বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
রুশ গদ্যসাহিত্য পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত। যে ভাষায় নিকোলাই গোগোল থেকে শুরু হয়ে লেভ তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, আন্তন চেখভ ও মিখাইল লেরমন্তভ লিখেছেন, সে ভাষা যে কতখানি সম্পদশালী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁদের পাশাপাশি সে দেশে আলেকজান্ডার পুশকিন, ম্যাক্সিম গোর্কি, মিখাইল শলোকভ-এর মতো মহৎ লেখকের অবির্ভাব ঘটেছে। এই চিরায়ত ঘরানার লেখকদের শেষ প্রতিনিধি সম্ভবত ইভান বুনিন। তিনি রুশ সাহিত্যের চিরায়ত যুগের সঙ্গে আধুনিক যুগের সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে গেছেন। অর্থাৎ তলস্তয় বা দস্তয়েভস্কি-র সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের সলঝেনিৎসিন-এর মধ্যে তিনি সেতুর মতন দাঁড়িয়ে আছেন। আবার গদ্যের সঙ্গে কবিতার সেতুও তিনিই। দুঃখের বিষয় রুশ বিপ্লবের পরে তিনি নিজের দেশেই উপেক্ষিত হয়েছিলেন, কারণ স্তালিন তাঁকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। সে সময় রাশিয়ায় কোনও সাহিত্যিক বুনিনের নাম করলে তিনি সন্দেহভাজন এবং ব্রাত্য বলে বিবেচিত হতেন, এমনকি শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কাও থাকত। কিন্তু তাই বলে সারা পৃথিবীর পাঠকদের সমাদর থেকে বুনিন বঞ্চিত হননি। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। হয়ত স্তালিনের জমানায় সেটাও একটা অপরাধই ছিল!
রুশ সাহিত্য পড়তে পড়তে পাঠক নিজের মধ্যে হারিয়ে যাবেন। তলস্তয়ের ‘রেজারেকশন’ ও ‘আনা কারেনিনা’, নিকোলাই গোগোলের ‘ডেড সোলস’ ও ‘তরাস বুলবা’, দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ যেন এক নতুন দুনিয়ার সন্ধান দেয়। আর আন্তন চেখভ তো আমাদের ছোটগল্পের পাঠ দিয়েছেন। অতি সাধারণ, বৈচিত্র্যহীন মানুষকে নিয়ে কী আশ্চর্য সব গল্প যে তিনি লিখেছেন! ‘সেই কেরানির মৃত্যু’, ‘মুখোস’, ‘কুকুর সঙ্গী মহিলা’, ‘ছ’নম্বর ওয়ার্ড’, ‘কর্নেলের কুকুর’, ‘গুজবেরি’ — এমন কত গল্পে চেখভ আজও বিশ্বের তাবৎ পাঠককে মোহিত করে রেখেছেন। তাঁর নাটক অবলম্বনে রচিত ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয়ের জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। তাই বলে গোটা রুশদেশই কিন্তু আন্তন চেখভ নয়। তলস্তয়ের উপন্যাসের পাশাপাশি ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’, ‘ক্রয়েটজার সোনাটা’ প্রভৃতি গল্পও অবশ্যপাঠ্য। আর গোগোলের ‘ওভারকোট’ গল্পটি থেকেই তো আধুনিক ছোটগল্পের সূত্রপাত। তাঁর কলমে ইউক্রেনের লোককথা নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে।
গোটা বিশ্ববাসী রুশ সাহিত্যের মহত্তম স্রষ্টা হিসেবে যে দুজনের কথা জানে তাঁরা হলেন লেভ তলস্তয় ও ফিওদর দস্তয়েভস্কি। অনেকে আরও এক সমকালীন লেখক ইভান তুর্গেনেভের নামও এই প্রসঙ্গে সম-মর্যাদায় উল্লেখ করেন। এই মহৎ সাহিত্য-স্রষ্টারা যে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রুশ সাহিত্যকে বিকশিত করেছিলেন, তা নির্মাণে তাঁদের আগের প্রজন্মের তিনজন লেখকের প্রচুর অবদান ছিল। আধুনিক রুশ সাহিত্যের ভিত্তি নির্মাতা এই তিনজনের মধ্যে প্রথমজন অবশ্যই আলেকজান্ডার পুশকিন, দ্বিতীয়জন নিশ্চিতভাবে নিকোলাই গোগোল এবং তৃতীয়জন তুলনায় অল্পখ্যাত মিখাইল লেরমন্তভ। এঁদের মধ্যে পুশকিন আর লেরমন্তভ ছিলেন মূলত রোমান্টিক কবি, যদিও লেরমন্তভের ‘আমাদের সময়ের নায়ক’ নামক উপন্যাসটি সমাজবাস্তবতার উপাদান সমৃদ্ধ।
