শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

শাসকের ভাষা, শাসিতের ভাষা এবং অনুবাদকের অবস্থান

তৃষ্ণা বসাক 

প র্ব – ৪

“It is the task of the translator to release in his own language that pure language that is under the spell of another, to liberate the language imprisoned in a work in his re-creation of that work.”
― Walter Benjamin, Illuminations: Essays and Reflections

এটা সবসময় হয়েছে যে যখন শাসকের ভাষা থেকে শাসিতের ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, অনুবাদের ওপর কড়া নজরদারি  হয়েছে, মনে করা হয়েছে, অনুবাদক ধন্য হয়ে গেল। এই অনুবাদের সময় অনুবাদককে খুব সতর্ক থাকতে হয়, যেকোন বিচ্যুতির জন্যে তাঁকে কথা শুনতে হয় এবং মাথায় সবসময় রাখতে হয় এই অনুবাদ আসলে শাসিতের, প্রজার সংস্কৃতিকে আলোকিত করছে।  তাই জন্যে এই ধরনের অনুবাদকে বলা হছে servile activity, যার উদ্দেশ্য  to please or serve the ruler।

আবার উল্টোদিক হলে মনে করা হয়েছে অনুবাদক একটি দুর্বল ভাষাকে শক্তিশালী ও বিখ্যাত ভাষায় অনুবাদ করে ধন্য করে দিলেন, দুর্বল একটি ভাষাকে জাতে তুললেন , তার দুর্বলতাকে মেরামত করে তাকে উন্নত করে দিলেন।

আসলে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের দুটো মুখ-

সোর্স ল্যাঙ্গোয়েজ যখন সামন্ত  প্রভু বা বিদেশি শাসকের, তখন অনুবাদকের দায়িত্ব গুরু। আর সোর্স ল্যাঙ্গয়েজ যখন  শাসিতের তখন অনুবাদক অনেক হালকা, তাঁর দায়িত্ব অনেক কম।   

 প্রভু ভৃত্যের স্তরবিন্যাস এখানে অনুবাদকে নিয়ন্ত্রণ করে।

অনুবাদ অনেকরকম হতে পারে।

জন ড্রাইডেন (১৬৩১-১৭০০)  ওভিডের এপিস্তল (১৬৮০ তে) অনুবাদকে তিনটি শ্রেণিভুক্ত করেছেন।

মেটাফ্রেজ– একটা ভাষা থেকে অন্য ভাষায় শব্দ ধরে ধরে লাইন ধরে ধরে অনুবাদ, যাকে আমরা বলতে পারি আক্ষরিক অনুবাদ।

প্যারাফ্রেজ -এটা হচ্ছে সেন্স ফর সেন্স অনুবাদ বা ভাবানুবাদ।

ইমিটেশন– এখানে অনুবাদক , যেমন ঠিক মনে করেন সেইভাবে ইচ্ছেমত মূল টেক্সটকে ছেঁটেকেটে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করতে পারেন। যেটা হচ্ছে সারানুবাদ। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রাজশেখর বসু রামায়ণ ও মহাভারতের সারানুবাদ করেছেন।

এছাড়াও অনুবাদকে অন্যভাবেও তিনটি শ্রেণিতে ভাঙ্গা যায়-

Intralingual– বা রিওয়ার্ডিং- যার মানে একটি ভাষার মধ্যেই আমি একটি টেক্সটের জনার বদলে দিলাম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মঙ্গলকাব্যকে গদ্য ফর্মে লিখলাম Inter lingual – এটা প্রচলিত অনুবাদ। এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়।

Intersemiotic– একটি ভাষার গল্প বা কবিতা যখন অন্য ভাষার গান নাটক ফিল্মে পরিণত হয়। অর্থাৎ ভাষাও বদলাচ্ছে, জনারও বদলাচ্ছে।

আরেকটি জিনিস আছে- ডি কোডিং আর রি কোডিং।

উৎস ভাষা-র টেক্সট- বিশ্লেষণ- স্থানান্তর-পুনর্গঠন- গ্রহীতা ভাষার অনুবাদ, এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ডি কোডিং আর রি কোডিং।

