উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

১ : বাস্তববাদ ও সাহিত্য : সংশয় ও পথের দিশা

২ : প্রকৃতিবাদ এবং সাহিত্য : ভিন্নতর পথের সন্ধান

৩ : সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ এবং সাহিত্য

৪ : সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

৫ : অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

৬ : অ্যাবসার্ডবাদ

৭ : জাদুবাস্তবতা এবং সাহিত্যচিন্তায় অভিনবত্ব

৮ : সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতা

৯ : আধুনিকোত্তর সাহিত্যচিন্তা

১০ :  জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

সাহিত্যের সব থেকে আধুনিক ও জনপ্রিয় শাখা উপন্যাসের প্রথম আবির্ভাব হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংলণ্ডে। উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জি. কে. চেস্টারটন বলেছিলেন — “People wonder why the novel is the most popular form of literature; people wonder why it is read more than books of science or metaphysics. The reason is very simple; it is merely that the novel is more true than they are.” এই ‘Novel’ শব্দটি এসেছে ‘Novella’ থেকে। মধ্যযুগে ইতালীতে ‘নভেলা’ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তবে পাশ্চাত্যে অনেক আগেই আখ্যায়িকাধর্মী রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের গ্রীক ও ল্যাটিন সাহিত্যে এই ধরণের রচনার খোঁজ মেলে, উদাহরণ হিসেবে এরিস্টাইডিসের গ্রীক ভাষায় লেখা ‘Milseiaca’ বা পেট্রোনিয়াসের ল্যাটিন ভাষায় লেখা ‘Satyricon’ ইত্যাদি রচনার নাম করা যায়। মধ্যযুগে রাজা আর্থার, শার্লামেন প্রভৃতি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক চরিত্রের আখ্যানকে অবলম্বন করে মূলত উপভোগ্য গল্প সৃষ্টির খাতিরে কিছু গদ্য আখ্যায়িকা রচিত হয়েছিল। চতুর্দশ শতকে ইতালীয় লেখক জিওভান্নি বোকাচ্চিও প্রথম উপন্যাসধর্মী রচনা সৃষ্টি করেছিলেন, যদিও তার মধ্যে আধুনিক উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ড্যানিয়েল ডিফো, স্যামুয়েল রিচার্ডসন, টোবিয়াস স্মোলেট, হেনরি ফিল্ডিং প্রভৃতি ইংরেজি ভাষার লেখকরা। তাঁদের হাত ধরেই উপন্যাসের ধারা প্রবর্তিত হয়।

উপন্যাসের আদিরূপ হিসেবে স্বচ্ছন্দে ‘পিকারেস্ক নভেল’-কে চিহ্নিত করা যায়। এই শ্রেণীর উপন্যাসের প্রথম নিদর্শন সম্ভবত ১৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘দ্য লাইফ অব ল্যাজারিলো ডি টর্মেস অ্যাণ্ড এব হিজ ফরচুনস অ্যাণ্ড অ্যাডভার্সিটিজ’ নামক একটি নভেলা, লিখেছিলেন স্পেনের জনৈক অজ্ঞাতনামা লেখক। ফরাসী লেখক অ্যালেইন-রেনে লেসাজের লেখা ‘গিল ব্লাস’ (১৭১৫, ১৭২৪, ১৭৩৫) একটি সুপ্রসিদ্ধ পিকারেস্ক উপন্যাস। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ ঔপন্যাসিক হেনরি ফিল্ডিং-এর ‘দ্য হিস্টোরি অব দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব জোসেফ অ্যান্ড্রুজ’ এবং ‘দ্য হিস্টোরি অব টম জোনস’ পিকারেস্ক উপন্যাসের ধারাকে অনুসরণ করেছে। একইভাবে টোবিয়াস স্মোলেট-এর ‘দ্য এক্সিডিশন অব হামফ্রে ক্লিংক্স’ পিকারেস্ক উপন্যাসের ধারার অনুসারী। আরও পরের খ্যাতনামা ইংরেজ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স-এর বিখ্যাত রচনা ‘পিকউইক পেপারস’ (১৮৩৬-৩৭ ) রচিত হয়েছে ‘পিকারেস্ক উপন্যাস’ ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেই। বাংলায় ‘পিকারেস্ক উপন্যাস’-এর নিদর্শন খুব একটা নেই, তবে জগদীশ গুপ্তের ‘অসাধু সিদ্ধার্থ’ এই শ্রেণীর রচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উপন্যাসের রূপ বহুমাত্রিক, বিভিন্ন দিক থেকে তাকে বিচার করা যায়। বহিরঙ্গ বিচারে উপন্যাসের প্রথম বাক্য যে কত চমকপ্রদ হতে পারে তার স্বপক্ষে দু’টি উদারণ দেব। জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি শুরু হয়েছে এভাবে — “It was a bright day in April and the clocks were striking thirteen.” আলব্যের কামুর ‘দ্য আউটসাইডার’ উপন্যাসের শুরুটাই পাঠককে নাড়া দিয়ে যায় —  “Mother died today. Or maybe yesterday; I can’t be sure.” আবার টোনি মরিসনের পুলিৎজার বিজয়ী উপন্যাস ‘বিলাভেড’ শুরু হয়েছে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য দিয়ে — “124 was spiteful.” উপন্যাসের শেষ বাক্যটিও অনেক সময় পাঠকের মনে দাগ কেটে যায়। যেমন মার্গারেট মিচেলের ‘গন উইথ দ্য উইণ্ড’-এর শেষ বাক্যটি হল — “After all, tomorrow is another day.” হারুকি মুরাকামি তাঁর ‘নরওয়েজিয়ান উড’ উপন্যাসের শেষ বাক্যটিতে লিখেছেন — “Again and again I called out for Midori from the dead centre of this place that was no place.” জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমাল ফার্ম’-এর শেষ বাক্যটিও মনে রাখার মতো — “The creatures outside looked from pig to man, and from man to pig, and from pig to man again; but already it was impossible to say which was which.”

উপন্যাস প্রসঙ্গে হেনরি জেমস মন্তব্য করেছিলেন — “A novel is a living thing, all one and continuous, like every other organism.” উপন্যাসের শৈল্পিক রূপ বিশ্লেষণ করতে হলে প্রথমেই যেটা মনে রাখা জরুরী সেটা হল এই সাহিত্যমাধ্যমটি জীবন নির্ভর শিল্প। উপন্যাসের দু’টি দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ — প্রথমত বহুমাত্রিক জীবনবীক্ষা এবং দ্বিতীয়ত বাস্তবতার অভিব্যক্তি। ঔপন্যাসিক জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ও তার বৈচিত্র্যময় রূপ নিজের মত করে বিশ্লেষণ করেন, কারণ জীবন হল সাহিত্যের মৌলিক উপকরণ। প্রবহমান জীবন ও পরিবর্তনশীল সমাজের ছবি উপন্যাসের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। উপন্যাসের শৈল্পিক বিন্যাসের মধ্যে লেখকের যে জীবনবোধ প্রচ্ছন্ন থাকে তার সাহায্যে মানবচরিত্রের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঔপন্যাসিকের থেকে আশা করা যায় তিনি মানুষের মনের গভীরে গিয়ে অন্তর্লোকের খবর পাঠকের সামনে তুলে ধরবেন এবং জীবনের শিল্পরূপের ভাষাচিত্র আঁকবেন। যে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী রোমান্টিক তিনি প্রাধান্য দেন ঘটনার চমৎকারিত্বকে। আর যে লেখক বাস্তববাদী তিনি জীবনের নানাভাবে বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেন।