পুশকিনের কবিতা, গল্প, ছোট উপন্যাস আমাদের তাড়িত করে। স্টেশনের ডাক বাবুর মেয়ের গল্পটির মতো এমন স্পন্দিত জীবনের গল্পের তুলনা মেলা ভার। জনৈক উপজাতি সর্দার এবং অভিজাত পরিবারের এক রাজপুরুষকে নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘ক্যাপ্টেনের মেয়ে’ কী অসামান্য সৃষ্টি! ১৮৩৬ সালে প্রকাশিত এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটি এক উপজাতি সর্দারের নেতৃত্বে গণ বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা আশ্চর্য এক কাহিনি। অভিজাত রাজপুরুষদের নিয়ে জারের শাসন আর উপজাতি সর্দারের বিদ্রোহ, তার সঙ্গে রাজপুরুষের সাক্ষাৎ, ভোলা যায় না। অভিজাত পরিবারের যুবকটি যাচ্ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে, উচ্চপদে তার নিয়োগ হয়েছে। পথিমধ্যে তুষারাচ্ছন্ন প্রান্তরে সে পথ হারায়। তার ফিটন গাড়ি সমেত সে কোথায় চলে যাচ্ছিল জানে না, হয়ত মারাই পড়ত ঘুরতে ঘুরতে। কিন্তু এক উপজাতি যুবক এসে তাকে বাঁচায়, সরাইখানায় নিয়ে যায়। এর বিনিময়ে একটি ভদকার বোতল এবং শীত বস্ত্রেই সে খুশি হয়ে হাত মিলিয়ে চলে যায়। সেই যুবকই উপজাতি সর্দার, পরে তার নেতৃত্বেই বিদ্রোহ। উপজাতি সর্দার কিন্তু ভোলেনি সেনাবাহিনির সেই তরুণ অফিসারকে। শেষ অবধি বিদ্রোহ দমন হল। উপজাতি সর্দার ফাঁসিতে যাচ্ছে, যে কয়েকটি এলাকা দখল করে নিয়েছিল। অনেক রাজপুরুষকে সে কোতল করেছিল, কিন্তু এক বোতল ভদকা আর শীত বস্ত্রটির কথা ভোলেনি। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় সে পুরনো বন্ধুকে দেখে চিনতে পেরে হাত নাড়ে। হতে পারে এ জারের আমলে লেখা সাহিত্য, কিন্তু তা রাশিয়ার সমাজের অন্তরাত্মাকে ধরেছিল।
রুশ সাহিত্যের প্রথম বিশিষ্ট কথাশিল্পী হলেন নিকোলাই গোগোল। তাঁর গল্প, উপন্যাস ও নাটকে হাস্যরস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্যে দিয়ে রাশিয়ার সমাজ-বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর নাটক ‘দ্য গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর’, ছোটগল্প ‘দ্য ওভারকোট’ ও ‘দ্য নোজ’ এবং উপন্যাস ‘ডেড সোলস’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি তথা চিরন্তন ক্লাসিক বলে বিবেচিত হয়। শেষোক্ত যে উপন্যাসটি দিয়ে রুশ সাহিত্য জগতে গোগোলের প্রতিষ্ঠা, তার থিম জুগিয়েছিলেন রুশ সাহিত্যের আদিপুরুষ পুশকিন। বয়সে তিনি ছিলেন গোগোলের থেকে দশ বছরের বড়। অনুজ লেখককে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন, লেখার প্রেরণা দিতেন এবং তার লেখা প্রকাশে নিজে উদ্যোগী হতেন। গোগোল যে পুশকিনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেটা ঠিকই, কিন্তু নিজের প্রতিভাবলে তিনি গদ্যসাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ধারার জন্ম দিয়েছিলেন। এর অন্যতম উদাহরণ ‘তরাস বুলবা’ নামক একটি অসাধারণ আখ্যান। তাঁর সৃষ্ট ধারাটির প্রভাব পরবর্তীকালের রুশ সাহিত্যের অনেক লেখকের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে দস্তয়েভস্কি ও চেখভের মধ্যে তো বটেই।
‘ডেড সোলস’ (বাংলায় ‘মৃত আত্মা’) নামক গোগোলের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তিটির মূল রুশ নাম হল ‘মারতভ্যে দুশি’। ১৮৪২ সালে তাঁর ‘ওভারকোট’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বছরেই বেরোয় ‘ডেড সোলস’-এর প্রথম খণ্ডটি। তিনি এই উপন্যাসটি তিন খণ্ডে লেখার কথা ভেবেছিলেন, তবে কেবল প্রথম খণ্ডটিই ছাপা হয়েছিল। দ্বিতীয় খণ্ড লেখার কাজ তিনি সমাপ্ত করেছিলেন বটে, কিন্তু তখন মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে ভেবেছিলেন এ ধরণের ক্ষতিকর লেখা পুড়িয়ে ফেলাই উচিত। তাই চরম মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থায় তিনি পাণ্ডুলিপিটি পুড়িয়ে দেন, পরে এর খণ্ডাংশ পাওয়া যায়। আর পরিকল্পিত তৃতীয় খন্ডটি লেখাই হয়নি!