এই যে অনুবাদের বিভিন্ন ভাগ বা তত্ত্ব, তা অনেকটা তীরে বসে সাঁতারের নানান স্ট্রোক শেখার মতো। জলে না নামলে যেমন সাঁতার শেখা যায় না, তেমনি অনুবাদ করার চেষ্টা শুরু না করলে অনুবাদ শেখা অসম্ভব। আমার জীবনে মৈথিলি থেকে প্রথম অনুবাদ খুব অদ্ভুত ভাবে ঘটেছিল। সেই ভাষাটির সিকিভাগও তখন জানি না, অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে অনুবাদ করেছিলাম দুপাতার একটি গল্প, করে দেখাতে গেছিলাম গৌরী সেন দিদিকে। কলকাতায় তিনি ছিলেন একমাত্র মৈথিলী অনুবাদক। ভাষা জানা থাকলেও অনুবাদকের দ্বিধা দ্বন্দ্ব এবং সংকট থাকবেই, সেসব পেরিয়ে অনুবাদটি যখন শেষ হয়ে যায়, তখন অনুবাদক হয়ে যান আর একটু আলোকিত একজন মানুষ। আমরা পড়ে  নিতে পারি বাংলাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক মুম রহমানের কথা, যা পড়ে আমরা বুঝতে পারব অনুবাদকের সীমাবদ্ধতা কীভাবে অতিক্রম করা যায়-

‘অনুবাদ কর্ম যে একটা প্রাজ্ঞতার বিষয়, সৃষ্টিশীলতার বিষয় তা আমি কাফকা অনুবাদ করতে গিয়ে টের পেলাম। সেই সঙ্গে এটাও টের পেলাম, শব্দ থেকে শব্দ বাক্য থেকে বাক্য একভাষা থেকে অন্য ভাষায় আনলেও অনুবাদ সম্পন্ন হয় না। আদতে অনুবাদকে জানতে হয় অন্য সংস্কৃতি, অন্য দেশ, অন্য রাজনীতি এবং অন্য সময়কেও। আমার মাথায় এই ভাবনা এলো যে কাফকা কী ভাষায় লিখতেন? অবশ্যই জার্মান ভাষায়। কিন্তু সকল জার্মান লেখকই তো জার্মান ভাষায় লেখেন যেমন সকল বাংলা লেখকই তো বাংলায় লেখেন। তাই বলে কি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কমুলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালিওল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা হুমায়ূন আহমেদের বাংলা ভাষা এক? তাদের প্রত্যেকের ভাষাভঙ্গি, মেজাজ, লেখার ধরণ তো আলাদা। সবগুলো ভাষা বাংলা হলেও প্রত্যেকটি বাংলারই রয়েছে নিজস্ব ঘরাণা। এখন এমন প্রশ্ন আমার মনে হলো, ব্রেখট আর কাফকা আর টমাস মান তো একই জার্মান ভাষায় বা একই ভঙ্গিতে লেখেননি। তাহলে আমি তো কেবল তিনমাসের প্রাথমিক একটা ভাষা শিক্ষা কোর্স করেছি, তা দিয়ে কি এদের জার্মান ভাষার তফাত ধরতে পারবো? পারার কথা না। তখন আমি যারা ধরতে পারেন তাদের লেখা পড়তে শুরু করলাম। অর্থাৎ কাফকার রচনাশৈলী নিয়ে সুবিদিত যে সব আলোচনা, বিশ্লেষণ আছে সেগুলো পড়তে থাকলাম। আমি মনে মনে কল্পনা করতে থাকলাম কাফকা বাংলা ভাষায় লিখলে ঠিক কোন ধরণের শব্দে লিখতেন, কেমন হতো তার বর্ণনাভঙ্গি। আমি এইবার সেটাকে অবলম্বন করে অনুবাদ করতে শুরু করলাম। আমি আবিষ্কার করলাম, শুধু মাত্র বাক্য থেকে বাক্যে অনুবাদ করলেই অনেক সময়  অন্য ভাষার পাঠককে মূল লেখার স্বাদ দেয়া যায় না। সে কারণেই আমি কাফকা অনুবাদের পর থেকে আমার প্রতিটা অনুবাদগ্রন্থে টীকা, টিপন্নী, দীর্ঘ ভূমিকা এবং লেখক পরিচিতি সংযুক্ত করেছি। আমার মনে হয়েছে এই সব টীকা পাঠককে অপ্রতিকী মিথ কিংবা প্রতীকির সঙ্গে একাত্ম করতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ মূল টেক্সটের সঙ্গে আমার অনুবাদগ্রন্থে বরাবরই বাড়তি কিছু যোগ হতে থাকলো। এই বাড়তি কিছুটা অবশ্যই জোর করে নেয়, প্রয়োজনেই যোগ হলো।‘