এখানে উপন্যাসের আঙ্গিক বা শিল্পরূপের কথা চলে আসে। উপন্যাসের আঙ্গিক বিশ্লেষণ করতে হলে তিনটি দিক খেয়াল রাখতে হয় — আখ্যান ভাগ, চরিত্র-চিত্রণ এবং পরিবেশন রীতি (যাকে ‘method of communication’ বলা হয়)। আর্নল্ড কেটল-এর মতে — “The novel does not simply convey life; it says something about life. It reveals some kind of pattern in life. It brings significance.” জীবন ও জগৎকে পর্যবেক্ষণ করে তার থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, ধারণা ও বিভিন্ন উপাদানের সার্থক সমন্বয়ে উপন্যাস শিল্পরূপ পায়। উপন্যাসের বিভিন্ন উপাদানগুলি তাহলে কী কী? উপন্যাসের ‘concrete element’ হল প্লট, চরিত্র, দৃষ্টিকোণ, পশ্চাৎপট, সময় ও ভাষা। আর ‘abstract element’ হল ঔপন্যাসিকের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা জীবন বিষয়ে ধারণা।

ঔপন্যাসিক যে কাহিনিটিকে উপন্যাসের বিষয় হিসেবে ভেবেছেন তাকে কার্য-কারণ সম্পর্কের পরম্পরায় গেঁথে নিয়ে প্লট তৈরি করেন। গল্প এবং প্লট-এর মধ্যে কিন্তু মূলগত পার্থক্য আছে। গল্পে সময়-সরণি ধরে কয়েকটি ঘটনা পরপর সাজান থাকে, কিন্তু প্লট হয়ে উঠতে গেলে সেই ঘটনাগুলিকে কার্য-কারণ সম্পর্কে গাঁথা কাহিনি হতে হবে। ই. এম. ফরস্টার-ই প্রথম গল্পের সঙ্গে প্লটের পার্থক্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উপন্যাসের কাহিনি পরিবেশনের আধারকে বলা যেতে পারে ফর্ম, আর পরিবেশনের ঢং-কে বলা যেতে পারে স্টাইল। এই স্টাইল থেকেই লেখকের স্বকীয়তা বোঝা যায়। উপন্যাসের কাহিনির মধ্যে সাহিত্যরস সঞ্চারিত করার আধারকে বলা যায় শিল্পশৈলী, যা কিনা উপন্যাসের শিল্পনির্মিতির বিচারে প্লট সৃষ্টি। উপন্যাসের মূল ভিত্তি এই প্লট আবার তিনপ্রকার – সরল (simple), জটিল (complex) ও যৌগিক (compound)। সরল প্লটে একটিই কাহিনি থাকে, তার কোন শাখাকাহিনি বা উপকাহিনি থাকে না। জটিল প্লটে একটি মূল কাহিনির সঙ্গে পরিপূরক হিসেবে থাকে কয়েকটি উপকাহিনি, ফলে আখ্যানভাগ বিস্তৃততর ও জটিল হয়। যৌগিক প্লটে একাধিক কাহিনি থাকে যার প্রতিটিই আলাদা আলাদা ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু এদের মধ্য কোনও কাহিনিই মুখ্য হয়ে ওঠে না। সুতরাং প্লট নির্মিতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে উপন্যাসের অন্তরঙ্গ গ্রন্থন যা লেখকের রচনারীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

অনেকে উপন্যাসের উপাদানসমূহের মধ্যে চরিত্রের ওপর সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেন। মানবজীবনকে খুঁটিয়ে দেখা ও মানুষের চরিত্রকে বিশ্লেষণ করা ঔপন্যাসিকের প্রধানতম কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। ডব্লিউ. জে. হার্ভে চরিত্রকে দেখেছেন সময়, ব্যক্তিত্ব, স্বাতন্ত্র্য, কার্যকারণ সম্বন্ধ, সামাজিক আচরণ, নৈতিকতা, আবেগ, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির মিশ্রিত রূপ হিসেবে। চরিত্রের বিশ্লেষণের দ্বারাই মানুষের অর্ন্তলোকের ছবি পাঠকের সামনে ফুটে ওঠে এবং যে সব উপাদানের সাহায্যে উপন্যাসের সামগ্রিক রূপ প্রকাশিত হয় তাদের সবগুলির সঙ্গেই চরিত্রগুলির ঘনিষ্ঠ যোগ মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের অন্তর্জগতের বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়। সুতরাং উপন্যাসও কোন এক জায়গায় আবদ্ধ নয়, চিরপরির্বতনশীল এবং জীবনের নিরবিচ্ছিন্ন এক অনুসন্ধান। সেই অনুসন্ধানের প্রয়োজনে ঔপন্যাসিককে মানুষের জীবনের গভীরে ডুব দিতে হয়, চেতন ও অবচেতন মনের আনাচে-কানাচে উঁকি দিতে হয়। বিংশ শতাব্দীর লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ বলেছেন — “Life is a semitransparent envelope surrounding us from the beginning of consciousness to the end. The thoughts, feelings and impressions are the stuff of life — the reality and the task of the novelist is to discover this reality.”

ঔপন্যাসিকের নিজস্ব চিন্তাধারা, অনুভূতি ও উপলব্ধি সৃষ্ট সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছায়। শুধু কাহিনীর জাল বুনলেই বা চরিত্র সৃষ্টি করলেই ঔপন্যাসিকের দায় শেষ হয়ে যায় না, পাঠকের মনে কাহিনীকে সঞ্চারিত করা ও চরিত্রগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের বলেছেন — “. . . সাহিত্যের নব-পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনা পরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখান।” এই কারণে ঔপন্যাসিককে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে কাহিনি উপস্থাপন করতে হয় এবং পরির্বতনশীল সমাজক ও মানবচরিত্রকে রচনায় ধরার জন্য প্রয়োজনে দৃষ্টিকোণ পাল্টাতেও হয়। কোন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক ঘটনাকে দেখছেন সেই বিচারে প্রতিটি উপন্যাসই আলাদা আলাদা চিন্তা-ভাবনার পরিচয় বহন করে।

  উপন্যাসের বিষয়গত দিকের সঙ্গে কালগত দিক ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। স্যামুয়েল রিচার্ডসন সময়কে দেখেছেন উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণের সহায়ক হিসেবে। কিন্তু হেনরি ফিল্ডিং পাঠকের কাছে ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে সময়কে ব্যবহার করেছেন। আনা লেটিসিয়া বারবুল্ড অবশ্য সময়কে দেখেছেন লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ ও কাহিনী বর্ণনার পদ্ধতি মাথায় রেখে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ পরিবর্তিত হয় এবং মূল্যবোধও সমাজের নিরিখেই নির্ধারিত হয়। লেখক সৃষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে সময়ের সংকট মানুষের জীবন ও চেতনায় যে ছাপ ফেলে তাকে শিল্পসম্মত ভাষারূপ দেন, তাঁর নিজস্ব মূল্যবোধের মাণদণ্ডে তিনি সময়ের দন্দ্ব তথা ব্যক্তিমানুষের জীবনের দ্বন্দ্বে বিশ্লেষণ করেন। মূল্যবোধ নির্ভর করে লেখকের জীবনদর্শনের ওপর। বস্তুত মূল্যবোধের দৃষ্টি দিয়েই তিনি সমকাল ও সমাজকে দেখেন, যে দৃষ্টিকে আমরা তাঁর second self বা দ্বিতীয় সত্ত্বা বলতে পারি। এই দ্বিতীয় সত্ত্বাই লেখকের সহজাত বোধের মাধ্যমে চরিত্রের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