তলস্তয় সম্পর্কে মিলান কুন্দেরা বলেছেন — “আমার মনে হয় তিনি দস্তয়েভস্কির থেকেও আধুনিক। তলস্তয়ই বোধহয় প্রথম মানুষের ব্যবহারের মধ্যেকার অযৌক্তিক দিকটার ভূমিকা উপলব্ধি করেন।” এর পর আবার এক জায়গায় তিনি বলেছেন — “ইন্টিরিয়র মনোলগের স্রষ্টা জয়েস নন, বরং আনা কারেনিনার কিছু পাতায় তলস্তয়।” তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অতুলনীয় সৃষ্টি, যদিও শেষ জীবনে তিনি স্বয়ং এই উপন্যাসটিকে নিকৃষ্ট সাহিত্য মনে করতেন। তাঁর ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ এক অভিজাত মানুষের পাপ স্বীকারের কাহিনি। বলতে গেলে খ্রিস্টীয় রীতিই যেন তাঁর লেখায় বারংবার উচ্চারিত। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘রেজারেকশন’ও তো তাই। অভিজাত বংশোদ্ভুত এক কাউন্ট তথা বিচারক নিজের যৌবন কালের পাপ স্খালন করতে চললেন সাইবেরিয়া। এর পাশাপাশি দস্তয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’ উপন্যাসের প্রোটাগোনিস্ট রাস্কলনিকভকে কী ভাবে তাহলে গ্রহণ করব আমরা? তাঁর উপন্যাস পড়তে বসে পাঠক উপলব্ধি করবেন রুশ সাহিত্য এ কথাই বলতে চেয়েছে যে “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”
দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য গ্যাম্বলার’, ‘ডেমনস’, ‘ইডিয়ট’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’, ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’, ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ প্রভৃতি রচনা বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ। তাঁর চরিত্র ছিল আপাদমস্তক বৈপরীত্যে ভরা। প্রেমিক পুরুষ ছিলেন, মেয়েদের প্রেম পাওয়ার জন্য হন্যে হয়েছেন। মানুষকে তাঁর চেয়ে আর কে বেশি ভালবেসেছে! পাশাপাশি তিনি লিখে উপার্জন করা টাকা-পয়সা জুয়া খেলেই ফুঁকে দিতেন। তাই আবার একটা বড় লেখায় হাত দিতে হত, যতটা লেখার তাগিদে ততটাই পেটের তাড়নায়। নিজেকে খারাপ মানুষ ভাবতেই বোধহয় তাঁর লেখালেখির সুবিধা হত। তা ছাড়া তিনি বেশ ঈর্ষাকাতর ছিলেন, সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা মনে হয় তুর্গেনেভকে করেছেন। তুর্গেনেভ নাকি একবার তাঁকে দেখিয়ে দেখিয়ে একরাশ সুখাদ্য সহযোগে প্রাতরাশ সেরেছিলেন, আর তিনি পেটের মধ্যে খিদের আগুন নিয়ে তাঁর সামনে বসেছিলেন।
তলস্তয় আর দস্তয়েভস্কির মধ্যে তুলনামূলক বিচারে কে শ্রেষ্ঠ? এ নিয়ে আজও দেশে-বিদেশে পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলে। তবে আজ-কাল দস্তয়েভস্কির প্রতি পাঠকের যেন একটু বেশিই পক্ষপাত দেখা যায়। তার একটা বড় কারণ তলস্তয়কে বুঝতে গেলে নিজের সবটুকু দিয়ে তাঁকে গ্রহণ করতে হবে। তুলনায় দস্তয়েভস্কির চরিত্রগুলো গঠনগতভাবে লেখকের চেয়ে এতটাই আলাদা যে তারা পাঠককে অতটা গ্রাস করে না। তাই আধুনিক পাঠক হয়ত দস্তয়েভস্কি পড়েই তৃপ্তি পাবেন বেশি। তার কারণ দস্তয়েভস্কি তাঁকে আত্মরক্ষার সুযোগটা দেবেন, কিন্তু তলস্তয় নির্মমভাবে তাঁর আত্মা ছিনিয়ে নেবেন। দস্তয়েভস্কি নিঃসন্দেহে একজন অবিশ্বাস্য লেখক। প্রথম বই ‘পুওর ফোক’-এর সাফল্যের পর বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তাঁর সাহিত্য-দর্শন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে — “Literature is a picture, or rather in a certain sense both a picture and a mirror.” কিন্তু তাঁর আবেদন মূলত তাদের কাছেই যারা একটা সুনির্দিষ্ট আইডিয়া নিয়ে চলতে চায়, সেই আইডিয়াটার জন্য তারা জীবনের অনেক কিছু হেলায় তুচ্ছ করতে পারে। তারা অন্তরে অশান্ত এবং বিক্ষুব্ধ। তারা শান্তির তোয়াক্কা করে না, যেন আজীবন শাস্তি পাওয়ার জন্যই তাদের জন্ম। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে আত্মজৈবনিক সুর খুম কম পাওয়া যায়। তিনি ঘটনা আর চরিত্রগুলোকে নাটকীয়ভাবে তৈরি করেন, ফলে প্রায়ই তারা বাস্তব থেকে বিচ্যুত। ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত নোটস ‘ফ্রম দি আন্ডারগ্রাউন্ড’-এ তিনি যা বলেছেন তাতে এই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে — “I admit that twice two makes four is an excellent thing, but if we are to give everything its due, twice two makes five is sometimes a very charming thing.” দস্তয়েভস্কি বাস্তবের বাইরে থেকেই হয়ত বাস্তবকে ভাল দেখতে পেতেন। পাঠকচিত্তে তাঁর উপন্যাসগুলোর প্রভাব অমোঘ ও অনস্বীকার্য। আসলে দস্তয়েভস্কি অন্তর থেকে প্রফেট হতে চেয়েছিলেন, আর তা হতেও পেরেছেন।
সব দিক বিচার করে তলস্তয়কেই রাশিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক বলা যেতে পারে। তাঁর ‘আনা কারেনিনা’ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। যাঁরা বলেন দস্তয়েভস্কির মধ্যে যে মনঃস্তাত্বিক বিশ্লেষণ থাকে তা তলস্তয়ের লেখায় নেই, তাঁরা নিশ্চয় তলস্তয়কে ভাল করে পড়েননি। কেউ যদি জীবনের অর্থ কী বা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কীভাবে বাঁচতে হয় এ সব জানতে চান, তাঁর জন্য কখনই দস্তয়েভস্কি নন, তাঁর জন্য আছেন তলস্তয়। উপন্যাসের আধারে তাঁর বক্তব্য গভীর অর্থবাহী, যেমন ‘আনা কারেনিনা’য় তিনি বলেছেন — “Rummaging in our souls, we often dig up something that ought to have lain there unnoticed.” তাঁর ‘ডেথ অফ ইভান ইলিচ’ পড়ে পাঠক থমকে যাবেন — ভাববেন সত্যিই কি তিনি জীবিত আছেন? এক উলঙ্গ রমণীর সঙ্গে শোবেন না বলে তলস্তয়ের ফাদার সের্গেউস আঙুল কেটে ফেলেন। এ সব একমাত্র তিনিই পারেন, আর কেউ নন। কিন্তু সেটা তো প্রথম পর্বের তলস্তয়। দ্বিতীয় পর্বের তলস্তয় নিজের প্রথম পর্বের লেখাগুলোকে অস্বীকার করলেন। একজন লেখক ‘আনা কারেনিনা’ বা ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এর মতো উপন্যাস লেখার পরে সেগুলোকে হেলায় অস্বীকার করছেন, ভাবতেই পারা যায় না! তার পর তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে লিখতে শুরু করলেন জনসাধারণকে নৈতিক ও আত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একের পর এক অনুজ্জ্বল রচনা। তলস্তয় মসিহা হতে চেয়েছিলেন, হয়েও উঠলেন। রাষ্ট্র তাঁকে অপছন্দ করত, কিন্তু তিনি জনসাধারণের নয়নের মণি। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি বিশ্ব-মানবতার দুই শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি লেভ তলস্তয় ও মোহনদাস কর্মচন্দ গান্ধীর মধ্যে ১৯০৯-১০ সময়পর্বের মধ্যে কিছু পত্র-বিনিময় হয়েছিল। এই চিঠিগুলি গান্ধীজীর কর্মকাণ্ড ও অহিংস আদর্শের নির্মাণ, তলস্তয়ের ধর্ম ও রাষ্ট্র-ভাবনার সূত্র এবং উভয়ের দর্শনগত বিরোধ ও সাযুজ্যের আভাষ বহন করে।
