে, একবার জোড়াসাঁকোতে দেখা হয়েছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি সেখানে গান শেষ করে রবীন্দ্রসদনে যাবেন। বাবাকে ডেকে নিলেন নিজের গাড়িতে। আমি পড়ে রইলাম একা। খানিক বাদে আমাকে লক্ষ করে সামনে এগিয়ে এলেন সুনীল। বললেন – দাদারা রবীন্দ্রসদনেই গেছে। চলো আমিও ওখানেই যাব। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি বললেন – চল, তোকে নিয়েই আজ যাব। দাদা কী করে ভুলে গেল নিতে? এসব ভাবনা আমাকে খুব একটা প্রভাবিত করত না। ছোটো থেকেই গ্রামের বাড়ি একা যাবার ছাড়পত্র পেয়েছিলাম। আর এখন তো বারো বছর। আমি অবলীলায় তাঁদের সঙ্গে হেঁটেই পাড়ি দিলাম। সারা রাস্তা তিনি কখনো কবিতা কখনো গান গাইতে গাইতে চললেন। তাঁর দরাজ ও খালি গলায় গাওয়া ‘বাঁধ ভেঙে দাও …’ গানের সঙ্গে কখন যে আমি নাচতে শুরু করে দিয়েছিলাম কে জানে। ক্রমশ আমাদের পাশে, আগে-পিছে বহু মানুষের পথ চলা, গান, কবিতা পাঠ শুরু হল। সেদিন রবীন্দ্রসদনে পৌঁছে মনে হয়েছিল সত্যি বুঝি ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা…’। এভাবেই বুঝি এক থেকে অনেক হয়ে ওঠার গল্পটা শুরু হয়।
পরবর্তীকালেও আড্ডায় তাঁর গানে কীভাবে পুরো পরিবেশটা বদলে যায় দেখেছি। আশ্চর্য স্মৃতিশক্তির পরিচয় সেই কোন ছোটো বেলায় ডোম হবার কথা বলেছিলাম, মনে রেখেছিলেন দেখেই পেয়েছিলাম। আবারও একদিন পেলাম। ‘খবরের কাগজ’ বলে একটি দৈনিকে বীরভূমের এক গ্রামের মানুষদের দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সুখ-দুঃখ, বেঁচে থাকা নিয়ে আমার লেখা এক গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি গল্পটি পড়ে মনে রেখেছিলেন। কিছুদিন পর বাংলা আকাদেমির একটা অনুষ্ঠানে দেখা হওয়া মাত্র ডেকে বললেন, ‘তোমার লেখা গল্পটি বেশ সহজেই পড়ে ফেলা যায়।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু গল্পটা কি ঠিক হয়, নাকি কেবল কতগুলো বাক্য হয়?’
তিনি বললেন, ‘অত চিন্তা করার দরকার নেই। যা মনে আসবে তাই লিখবে। পাঠক যদি এক নিঃশ্বাসে তা পড়ে ফেলতে পারে জানবে তুমি উতরে গেছ। আর যত এক্সপেরিমেন্ট করবে, কঠিন শব্দ দেবে ততই গল্প-কবিতার বারোটা বেজে যাবে। ভেতরের ভাব গভীর হোক, কিন্তু বাইরে সহজ-সরল ভাষায় লেখাটাই কঠিন।’
এই কথাগুলো আমার খুব ভালো লেগেছিল। এখনো লেখার সময় সেভাবেই লেখার চেষ্টা করি।
আরও একদিন সাহিত্য আকাদেমিতে কবিদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানের পর গিয়ে প্রণাম করা মাত্র বললেন, “দেশে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেখলাম। উপন্যাস লিখছ দেখে ভালো লাগল। কবিতা লিখছ না ছেড়ে দিয়েছ?”
বললাম, ‘লিখে কী হবে?’ সেদিন বলায় হয়তো একটু অভিমান ছিল। তিনি সেটা বুঝেছিলেন হয়তো। তাই একটু থেমে বললেন, ‘যাঁদের কবিতা আজ শুনলে তাঁরা সকলেই তোমার থেকে অনেকটা বড়। আর লেখালিখিতেও সিনিয়র, কিন্তু একটা তথ্য তোমায় দিতে পারি, এদের কবিতা ইন্ডিয়ান লিটারেচারে যায়নি। তোমার গেছে।’ তারপর একটু থেমে হেসে বললেন, ‘কবির অভিমান লোকের সামনে নয়, কবিতায়।’
সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল, ‘আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়’ কবিতার লাইনগুলো যেখানে আমার সামনে দাঁড়ানো কবি লিখেছেন, ‘যে পান্থনিবাসে যাই দ্বার বন্ধ…/আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল,/পথে বড় কষ্ট, তবু ছুটে/এসেও পারি না ধরতে, ততক্ষণে লুট শেষ, দাঁড়িয়ে রয়েছে সব/ম্লান ওষ্ঠপুটে।’
সুনীলের এই দিকশূন্যপুরে চলে যাওয়াতে বাংলা সাহিত্য জগতের কতটা ক্ষতি হয়েছে বলবে সময়। তিনি নিজেও কি অমরত্বের বর চেয়েছিলেন? নাকি চেয়েছিলেন ভীষণভাবে বেঁচে থাকতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে। তাই কি মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করে লিখেছিলেন “কে চায় তোমার কৃপা? আমি আছি প্রাণের প্রহরী/শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে লড়ে যাই, মুষ্টির মধ্যে ভ্রমরকে ধরি,/এই যে তরল বিষ, এর মধ্যে অর্ধেক জীবন/অথবা অর্ধেক মৃত্যু, দেখি আমি এর মধ্যে কোন/অর্ধাংশটা জিতে যায়, আমি আছি জীবনের দিকে…”। আর তাই বুঝি তাঁর সৃষ্টি থাকবে কি থাকবে না তার পরোয়া না করেই লিখে গেছেন অমোঘ সত্য- “খেলতে এসেছি আমি তাই জানি খেলার নিয়ম/হারজিৎ আছে…”।
সুনীল আসলে কোথাও যাননি। রয়ে গেছেন আমাদের মতন মানুষের মনের গভীরে সযত্নে, পরম ভালোবাসায়।