চরিত্রের উপরে পরিবেশের প্রভাব পড়ে এবং ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলিও পরিবেশ দ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত হয়। পরিবেশই আসলে উপন্যাসের পশ্চাৎপট (background)। উপন্যাসের মূলে আছে যে ব্যক্তিচরিত্র তা ভৌগোলিক তথা সামাজিক পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানেই সার্থক উপন্যাস রচনায় পশ্চাৎপটের গুরুত্ব।

জীবনের অর্ন্তনিহিত বিশিষ্ট রূপটির প্রকাশই হল উপন্যাসের ভাব এবং তা প্রকাশের মাধ্যম হল ভাষা। ঔপন্যাসিকের প্রয়োগ পদ্ধতির উপর তাঁর সৃষ্টির সার্থকতা নির্ভর করে, এবং ভাষাই হল প্রয়োগ পদ্ধতির সেই মাধ্যম যার দ্বারা পাঠকের মনে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্লট, চরিত্র বা ঘটনার নির্মিতি সবই ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায় বলে বিষয়র সঙ্গে ভাষার সঙ্গতি থাকতে হয়। ভাষার প্রয়োগ যদি সুসমঞ্জস হয় তবেই ভাবের প্রকাশ সার্থকতা পায়। আর ভাব ও ভাষার শৈল্পিক প্রকাশেই একটি উপন্যাস সার্থক সৃষ্টিকর্ম হয়ে ওঠে। উপন্যাস রচয়িতা নিজস্ব বাকশৈলী বা স্টাইল তৈরি করে ভাষা-ব্যবহারে নতুন ব্যঞ্জনা আনতে চান বলেই আঙ্গিকের বিচারে উপন্যাসের ভাষা এত বেশি গুরুত্ব পায়। একইসঙ্গে শব্দের অর্থবহন ক্ষমতার ওপর রচনার বাস্তবতা অনেকটাই নির্ভর করে বলে সঠিক শব্দচয়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপন্যাসের বিষয়বস্তুও পাল্টায় এবং ভাষাকেও তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হয়। বিষয়বস্তু পরিবেশনের আধারই হল শিল্পশৈলী এবং শিল্পশৈলীর বিচারে এই আধার হল প্লট।

জীবন সম্পর্কে লেখকের যে ধারণা তা মানবচরিত্রকে কেন্দ্রে করেই আবর্তিত হয়। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র লেখকের জীবন সম্পর্কে ধারণাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে জীবন সম্পর্কে লেখকের প্রতীতি (conception) উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। উপন্যাস যেহেতু জীবনের প্রতিফলন, সেহেতু জগৎ ও জীবনের কথাই ঔপন্যাসিকের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। এটা করতে হলে তাঁকে চরিত্রের সাথে একাত্ম হতে হয়। তাই মানুষের চরিত্রচিত্রণ, চরিত্রবিশ্লেষণও অন্তর্জগতের স্বরূপ প্রকাশ করা উপন্যাসের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। কোনও কোনও সমালোচক মানুষের মনের নানারকম জটিলতা, চিন্তা-ভাবনা, পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি  বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানবমনের এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে বলেছেন মনস্তাত্বিক বাস্তবতা  বা psychological realism।

উপন্যাসের কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ হল —

১. উপন্যাস বর্ণনাত্মক গদ্যে লেখা একটি বিশেষ থীম-এর ভাষায় রূপায়ন যার মুখ্য উদ্দ্যেশ্য নব নব তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্রসৃষ্টি।

২. উপন্যাসের ঘটনা পরম্পরা ও বিভিন্ন চরিত্রগুলি কার্যকারণ সূত্রে অবিচ্ছিন্নভাবে গাঁথা এবং সবই একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় ভাবনার অধীন। চরিত্রগুলির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ নিপুণভাবে বিশ্লেষণের দ্বারা তাদের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে। কোন চরিত্রের বাহ্যিক রূপ ও ক্রিয়ার প্রকৃতি অনুসরণ করে তার অন্তরের অন্তরতম স্থানে পৌঁছানো যায়। আর সেই ক্রিয়াসঞ্জাত প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করেই চরিত্রের ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয়বিধ সম্পর্কের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ণ করা যায়।

৩. উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সমস্যার অস্তিত্ব। আধুনিক জীবনের জটিলতা ও যুগের যন্ত্রণা মানুষের জীবনে সমস্যার জন্ম দেয়। সমস্যা নানারকম হতে পারে — নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি। উপন্যাসের পাতায় এই সমস্যায় দীর্ণ, দ্বন্দ্বময় জীবনের সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটে। সমাজ-জীবনের বিভিন্ন সমস্যা মধ্যে দিয়ে গিয়ে ব্যক্তিমানুষের নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়। উপন্যাসে সমস্যার জন্ম ও তার থেকে মুক্তির চেষ্টা দুই-ই স্বীকৃতি পেয়েছে।

৪. পুরুষ ও নারীর অন্তরঙ্গ জীবনের সামগ্রিক রূপায়নই মুখ্যত উপন্যাসের উপজীব্য। সুতরাং কাহিনিতে জীবনরস সঞ্চারিত করা একান্তভাবে আবশ্যক। সাধারণত নরনারীর প্রেমকে কেন্দ্র করে তাদের অর্ন্তলোকের কথা উদঘাটিত হয়।

৫. উপন্যাসের পটভূমি এবং সময়কাল নির্বাচন করে নিয়ে ঔপন্যাসিককে এগোতে হয়।  একইসঙ্গে বিষয়বস্তু ও লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করা দরকার।

৬. উপন্যাসে জীবন ও সমাজের বাস্তব রূপটি ধরা পড়ে। আধুনিক সমালোচকরা অনেকেই বাস্তবধর্মীতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট এই বাস্তবধর্মীতা কেবলমাত্র রূপগতই নয়, এখি সঙ্গে তা ভাবগতও বটে।

৭. সামগ্রিকভাবে চরিত্রের রূপায়ণ করতে হলে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তার মাত্রা যেন বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে না যায়। সেক্ষেত্রে উপন্যাসের মূলগত ধর্ম থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা থাকে।