জীবনের চলার পথে তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কি দু’জনকেই খুব দরকার। দস্তয়েভস্কিকে প্রয়োজন হয় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও একটা জীবন জিজ্ঞাসাকে আঁকড়ে ধরার জন্য। আর তলস্তয়কে প্রয়োজন হয় জীবনের অন্তর্গত অর্থময়তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য, যেমন ‘আনা কারেনিনা’-র লেভিন খুঁজেছিল। দস্তয়েভস্কি যদি প্রশ্ন হন, তাহলে তলস্তয় হলেন উত্তর। একজনকে ছেড়ে আরেকজনকে বেছে নেওয়া অর্থহীন। তবে তলস্তয় আর দস্তয়েভস্কি এই দু’জনের মধ্যে কে বেশি প্রিয় এটা যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে বলব এঁরা কেউই নন। আমার সব থেকে প্রিয় ঔপন্যাসিক হলেন ইভান তুর্গেনেভ। তাঁর ‘পিতা-পুত্র’ উপন্যাসটি বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ। আর আন্তন চেখভ রয়েছেন কোথায়? এখানে মনে রাখতে হবে চেখভ উপন্যাসের লোক নন, নাটক আর ছোটগল্পের লোক। তাই এই আলোচনায় তাঁকে টেনে আনব না।
ম্যাক্সিম গোর্কির দুই অসামান্য আত্মকথা ‘আমার ছেলেবেলা’ এবং ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’ পড়লে মনে হয় সোভিয়েত রাশিয়া যেন পৃথিবীর প্রকৃত পাঠশালাই হয়ে উঠেছিল। আমরা যে বিপ্লবের কথা অহরহ কল্পনা করেছি, এ সব সেই বিপ্লবী সাহিত্য নয়, কিন্তু তা মানুষের আত্মার কথা। গোর্কির ‘মাদার’ অবশ্যই বিপ্লবের আখ্যান, কিন্তু তাও তো চেনা ছকের বাইরে। এরকমই একটি গল্প হল ‘চেলকাশ’ — সমুদ্রতীরের এক সন্ধ্যার সেই গল্প। শীত থেকে বাঁচতে মানুষ মানুষী পরস্পরকে আঁকড়ে শরীরের তাপে তাপিত হচ্ছে। এর সঙ্গে ‘মাকারচুদ্রা’ গল্পগুটির কথাও মনে রাখতে হবে। গোর্কির সাহিত্যে আগ্রহী পাঠক ‘লোয়ার ডেপথস্’ নাটকটিও পড়ে দেখতে পারেন।
রাশিয়ার লেখকরা যে আমাদের লেখকদের প্রভাবিত করেছিলেন এ কথা সত্য। শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’ উপন্যাস যে তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ দ্বারা প্রভাবিত তা আন্দাজ করা যায়। তলস্তয় জীবনে কোনওদিন নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট হননি। তিনি জীবনের শেষ অবধি নিজেকে আরও ভাল আরও যোগ্য একজন মানুষ করে তুলতে চেয়েছেন। তিনি নিজেকে বার বার অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছেন — পাঠককে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে, শাসকশ্রেণিকে একের পর এক চরম অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছেন। তিনি একজন আলটিমেট লেখক এবং সমস্যা সৃষ্টিকারী মানুষ। গোগোল, পুশকিন, গোর্কি, লেরমন্তভ — সকলকেই তলস্তয়ের সামনে কোথাও যেন অপ্রাপ্তবয়স্ক মনে হয়। পক্ষান্তরে তলস্তয় তাঁর প্রথম লেখা থেকেই সাবলীল ও প্রাপ্তবয়স্ক। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি দেবদূত নন, দেবতা নন বা শয়তান নন। তিনি একজন চূড়ান্ত স্তরের লেখক, যিনি আজীবন কেবল জীবনসত্যের দিকে ছুটে গেছেন।