আমার নিজের কথা যদি বলি, আমি প্রথমত এবং প্রধানত- কোনটাই অনুবাদক  নই। আমার নিজের মৌলিক কাজের পাশাপাশি অনুবাদ করি। তাই অনুবাদ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমাকে সেটা করতেই হবে সেরকমও নয়। আমার অর্থের প্রয়োজন থাকলেও আমি অর্থের জন্যেই অনুবাদ করিনা। আমি সেটাই অনুবাদ করি যেটা আমি করতে চাই। যেমন, সন্তোষ কুমারের মলয়ালম গল্প আমি ঐভাবেই অনুবাদ করেছি। একটা ঘোরের মধ্যে, স্ব-প্রণোদনায়।  অনুবাদ সম্পর্কে অনেকে বলেছেন অনুবাদ ইস নাথিং বাট আ নেগোসিয়েশান।‘ মৈথিলী থেকে যখন বাংলায় অনুবাদ করছি,  তখন যথাযথ শব্দ নিয়ে আসতে আমাকে অনেক সময় নেগোসিয়েট করতে হয়, কম্প্রোমাইস করতে হয়। কবিতার অনুবাদ হলে সেটা কবিতার মতো শোনাচ্ছে কিনা তার জন্য কিছুটা ঝুঁকিও নিতে হয়। তবে অন্য ভাষার টেক্সট কে যখন আমি বাংলাতে নিয়ে আসছি তখন মনে রাখতে হবে বাংলা ভাষা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। আর আমি যে ভাষা নিয়ে কাজ করছি সেটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। মৈথিলীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেখানে কবির যে মানসিকতা কবির যে সংস্কার কবির যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস সেটা আমাদের বাংলার যে মান যে লিঙ্গ বৈষম্যহীনতা- তার সঙ্গে কিছু জায়গায় মিলছে না।  যে চিন্তাধারাটা আমাদের কাছে অবসুলিট হয়ে গেছে কিছু কিছু কবিতায় সেরকম চিন্তাধারা রয়েছে—নারীর প্রতি, সমাজের প্রতি। তখন সেই কবিতাটা আমি অনুবাদ করতে পারিনা, বাদ দিই। আমি এমন কিছু অনুবাদ করব না যেটার মধ্যে দেশদ্রোহিতা রাষ্ট্রদ্রোহিতা থাকবে, বা সমাজের একটা পশ্চাদপরতা থাকবে। যে টেক্সট কোন রিগ্রেশন,  কোনো কুসংস্কার তুলে ধরে,  তা অনুবাদ করব না। এমন কিছু অনুবাদ করব যা ইন্সপ্যায়ারিং হবে, মানুষ একটা নতুন চিন্তাবিশ্বে প্রবেশাধিকার পাবে, সেটা জানবে। আবার একটা ইউটোপিয়ান বা আদর্শ সমাজ হবে, সব কিছুই ভাল হবে সেটাও হতে পারে না। কবি বা লেখক সবসময় প্রগতিশীল হন। সেখানে যদি তিনি একটা পশ্চাদপর চিন্তাধারাকে তুলে ধরেন সেটা তখন অনুবাদের মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমি কী অনুবাদ করব সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়া সবথেকে বেশি ট্রিকি এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই অনুবাদটা করে কি আমার ভাষায় কোনো উপকার হবে? কারোর কি ভালো লাগবে? কারো কি কোনো আপলিফটমেন্ট হবে সেই অনুবাদটা পড়ে?—সেটা বোঝা খুবই জরুরী। এছাড়া অনুবাদে ক্র্যাফট আছে—আমি কীভাবে করব, কাদের জন্য করব এসব আছে।

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত লোকটা প্রায় উন্মাদের মত সারা শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল।আমি আমার বাড়ির দিকে নির্দেশ করলাম।আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা বলে

Read More »

Privious Cover Stories

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত লোকটা প্রায় উন্মাদের মত সারা শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল।আমি আমার বাড়ির দিকে নির্দেশ করলাম।আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা বলে

Read More »

সময়ের আলোকে একুশে ফেব্রুয়ারি

।। শুভাশিস ঘোষ ।। জাতি হিসেবে বাঙালির গর্ব করার মতো এক অনন্য দিন—একুশে ফেব্রুয়ারি। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সেই পবিত্র ভূমিতে আজ যখন নানা প্রতিকূলতার ছায়া

Read More »