৮. ঔপন্যাসিকের জীবন ও সমকালীন সমাজকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতার নির্যাস ও তৎসঞ্জাত উপলব্ধির উপর উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্ভর করে। এই কারণে উপন্যাসের অন্তর্নিহিত আবেদন পাঠকের জীবনবোধকে ছুঁয়ে যায়। এখানে মনে রাখতে হবে শুধুমাত্র লেখকের নিজের অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাই সাহিত্য পদবাচ্য হয় না, তা বড়জোর ‘সংবাদ’ (বা ‘report’) হতে পারে। সংবাদ ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য একেবারে মূলগত। লেখকের ভাবকল্পনা ও বর্ণনাশৈলী যখন রসের সঞ্চার করতে পারে, কেবলমাত্র তখনই সংবাদ উন্নীত হয় সাহিত্যের স্তরে ।

ই. এম. ফরস্টার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ লক্ষণ মিলিয়ে উপন্যাসের সাতটি অপরিহার্য লক্ষণ বা উপাদানের কথা লিখেছেন। এই লক্ষণগুলি হল — story, people, plot, fantasy, prophecy, pattern, rhythm। তবে তিনি মোটের উপর জোর দিয়েছেন বহিরঙ্গ লক্ষণের উপর, অর্থাৎ — story, people ও plot তাঁর কাছে অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যান্য লক্ষণগুলি, অর্থাৎ — fantasy, prophecy, pattern ও rhythm তাঁর বিচারে উপন্যাসের অপ্রধান বিষয়।

শ্রেণীতত্ত্বের বিচারে বহিরঙ্গ বা গঠনগত রূপ ও অন্তরঙ্গ রূপ অনুসারে উপন্যাসের শ্রেণীবিভাগ করা হয়। আদিযুগ থেকে অদ্যাবধি উপন্যাসের শ্রেণীতত্ত্বের পর্যালোচনা করতে দেখব যে দুটি শ্রেণী প্রাধান্য পেয়েছে — ‘নভেল’ ও ‘রোমান্স’। ‘নভেল’ হল সমকালীন বাস্তব ঘটনা ও চরিত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত কাহিনী। অন্যদিকে ‘রোমান্স’ হল কোনও অতীত বা ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা কাল্পনিক কাহিনি। উপন্যাসের মধ্যে কল্পনাবিলাসের সম্ভাবনা খুব একটা বেশি নেই। বরং সমাজচিত্র অঙ্কণ, সমাজজীবন তথা ব্যক্তিজীবনের বিশ্লেষণ এবং মানুষের মনের বিশ্লেষণ উপন্যাসের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে ওঠে। রোমান্সের ক্ষেত্রে কিন্তু লেখক জীবনের গৌরবময় দিকগুলোর বা মুহুর্তগুলোর উপর তুলনায় বেশী নির্ভর করেন। ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মধ্যযুগে ও এলিজাবেথীয় যুগে অনেক কাহিনী লেখা হয়েছিল যার মধ্যে অলৌকিক ও অসম্ভব ঘটনা, রহস্যঘেরা পরিবেশ ও উর্বর কল্পনাশক্তি প্রাধান্য পেয়েছিল। এই কাহিনীগুলি রোমান্স বলে পরিচিত এবং এদের প্রভাবেই আধুনিক যুগে রোমান্স রচিত হয়েছিল। তবে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি থাকলেও রোমান্স-এর মধ্যে যে বাস্তবের সঙ্গে ঐক্য থাকেনা তা নয়। ঘটনা যদি অতিপ্রাকৃত হয়েও থাকে, তাহলেও সেই ঘটনাকে সম্ভাব্যতার রূপ দিয়ে বাস্তবের যতটা সম্ভব কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হয়।

অষ্টাদশ শতকের লেখক হোরেস ওয়ালপোল-এর ‘দ্য ক্যাসল অব ওট্রান্টো’ (১৭৬৪), অ্যান রাডক্লিফ-এর ‘দ্য মিস্ট্রিজ অব ইউডালফো’ (১৭৯৪), ম্যাথিউ গ্রেগোরি লিউইস-এর ‘দ্য মঙ্ক’ (১৭৯৬) প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম ‘গথিক রোমান্স’ নামে পরিচিত। সাহিত্যমূল্যের বিচারে এই রচনাগুলি যেমনই হোক, পরবর্তী যুগের ইংরেজি উপন্যাসে এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে। ব্রন্টি বোনেদের রচনায় এবং ডিকেন্সের রচনায় রোমান্সের ছায়া দেখা যায়। ওয়ালটার স্কটের ‘আইভানহো’, ‘কেনিলওয়ার্থ’, ‘দ্য ব্রাইড অব ল্যামারমুর’ ইত্যাদি উপন্যাস সার্থক রোমান্সের উদাহরণ, যেখানে অতীতের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। রোমান্স অল্পবিস্তর কাব্যধর্মী বলা যেতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকান ঔপন্যাসিক ন্যাথানিয়েল হথ্রোন-এর অমর সৃষ্টি ‘দ্য স্কার্লেট লেটার’ (১৮৫০) শ্রেষ্ঠ রোমান্সের নিদর্শন। এই কালজয়ী রচনাটির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল — প্রথমত সমগ্র রচনাটির পরিবেশে অতিপ্রাকৃতের শিহরণ জাগানো অনুভূতি ও রহস্যময়তা মিশে আছে, দ্বিতীয়ত কাব্যধর্মী চিত্রকল্পের ব্যবহার রচনার সাহিত্যমূল্য বাড়িয়েছে, তৃতীয়ত রচনার মধ্যে রহস্যগূঢ় ব্যঞ্জনা আছে, চতুর্থত চরিত্রগুলির প্রবৃত্তির সংঘাত পাঠকমনকে নাড়া দেয়, এবং পঞ্চমত প্রায়শ্চিত্তের যন্ত্রণা প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলা ভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্স লেখার কৃতিত্বের দাবীদার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ‘কপালকুণ্ডলা’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসদু’টির তুলনা করলে রোমান্স ও উপন্যাসের মূলগত পার্থক্য অনুধাবন করা যাবে। প্রথমটি রোমান্স ও উপন্যাসের মিশ্রণের ফলে সৃষ্ট সার্থক সাহিত্যরূপের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন, কপালকুণ্ডলার চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন আর কোন চরিত্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর দ্বিতীয়টি বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে লেখা সার্থক সামাজিক উপন্যাস।

এডুইন মুয়ার আপেক্ষিক গুরুত্বকে মাপকাঠি ধরে উপন্যাসের পাঁচটি গঠনগত শ্রেণী নির্ধারণ করেছেন — কাজ বা ঘটনাপ্রধান, চরিত্রপ্রধান, নাট্যধর্মী, ইতিবৃত্তমূলক এবং কাল বা যুগপ্রধান। উপন্যাসের গঠন ও প্রকরণ বিষয়ে তাঁর ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে মূলত সময় ও স্থানের বিন্যাস। এভাবে বিচার করে তিনি উপন্যাসকে তিনটি প্রধান ভাগে বিন্যস্ত করেছেন — ‘ঘটনাধর্মী উপন্যাস’ বা ‘Novel of Action’ (যেখানে ঘটনাপ্রবাহ বা কাহিনির গতিময়তা প্রধান), ‘চরিত্রধর্মী উপন্যাস’ বা ‘Novel of Character’ (যেখানে চরিত্র প্রধান) এবং ‘নাটকীয় উপন্যাস’ বা ‘Dramatic Novel’ (যেখানে পূর্বোক্ত দু’টির মিশ্রণে উপন্যাসের অবয়বে নাট্যরূপ ফুটে ওঠে)। আধুনিক কালে উপন্যাসের শ্রেণীবিভাজন বহুমাত্রিক হওয়ায় তার মধ্যে বৈচিত্র্যও বেশী। রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক উপন্যাস যেমন আছে, পাশাপাশি সমাজতাত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গীতে উপন্যাসের শ্রেণীবিভাজনও কম বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। এভাবে বিচার করলে আন্দোলন অবলম্বনে রচিত উপন্যাস, নাবিকের জীবন নিয়ে রচিত উপন্যাস, শিক্ষক বা চিকিৎসকের মতো নানাবিধ চরিত্রকে নিয়ে লেখা উপন্যাস প্রভৃতি নানারকম শ্রেণীর উপন্যাসের কথা বলা যায়।