রাশিয়ার ক্লাসিক গদ্যসাহিত্য বলতেই আমরা গোগোল, লেরমন্তভ, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, তুর্গেনেভ, চেখভ, গোর্কিতে আটকে যাই। কিন্তু আর একজনের কথা সাধারণ পাঠকরা হয়তো সেই অর্থে জানেন না, তিনি হলেন ইভান গনচারোভ। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর অবিস্মরণীয় উপন্যাস ‘অবলোমভ’। রাশিয়ার সেই সময়কার ক্ষয়িষ্ণু মৃতপ্রায় আভিজাত্যের অকর্মণ্য প্রতিনিধি এই যুবক অবলোমভ। সে এতই অলস যে চাকরিতে টিঁকতে পারে না, বই পড়তে পারে না, বন্ধুদের অযথা অপমান করে, ঋণে ডুবে যায়। নিজের সমস্যাগুলোকে মেটানোর জন্য শ্রমও সে করতে চায় না। বাইরের পৃথিবীর গতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে নিজের মতোই অলস এক পরিচারক জাখরের সঙ্গে একটা ভগ্নপ্রায় অ্যাপার্টমেন্টে সে বাস করে। তার প্রেমও জীবন থেকে চলে যেতে বসে। এই যে এক পরজীবী জীবন সেখান থেকে অবলোমভ কোথায় যায়? একটিমাত্র চরিত্র থেকে একটা সমগ্র শ্রেণির ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন গনচারোভ। এই উপন্যাস সত্যিই অতুলনীয়।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় আজ পর্যন্ত যত উপন্যাস লেখা হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়ার উপন্যাসকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়। এর কাছাকাছি আসতে পারে একমাত্র ফরাসি উপন্যাস (বা কিছুটা হলেও ইংরেজি উপন্যাস)। কিন্তু রুশ ছাড়া আর কোনও ভাষায় এত উঁচু মাপের ঔপন্যাসিকদের আবির্ভাব ঘটেনি বা এত বেশি সংখ্যক সর্বোচ্চ মানের উপন্যাসও লেখা হয়নি। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দু’জন ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি এবং লেভ তলস্তয় রুশ ভাষায় লিখেছেন। এরা ছাড়াও রুশ ভাষায় কলম ধরেছেন পুশকিন, গোগোল, লেরমন্তভ, গনচারভ, তুর্গেনেভ, শ্চেদ্রিন, লেসকভ, কোরোলেঙ্কো, চেকভ, গোর্কি, বুনিন, শলোকভ, বেলি, বুলগাকভ-এর মতো দিকপাল গদ্যলেখকরা। এখানে উল্লেখ করতেই হবে আন্দ্রে বেলির নাম (প্রকৃত নাম বরিস নিকোলায়েভিচ বুগায়েভ), যিনি রুশ প্রতীকীবাদ নামক শৈল্পিক ধারায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সবচেয়ে সফল সাহিত্যকর্ম ‘পিটার্সবুর্গ’ একটি প্রতীকী উপন্যাস। একজন বিপ্লবী আততায়ীকে ঘিরে রচিত এই কাহিনিটি ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয়। ভ্লাদিমির নবোকভ এই বইটিকে শতাব্দীর সেরা চারটি উপন্যাসের অন্যতম বলে গণ্য করতেন। অনেক সমালোচকের মতে এই বইটিতে রুশ বিপ্লব, একদলীয় স্বৈরাচারের উত্থান এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের পূর্বাভাস লক্ষ করা যায়।
সোভিয়েত আমলের রুশ সাহিত্যের দু’জন প্রতিনিধি মিখাইল বুলগাকভ ও আলেক্সান্দার সলঝেনিৎসিন ছিলেন বিপরীত পথে হাঁটা লোক। ‘ডক্টর জিভাগো’র লেখক বরিস পাস্তেরনাকও তাঁদের সঙ্গে আছেন। আর ভ্লাদিমির নবোকভ তো শুরু থেকে সেই পথেই হেঁটে এসেছেন। পূর্বসুরীদের সম্পর্কে নবোকভের মতামত তাঁর রুশ সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে — “Dostoevski’s lack of taste, his monotonous dealings with persons suffering with pre-Freudian complexes, the way he has of wallowing in the tragic misadventures of human dignity—all this is difficult to admire. I do not like this trick his characters have of ‘sinning their way to Jesus’ or, as a Russian author Ivan Bunin put it more bluntly, ‘spilling Jesus all over the place’.”
রাশিয়ায় বিপ্লব না হলে রুশ সাহিত্য আমাদের কাছে অনেকটাই অধরা থেকে যেত। কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হোক বা না হোক, ক্ষমতাই মানুষকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতালোভী শাসক তার আধিপত্য বজায় রাখতে একনায়ক হয়ে ওঠে। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পরে ইতিহাসের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মানতে হবে ১৯১৭-১৮ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তা সমগ্র বিশ্বকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্নের ভাষা আমরা পড়তে পেরেছিলাম সোভিয়েত সাহিত্যের পাতায়। ১৯১৭-র মার্চ মাসে জার দ্বিতীয় নিকোলাস-এর পতন এবং জনগণের সরকার গড়ে তোলা রুশ বিপ্লব বিশ্বের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। সেই সময়ের কথা নিয়ে লেখা বিখ্যাত সাংবাদিক জন রিড-এর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ যুগে যুগে পাঠকদের রক্তের ভিতরে উদ্দীপনা জাগিয়েছে। সে দেশের কমিউনিস্ট সরকার গোগোলের ‘ওভারকোট’ কিংবা চেখভের ‘ছ’নম্বর ওয়ার্ড’ যথেষ্ট বিপ্লবী সাহিত্য নয় বলে বাতিল করেননি। তাঁরা ‘কেরানির মৃত্যু’-কে ভীতু মধ্যবিত্ত বা পাতি বুর্জোয়ার কাহিনি বলে ব্যঙ্গ করেননি। এটা সত্য যে সলঝেনিৎসিন-কে তাঁরা সমর্থন করেননি, ম্যাণ্ডেলস্টাম যে রাষ্ট্রের কোপে পড়েছিলেন তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই, মায়াকোভস্কি যে আত্মহত্যা করেছিলেন তা-ও সত্য, কিন্তু তুর্গেনেভ বা দস্তয়েভস্কির রচনা পড়ে যে কেউ উচ্ছন্নে যাবে না সোভিয়েত রাষ্ট্রের শাসকরা সেটা বুঝেছিলেন।
একটা লেখা ততক্ষণ সার্থক সৃষ্টি হয়ে ওঠে না, যতক্ষণ না প্রতিটি বাক্য লেখকের অনুভূতি আর উপলব্ধি থেকে উঠে আসছে। লেখকের নিজের জীবনের সঙ্গে যদি তাঁর লেখা সম্পৃক্ত না হয়, তা পাঠকের মন অবধি পৌঁছাবে কী করে? এই কারণেই মিখাইল শলোকভের অমর সৃষ্টি ‘ধীরে বহে ডন’ কিংবা মিখাইল বুলগাকভের ‘দ্য মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’ যুগে যুগে পাঠকের মনকে ছুঁয়ে যাবে। কেউ যদি সত্যিই সার্থক কথাসাহিত্য রচনা করতে চান, তাহলে তাঁর অবশ্যই ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকপাল রুশ লেখকদের রচনা বারবার পড়া উচিত। তাঁরাই দেখিয়ে দেবেন গল্প বা উপন্যাস লিখতে হলে একজন লেখকের মধ্যে কতখানি ঐকান্তিকতা থাকা প্রয়োজন, যেমন দেখাবেন বাংলাভাষায় সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর যদি কোনও পাঠক ভি এস নয়পাল, হারুকি মুরকামি বা সলমন রুশদি-কে পড়তে ভুলে যান, মনে হয় তাতে খুব একটা ক্ষতি হবে না।