উপন্যাসের শ্রেণীবিভাজন অনেক ভাবেই করা যেতে পারে, তবে মনে রাখতে হবে এরকম শ্রেণী পরিচয় কখনই চূড়ান্ত নয়। একটি উপন্যাস লক্ষণবিচারে একাধিক শ্রেণীর অন্তভুক্ত হতে পারে। আসলে ঔপন্যাসিক নিজের অভিজ্ঞতাকেই রচনার মধ্যে রূপায়িত করেন। এই কারণে কয়েকটি উপাদান বা বৈশিষ্ট্যের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাসের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা হলেও বিভিন্ন উপাদানগুলির পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের উপরই উপন্যাসের সার্থকতা নির্ভর করে। যাই হোক সামগ্রিকভাবে উপাদান ও লক্ষণ বিচারে উপন্যাসের প্রধান শ্রেণীগুলি হল — সামাজিক উপন্যাস (Social Novel), ঐতিহাসিক উপন্যাস (Historical Novel), মনস্তাত্বিক উপন্যাস (Psychological Novel), কাব্যধর্মী উপন্যাস (Poetic Novel), আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস (Autobiographicalal Novel), হাস্যরসাত্মক উপন্যাস (Humorous Novel), পত্র উপন্যাস (Epistolery Novel) ও আঞ্চলিক উপন্যাস (Regional Novel)। এ ছাড়া গোয়েন্দা ও অভিযান-রহস্য কাহিনিমূলক উপন্যাসও (Detective  Adventure Novel) অত্যন্ত জনপ্রিয়। বহুমাত্রিক বিভাজনের ভিত্তিতে এই শ্রেণীবিভাগের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর উপন্যাসের লক্ষণ সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।

ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংলণ্ডের মহিলা ঔপন্যাসিক শ্রীমতী গ্যাসকেল রচিত ‘মেরি বার্টন’ (১৮৪৮), ‘নর্থ অ্যাণ্ড সাউথ’ (১৮৫৫) এবং কিছুটা পূর্ববর্তীকালের রচনা চার্লস কিংসলের ‘অল্টন লোকে’ (১৮০০) সার্থক সামাজিক উপন্যাসের নিদর্শন। তবে সাহিত্যগুণের বিচারে চার্লস ডিকেন্স-এর ‘অলিভার টুইস্ট’ (১৮৩৩), ‘নিকোলাস নিকোলবি’ (১৮৩৩-৩৯), ‘ব্লীক হাউজ’ (১৮৫২-৫৩), ‘হার্ড টাইমস’ (১৮৫৪) এবং ‘লিটল ডোরিট’ (১৮৫৫-৫৬) অনেক এগিয়ে থাকবে। হ্যারিয়েট বীচার স্টো রচিত ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ (১৮৫২) একটি বিশ্ববিখ্যাত সামাজিক উপন্যাস। বাংলা ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ একটি সার্থক সামাজিক উপন্যাস। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অরক্ষণীয়া’ (১৯১৬), ‘পল্লীসমাজ’ (১৯১৬) ও ‘বামুনের মেয়ে’ (১৯২০) প্রভৃতিও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এগুলির মধ্যে ‘পল্লীসমাজ’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস।

স্যার ওয়াল্টার স্কট রচিত ‘ওয়েভারলি’ (১৮১৪), ‘গাই ম্যানারিং’ (১৮১৫), ‘ওল্ড মর্টালিটি’ (১৮১৭), ‘দি হার্ট অব মিডলোথিয়ান’ (১৮১৮), ‘আইভানহো’ (১৮২০) প্রভৃতি রচনা যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে স্কটের প্রচুর প্রভাব ছিল এবং তখনকার সাহিত্যিকরা স্কটের রচনা থেকে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫), ‘রাজসিংহ’ (১৮৭৭) বাংলা ভাষায় রচিত অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক উপন্যাস। তিনি নিজেই বলেছেন রাজসিংহ তাঁর একমাত্র যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস। এর খুব কাছাকাছিই থাকবে রমেশচন্দ্র দত্তের দুটি রচনা — ‘মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত’ (১৮৭৮) এবং ‘রাজপুত জীবন সন্ধ্যা’ (১৮৭৯)। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ধর্মপাল’ (১৩১২ বঙ্গাব্দ) ও ‘ময়ুখ’ (১৩২২ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসদু’টিরও যথেষ্ট সাহিত্যমূল্য আছে।

কাব্যধর্মী উপন্যাসের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার লেখক ইভান তুর্গেনেভ রচিত কয়েকটি উপন্যাসকে প্রকৃত অর্থে কাব্যধর্মী বলা চলে। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ সর্বোচ্চ স্তরের বাংলা কাব্যধর্মী উপন্যাস। পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসুর ‘রডোডেনড্রনগুচ্ছ’ (১৯৩৪), ‘তিথিডোর’ (১৯৪৯) এবং ‘নির্জন স্বাক্ষর’ (১৯৫১) রচনা তিনটিও সার্থকতা লাভ করেছে। এছাড়া অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর ‘ঊর্ণনাভ’ (১৯৩৩), ‘আসমুদ্র’ (১৯৩৪), এবং ‘প্রচ্ছদপট’ (১৯৩৪) উচ্চমানের রচনা।

আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল প্রতিটি চরিত্রের মুখের কথার সূত্র ধরে অন্য চরিত্রগুলির পরিচয় মেলে। এই শ্রেণীর উপন্যাসের দু’টি রূপ। প্রথম রূপে লেখক খানিকটা আত্মজীবনীর ধাঁচে প্রধান চরিত্রের প্রথম পুরুষের উক্তিতে কাহিনিকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন। এর উদাহরণ হল ড্যানিয়েল ডিফো রচিত ‘রবিনসন ক্রুশো’ (১৭১৯), টোবিয়ায় স্মোলেট-এর ‘রোডেরিক রান্ডম’ (১৭৪৮) এবং অলিভার গোল্ডস্মিথ-এর ‘ভাইকার অব ওয়েকফিল্ড’ (১৭৬৬)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ইন্দিরা’ বাংলা ভাষায় রচিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের উদাহরণ। দ্বিতীয় রূপে কাহিনির বক্তা প্রধান চরিত্র ও লেখক অনেকটা একাত্ম। এক্ষেত্রে প্রধান চরিত্রের মধ্যে লেখকের ব্যক্তিজীবনের ও ব্যক্তিমানসের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন ইংরেজিতে চার্লস ডিকেন্স–এর ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ (১৮৫০) এবং শার্লটি ব্রন্টির ‘জেন আয়ার’ (১৮৪৭)। বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রজনী’, রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’, প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ‘মহাস্থবির জাতক’ প্রভৃতির নাম করা যায়।

রাজনৈতিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে ফরাসী সাহিত্যিকরাই হলেন পথিকৃৎ। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসী ঔপন্যাসিক স্তাঁদাল-এর ‘দ্য রেড অ্যাণ্ড ব্ল্যাক’ (১৮৩০) ও ‘দ্য চার্টারহাউস অব পারমা’ (১৮৩৯) যথার্থ রাজনৈতিক উপন্যাস। রাশিয়ার ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি রচিত ‘দ্য পজেজড’ (১৮৭২) এবং ইভান তুর্গেনেভ রচিত ‘এ হাউজ অব জেন্টলফোক’ এবং ‘ফাদারস অ্যাণ্ড সন্স’ (১৮৬২) বিখ্যাত রচনা। জর্জ অরওয়েল রচিত ‘১৯৮৪’ সাহিত্যমূল্যের বিচারে সর্বোচ্চ শ্রেণীর রচনা। রবীন্দ্রনাথের ‘চার অধ্যায়’ (১৯৩৪) উপন্যাসের চরিত্রগুলি বাংলার বৈপ্লবিক আন্দোলনের ঢেউয়ে আন্দোলিত হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে এই আন্দোলনের ভাষাচিত্র অঙ্কিত হয়নি। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ (১৯২৬) সত্যিকারের রাজনৈতিক উপন্যাস যা একই সঙ্গে দেশপ্রেমমূলকও বটে। ইংরেজ শাসকেরা এই বইটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা সতীনাথ ভাদুড়ির ‘জাগরী’ উপন্যাসটিও সার্থক রাজনৈতিক উপন্যাসের উদাহরণ।

হাস্যরসাত্মক উপন্যাস বরাবরই পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর লেখক হেনরি ফীল্ডিং ও লরেন্স স্টার্ন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখক চার্লস ডিকেন্স-এর রচনায় হাস্যরসের উপাদান মেলে। কিন্তু এঁদের মধ্যে কেবল লরেন্স স্টার্ন-এর রচনাই প্রকৃত অর্থে হাস্যরসাত্মক উপন্যাস বলা চলে। তাঁর উপন্যাসের ‘ত্রিস্তাম স্যান্ডি’–র (১৭৫৯) মধ্যে উচ্চস্তরের হাস্যরস পাওয়া যায়। উনবিংশ শতাব্দীর লেখক প্যারীচাঁদ মিত্রের (টেকচাঁদ ঠাকুর) ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে হাস্যরস বড় ভূমিকা নিয়েছে। ইন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের (ছদ্মনাম পঞ্চানন্দ) ‘কল্পতরু’ ও ‘ক্ষুদিরাম’ হাস্যরসপ্রধান রচনা হলেও সাহিত্যমূল্যের বিচারে প্যারীচাঁদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। বরং যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর ‘মডেল ভগিনী’ (১৮৮৫) হাস্যরসাত্মক উপন্যাস রূপে বেশী জনপ্রিয় ছিল। তবে  ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’ (১৮৯২) ও ‘ডমরুচরিত’ (১৯২৩) সর্ব অর্থেই উচ্চস্তরের হাস্যরসাত্মক উপন্যাস। তাছাড়া কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাথেয়’ (১৯৩০), ‘দুঃখের দেওয়ানী’ (১৯৩২) ইত্যাদি রচনাও হাস্যরসপ্রধান।

পত্র উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হল চরিত্রগুলির লেখা চিঠির মধ্য দিয়ে কাহিনি বলা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্যামুয়েল রিচার্ডসন-এর ‘পামেলা অর ভার্চু রিওয়ার্ডেড’ (১৭৪০) এবং ‘ক্ল্যারিসা অর দ্য হিস্টোরি অব ইয়ং লেডি’ (১৭৪৮) জনপ্রিয় পত্র উপন্যাস।  বাংলায় এই শ্রেণীর রচনার নিদর্শন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্রৌঞ্চ-মিথুন’ এবং বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘রানুর চিঠি’।

আঞ্চলিক উপন্যাসে কোনও একটি বিশেষ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কার ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। টমাস হার্ডি ও আর্নল্ড বেনেট-এর উপন্যাসগুলিতে একটি বিশেষ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও জনজীবনে ঐ অঞ্চলের প্রভাব খুব স্পষ্ট। হার্ডি-র রচনা পাঠ করলে ওয়েসেক্স-এর ছবি যেন চোখের সামনে ভাসে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাস। তাছাড়া সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘গড় শ্রীখণ্ড’ এই শ্রেণীর উপন্যাসের মধ্যে পড়ে।

গোয়েন্দা ও অভিযান-রহস্য কাহিনিমূলক উপন্যাস পাঠকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী উপন্যাসের প্রথম নিদর্শন মেলে দুটি রচনায় — রবার্ট লুই স্টিভেনসন-এর ‘ট্রেজার আইল্যাণ্ড’ (১৮৩৩) এবং উইল্কি কলিন্স-এর ‘দ্য মুনস্টোন’ (১৮৬৬)। স্যার অর্থার কোনান ডয়েল রচিত ‘এ স্টাডি ইন স্কার্লেট’ (১৮৮৭), ‘দ্য সাইন অব ফোর’ (১৮৯০), ‘দ্য হাউন্ড অব বাস্কারভিল’ (১৯০২) এবং ‘দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার’ (১৯১৫) জনপ্রিয়তার বিচারে অনেকটাই এগিয়ে এবং তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস-এর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা আজও অটুট। ডরোথি এল. সয়ার্স সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র লর্ড পিটার উইমসি-ও অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র। এছাড়া অগাথা ক্রিস্টি দু’টি অমর চরিত্রের স্রষ্টা — এরকুল পোয়ারো ও মিস মার্পল। বাংলায় এই শ্রেণীর রচনার মধ্যে পাঁচকড়ি দে-এর লেখা রহস্য-কাহিনিগুলি একসময় জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর রচনার সহিত্যমূল্য কতখানি সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় বাংলায় গোয়েন্দা কাহিনিকে যথার্থ সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

উপন্যাস মূলগতভাবে বাস্তবনির্ভর, কারণ কোনও লেখকের পক্ষেই সমকালীন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। লেখক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি দিয়ে বিচার করে মানুষের জীবনের নানারকম সমস্যাকে উপন্যাসে ভাষারূপ দেন। উপন্যাস ষেহেতু সমকালীন সমাজ ও মানুষের জীবনের কথা বলে সেহেতু লেখকের বাস্তবতার বোধ একটি নির্দিষ্ট কালসীমা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সমকালকে উপেক্ষা করলে উপন্যাসে সার্থকতা আসেনা। যুগচেতনা ও যুগবৈশিষ্ট্য এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সমকালীন সমাজের আয়নায় যুগবৈশিষ্ট্য প্রতিবিম্বিত হয়। উপন্যাস সমাজবদ্ধ নরনারীর সুখ-দুঃখের অভিব্যক্তি, যে সমাজ ক্রমবিকাশের ধারা অনুসরণ করে এগিয়ে চলে।

উপন্যাস যুগসত্যকে প্রকাশ করে এবং যুগসত্য দেশ, কাল, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। উপন্যাসে কালের সত্য ও কালাতীত সত্য সমন্বিত রূপে প্রকাশ পেলেও তুলনায় কালের সত্য ব্যাপকতর। আসলে চিরকালীন সত্য এবং লেখকের সমকালের সত্য দু’টিই একই রকম গুরুত্ব দাবী করে, যে কারণে সমকালের বর্ণনার মাধ্যমে মহান ঔপন্যাসিক চিরকালীন আবেদন সৃষ্টি করেন। যে উপন্যাস চিরকালীন রূপলাভের জন্য সমকালকে উপেক্ষা করে তা যেমন কখনই উপন্যাস হতে উঠতে পারে না, তেমনই সমকালকে ধরার জন্য যে উপন্যাস চিরকালীন সত্যকে এড়িয়ে চলে তা কখনও শিল্পরূপ লাভ করে না। উপন্যাসের সাথে সমাজের যোগ সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের থেকে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণ এই সাহিত্যরূপটি সমাজের মধ্যে অবস্থিত মানুষের কথাই বলে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিকতারও পরিবর্তন হয়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠকরুচিও বদলায়। প্রতিটি যুগের সমাজেরই কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। তাই উপন্যাসের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে সমাজতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে সমকালীন যুগপরিবেশ উপলব্ধি করা প্রয়োজন। উপন্যাসের সত্যদর্শন বলতে যা বোঝায় তা হল প্রকৃতপক্ষে যুগপরিবেশের সঙ্গে একাত্মতাবোধ বা জীবনবোধ, যার উদ্ভব হয় ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে। উপন্যাস রচনার সময় লেখকের মনে যুগচেতনা সতত ক্রিয়াশীল থাকে।

কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজবাস্তবতাও পরিবর্তিত হয় যাকে ঔপন্যাসিক সাহিত্যরূপ দান করেন। সুতরাং বাস্তবতার সঙ্গে উপন্যাসের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। উপন্যাসে যে সব ঘটনা ও চরিত্র উপস্থাপিত হয় সেগুলি অতীত বা বর্তমানের বাস্তবজীবন থেকে উঠে আসে। ঔপন্যাসিক যে কেবল একটি আদর্শ নৈব্যক্তিক মানুষ গড়েন তাই নয়, আসলে তিনি নিজের সত্ত্বার একটি implied version সৃষ্টি করেন। লেখকের সৃষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে সমাজ এবং তার রাজনৈতিক. অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দিকগুলি উপন্যাসে তুলে ধরা হয়। উপন্যাস তাই জীবনের সমগ্রতা, নরনারীর সম্পর্ক ও বাস্তবের জমিতে দাঁড়িয়ে জীবনসংগ্রামের মহাকাব্যিক কথাভাষ্য। কোথাও তা জীবনের বহিরঙ্গের বর্ণনা, আবার কোথাও তা জীবনের অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণ।

উপন্যাস বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জীবনায়নের মূলকথা হল চরিত্রগুলির মনোজগতের জটিলতার বিশ্লেষণ। নিত্যদিনের জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সাবলীলতার বর্ণনার মধ্যে দিয়ে পরিচিত সত্যকে উপন্যাসের পাতায় শিল্পরূপ দেওয়ার মধ্যে লেখকের জীবনবোধ ও অন্তদৃষ্টি কাজ করে। উপন্যাসের ঘটনাবলীর সংলগ্নতা, উপাদানসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য এবং প্রতিনিধিস্থানীয় চরিত্রগুলির মধ্যে সম্পর্ক নির্ভর করে ঔপন্যাসিকের ঐক্য চেতনার উপর। রচনায় কৃত্তিমতা, আকস্মিকতা বা অতিনাটকীয়তা আরোপিত হলে উপন্যাসের শিল্পরূপ ক্ষুন্ন হয়। সমাজ ও জীবনের বাস্তবতা রূপায়ণের ক্ষেত্রে লেখকের পরিমিতিবোধ অত্যন্ত জরুরী।

কালের প্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনও গতিশীল হওয়ায় জীবন সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তনশীল। সমকালীন সমাজের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিমানুষের চরিত্র লেখকের নিজস্ব মূল্যবোধের নিরিখে উপন্যাসে রূপায়িত হয়। এই রূপায়ণের সার্থকতা নির্ভর করে লেখকের বাস্তবতাবোধ, জীবনবোধ ও পরিমিতিবোধের উপর।উপন্যাসে লেখকের বিষয়বস্তুর জ্ঞান, উপলব্ধির গভীরতাও বাস্তববোধ মিশে থাকার ফলে তা জীবনের সামগ্রিক রূপ প্রকাশ করতে পারে। তাত্ত্বিক বিচারে এই প্রকাশক্ষমতাই লেখকের জীবনদর্শন। এটা বুঝতে পারা যায় ঘটনা ও চরিত্রের বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপলব্ধ জীবন সম্পর্কে তাঁর ধারণার বিন্যাস থেকে। বাস্তবতাবোধের সঙ্গে জীবন-দর্শন মিশে থাকে বলেই উপন্যাসে লোকসমাজ ও মানবজীবনের ভাষাচিত্র অঙ্কণ করা যায়। এক অর্থে আমরা সকল ঔপন্যাসিককেই মানবজীবনের দার্শনিক বলে অভিহিত করতে পারি, যাঁর প্রকাশমাধ্যম হল সাহিত্যের ভাষা।

সমাজের ভেতর নিরন্তর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফলে নানারকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয় এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ বিভিন্নভাবে সাড়া দেয়। ঔপন্যাসিক সমাজের গভীরে দৃষ্টিপাত করে সত্যের সন্ধান করেন। ব্যষ্টি ও সমষ্টির টানা-পোড়েনের ফলে যেমন ব্যক্তিত্বের বিকাশ হয়, তেমনই চরিত্রের অন্তঃসংগ্রামের দ্বারা জীবনসত্য উদঘাটিত হয়। উপন্যাসের মধ্যে নিহিত লেখকের জীবনদর্শন দ্বারা অন্যান্য উপাদানগুলি নিয়ন্ত্রিত হয়।মনে রাখতে হবে লেখকের জীবনানুভূতির মাধ্যমে জীবনজিজ্ঞাসা ধ্বনিত হয় এবং উপন্যাসের মধ্যে গূঢ় জীবনজিজ্ঞাসা না থাকলে তা মহৎ সৃষ্টি বলে বিবেচিত হয় না। কোনও উপন্যাস কালজয়ী হওয়ার আবশ্যকীয় শর্ত হল সমাজসচেতনতা, বাস্তবতাবোধ এবং জীবনজিজ্ঞাসা। হেনরি ফিল্ডিং, মিডলটন মারে, জর্জ-লুই ল্যক্লের বুফোঁ, এম. এইচ. আব্রামস, মিরিয়াম অ্যালট, ডেভিড লজ প্রভৃতি সমালোচকের আলোচনা থেকে বোঝা যায় উপস্থাপন রীতির বৈশিষ্ট্যের দ্বারা ঔপন্যাসিকের সামগ্রিক জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

উপন্যাস রচনার বহিরঙ্গ রীতিগুলির মধ্যে একটি সাধারণভাবে প্রচলিত পদ্ধতি হল প্রথম পুরুষে কাহিনির বর্ণনা দেওয়া, অর্থাৎ নিজে কোনও ভূমিকায় না থেকে ঘটনা ও চরিত্রের বর্ণনা করা। এ ক্ষেত্রে লেখক চরিত্রগুলির মুখেই তারা যে ভাবে ঘটনার সামনে পড়ল, ঘটনার মুখোমুখি হয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া, তাদের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাত ইত্যাদি বলে চলেন। আরও একটি পদ্ধতি হল উত্তম পুরুষে কাহিনি বর্ণনা করা, যাকে বলা যায় আত্মকথনমূলক রীতি। এই পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হল আমি-র কথায় কাহিনির পরিবেশন, যে আমি হতে পারেন ঔপন্যাসিক নিজে অথবা হতে পারে উপন্যাসের কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র। ‘ফার্স্ট পার্সন নভেল’ নামে পরিচিত এই রীতি বরাবরই বেশ জনপ্রিয় এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে আরম্ভ করে অনেকেই এই রীতি অনুসরণ করেছেন। তবে এই পদ্ধতির ক্ষেত্রে কিন্তু কথকের মুখে বাহ্য জগৎ ও অপরাপর চরিত্রের যতটুকু পরিচয় দেওয়া সম্ভব হয় পাঠকও ততটুকুই জানতে পারেন, তাই উপন্যাসের সামগ্রিকতা যাতে অক্ষুন্ন থাকে সেদিকে বিশেযভাবে নজর দিতে হয়।

উপন্যাস রচনায় চরিত্র কথনমূলক রীতিও আলাদাভাবে উল্লেখের দাবী রাখে। এই রীতির বৈশিষ্ট্য হল উপন্যাসের কয়েকটি প্রধান চরিত্র পর্যায়ক্রমিকভাবে কাহিনিটি বলে যায়। বঙ্কিমচন্দ্র ‘রজনী’-তে এই রীতি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই আঙ্গিক ব্যবহার করার সময় মনে রাখতে হবে, প্রধান চরিত্রগুলোর মুখের জবানীতে তাদের নিজেদের মনের কথা পরিস্কার করে বলা গেলেও তারা কিন্তু ঠিক ততটুকুই বলতে পারে যতটা তাদের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব। এর অতিরিক্ত বলতে গেলে কাহিনির বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া এই আঙ্গিক ব্যবহার করলে কোনও চরিত্র কাহিনির কোন অংশের বর্ণনা দেবে সেটাও সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এছাড়া পত্রের আকারে উপন্যাস লেখা বা দলিল-দস্তাবেজ ব্যবহার করে উপন্যাসের আঙ্গিক গড়ে তোলার রীতিও প্রচলিত আছে। বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্য সরাসরি এই রাস্তায় হাঁটেননি। তবে ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’ প্রভৃতি উপন্যাসে কৌশলে পত্রের ব্যবহার করেছেন যার সাহায্যে মূল কাহিনি কাঙ্খিত পরিণতি পেয়েছে।

বহির্জীবনকে ছেড়ে লেখকের অভিমুখ যত অন্তর্জীবনের দিকে যায় ততই তাঁর বাস্তবচিন্তাও বদলায়। মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিই হল সেই বাস্তবতা যাকে প্রকাশ করার জন্য ঔপন্যাসিককে চরিত্রের গভীরে ডুব দিয়ে সত্য খুঁজতে হয়। এর ফলে চরিত্রগুলির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ভীষণ জরুরী হয়ে পড়ে। মানবমনের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করতে হলে বা রচনায় তার পরিচয় দিতে হলে ঔপন্যাসিককে ‘চেতনাপ্রবাহ রীতি’ (‘stream of consciousness’) অবলম্বন করতে হয়। অতএব স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক উপন্যাসের রচনারীতি এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, যার অন্যতম নিদর্শন হল আইরিশ লেখক জেমস জয়েস-এর অমর সৃষ্টি ‘ইউলিসিস’।

উপন্যাসে যে রীতিই অনুসৃত হোক না কেন, কাহিনির মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে হলে বা তাকে বাস্তবোচিত করতে গেলে দরকার স্থান ও কালের যথাযথ প্রয়োগ। এছাড়া উপযুক্ত পরিবেশ ও পটভূমি ব্যবহার করলে লেখকের বর্ণনার গুণে চরিত্রগুলির মানসিক উথ্থান-পতনের ছবি ফুটিয়ে তোলা যায়। যেহেতু ঔপন্যাসিকের কাছে তাঁর নিজের মূল্যবোধই প্রধান তাই পরিমিতিবোধ সম্পর্কে সচেতন থাকলে সময়ের নির্দিষ্টতা সম্পর্কে তিনি অবহিত থাকতে পারেন। সময়ের বিস্তৃতি ও কালের বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রচলিত কৌশল হল ‘অতীতচারিতা’র (‘flash-back’)ব্যবহার। এর পাশাপাশি, ‘ভবিষ্যৎচারিতা’ হল আধুনিক কালের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি। তা ছাড়া ‘সময়ের অতিপাত’ -এর (‘passage of time’) বিন্যাসক্রমের দ্বারাও উপন্যাসের শিল্পমাধুর্য অনেকটা বাড়ে। প্রকৃতপক্ষে বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ উভয়প্রকার গ্রন্থনরীতির সুষ্ঠু সমন্বয়ে উপন্যাসের শিল্পশৈলী বা আঙ্গিক সার্থকতা পায়। পরিশেষে ‘দ্য বুক অব লাফটার অ্যাণ্ড ফরগেটিং’-এ লেখক মিলান কুন্দেরা যা বলেছেন সেটি মনে রাখার মতো — “The wisdom of the novel comes from having a question for everything . . . The novelist teaches the reader to comprehend the world as a question. There is wisdom and tolerance in that attitude. In a world built on sacrosanct certainties the novel is dead.”

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১. ই এম ফরস্টার : ‘আসপেক্টস অব দ্য নভেল’, পেঙ্গুইন বুকস, নিউ ইয়র্ক, ১৯৮২।

২. শ্রীকুমার বন্দোপাধ্যায় : ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’, সপ্তম সংস্করণ, মডার্ণ বুক এজেন্সী, কলকাতা।

৩. এডুইন মুয়ার : ‘দ্য স্ট্রাকচার অব দ্য নভেল’, প্রথম সংস্করণ, হোগার্থ প্রেস, লন্ডন, ১৯২৮।

৪. দেবেশ রায় : ‘উপন্যাস নিয়ে’, তৃতীয় সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৬।

৫. দেবেশ রায় : ‘উপন্যাসে নতুন ধরনের খোঁজে’, দ্বিতীয় সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৬।

৬. জে. এ. কাডন : ‘ডিক্সিওনারি অব লিটারারি টার্মস অ্যান্ড লিটারারি থিওরি’, উইলি-ব্ল্যাকওয়েল, পঞ্চম সংস্করণ, ২০১৩।

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

This entry is part 12 of 12 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

This entry is part 12 of 12 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে

Read More »

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

This entry is part 12 of 12 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »