সুরঞ্জিত সরকার
অষ্টম পর্ব
লাইব্রেরি ঘরের ভ্যাপসা অন্ধকার হঠাৎ যেন আরও ঘনীভূত হয়ে এল। বাইরে তপ্ত দুপুর থাকলেও ঘরের ভেতরে এক হাড়কাঁপানো শীতল স্রোত বয়ে গেল। সুমন্ত ও কল্যাণ অনুভব করল, কেউ একজন তাদের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ বাতাসে ভেসে এল পুরনো দিনের নারকেল তেলের গন্ধ—যে গন্ধটা তাদের ঠাকুমা পূরবী দেবী সবসময় ব্যবহার করতেন। কল্যাণ আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে দেখল, আলমারির কাঁচের ওপর যেন একটা আবছা প্রতিচ্ছবি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। কোনো স্পষ্ট অবয়ব নেই, কিন্তু একটা স্নেহমাখা স্পর্শ যেন সুমন্তর মাথায় হাত রাখল। দুজনেই চোখ বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
পিছন থেকে আবারও সেই ঠাকুমার চেনা গলা— ” ভয় পেও না দাদুভাই, আমি আছি। তোমাদের কেউ কিছু করতে পারবে না। ঈগলকে রক্ষা কর।” সুমন্ত এবার বুঝল যে ঠাকুমার জিজীবিষা মারা যাবার পরেও তাঁকে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে দেয় নি। মনে মনে ভাবতে লাগল সত্যিই তো ঠাকুমা এই বাড়িতে মারা গিয়েছিল কিন্তু তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ও অন্যান্য প্রায়শ্চিত্ত কর্ম এই বাড়িতে হয় নি।
এমন সময় ঘরের ভেতরের একটা ভারী বইয়ের আলমারি নিজে থেকেই বিকট শব্দে নড়ে উঠল। নীচের লোকটা জানালার নীচ থেকে পিছিয়ে গেল। মনে হলো, পূরবী দেবীর আত্মা যেন অভিশপ্ত এই লাইব্রেরি ঘরকে বাইরের শত্রু থেকে আড়াল করতে চাইছে। সুমন্ত ফিসফিস করে বলল, “ঠাকুমা আছেন আমাদের সাথে। ভয় নেই কল্যাণদা।”
বাইরে জানলার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালো কোট পরা লোকটা হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল। তার বাইনোকুলারটা হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল। সে দেখল, বন্ধ জানলার কাঁচের ওপর ভেতর থেকে একটি ছায়াময় নারীমূর্তি ফুটে উঠেছে, যার চোখ দুটো অপার্থিব শান্ত অথচ ক্রূর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ কোনো মেঘ ছাড়াই লাইব্রেরি ঘরের সামনের সেই পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার একটা বিশাল ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল ঠিক লোকটার পায়ের কাছে। লোকটা ভয়ে নীল হয়ে গিয়ে বিড়বিড় করল, “এ বাড়ি অভিশপ্ত! এখানে অশরীরী আত্মা আছে!”
ভয়ে লোকটা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে পাগলের মতো বাগানের আগাছা মাড়িয়ে সদর গেটের দিকে ছুটল। তার সেই দামী কালো কোটটা ঝোপের কাঁটায় আটকে ছিঁড়ে গেল, তবু সে পিছন ফিরে তাকাল না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে সে ধুলো উড়িয়ে চম্পট দিল।
লোকটা চলে যেতেই ঘরের ভেতরের সেই হিমশীতল ভাবটা কাটতে শুরু করল। সুমন্ত দেখল, মেঝের ধুলোর ওপর একজোড়া অদৃশ্য পায়ের ছাপ আলমারির সেই হরিণের শিংয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল। কল্যাণ ফিসফিস করে বলল, “দিদা আমাদের রক্ষা করল, সুমন্ত! কিন্তু ওই লোকটা কি আবার ফিরে আসবে?”
কল্যাণ পকেট থেকে দ্বিমুখী ঈগল খোদাই করা মেডেলিনটা বের করল। ওটা এখন আগের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, এই লড়াইয়ে ঠাকুমা তাদের সাথে আছে, কিন্তু দাদুর সেই ‘জিজীবিষা’র আসল পরীক্ষা এখনও বাকি।
মেডেলিনের নীল পাথরটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল। মেঝের ওপর সেই নীল আলো গিয়ে পড়ল হরিণের শিংয়ের একদম নিচের একটা গোপন হাতলের ওপর। সেখানে খোদাই করা ছিল একটি নাম— ‘জিজীবিষা’। সুমন্ত বুঝতে পারল, ঠাকুমা তাদের কিছু মনে করিয়ে দিতে চাইছে।
ওদিকে কৈপুকুরের বাড়িতে অতীশ হঠাৎ ইজি চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “পূরবী, তুমি তবে ওদের পথ দেখাচ্ছ? আমি জানতাম তুমি নাতিদের একা ছাড়বে না।”
দাদু বুঝতে পারলেন, এই খেলায় এখন আর তিনি একা খেলোয়াড় নন, পরলোক থেকেও সাহায্য আসছে।
সুমন্ত ও কল্যাণ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। মেডেলিনটা পকেটে শক্ত করে চেপে ধরে তারা পূরবী ভবন থেকে সাইকেল নিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ির দিকে রওনা দিল। পথে দুবার পিছন ফিরে তাকাল , কিন্তু সেই কালো কোট পরা লোকটার আর কোনো চিহ্ন নেই।
বাড়িতে ঢুকেই তারা সরাসরি পূর্ণা দেবীর ঘরে গেল। দুজনকে হাঁপাতে দেখে পূর্ণা আঁতকে উঠলেন।
সুমন্ত কোনো ভূমিকা না করেই বলল, “মা, আজ লাইব্রেরি ঘরে যা ঘটল তা অবিশ্বাস্য! ঠাকুমা… ঠাকুমা ওখানে এসেছিল। তিনি আমাদের রক্ষা করেছেন।”
পূর্ণা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে সোফায় বসে পড়ল। তাঁর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “আমি জানতাম মা আমাদের এই বিপদে একা ছাড়বেন না।”
ঠিক সেই সময় ঘরের দরজায় দাদু অতীশের ছায়া দেখা গেল। তাঁর হাতে একটা পুরনো মরচে ধরা কম্পাস। তিনি সুমন্তর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “ঈগলটা পেয়েছিস তো? তোদের ঠাকুমা যে পথ দেখাবে আমি জানতাম।”
সুমন্ত অবাক হয়ে বলল, “দাদু, তুমি জানতে যে ওখানে অশরীরী কিছু ঘটবে?”
দাদু ঘরের ভেতরে এসে বসল। তিনি বললেন, “সরকার বংশের এই জিজীবিষার সাথে মৃত্যুর কোনো বিবাদ নেই রে। পূরবী এই মেডেলিনটা নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি আগলে রাখত। আজ তোরা ওটা উদ্ধার করেছিস বলেই সে শান্ত হয়েছে। কিন্তু ওই কালো কোট পরা লোকটা কোনো সাধারণ চোর নয়। ও হচ্ছে ওপার বাংলার ‘ত্রিশূল’ নামক এক গুপ্ত সংগঠনের চর, যারা বছরের পর বছর ধরে আমাদের এই বংশের নকশাটা হাতানোর চেষ্টা করছে।”
দাদু তাঁর হাতের কম্পাসটা মেডেলিনের সেই ফাঁকা চোখের জায়গায় বসালেন। অবাক বিস্ময়ে দেখা গেল, কম্পাসের কাঁটাটা কোনো নির্দিষ্ট দিকে না ঘুরে পাগলের মতো বনবন করে ঘুরতে শুরু করল।
দাদু বললেন, “এই ঈগল আর কম্পাস যেখানে স্থির হবে, সেখানেই লুকিয়ে আছে জিজীবিষার শেষ সত্য। কিন্তু সেটা এই বাড়িতে নেই।”
কল্যাণ উত্তেজনায় কাঁপছিল। “তার মানে আমাদের অন্য কোথাও যেতে হবে?”
দাদু জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন নয়। আজ রাতটা সাবধানে থাক। কাল ভোরে তোরা বেরোবি। তবে মনে রাখিস, এবার তোদের সাথে শুধু দাদু বা মা নয়, পরলোক থেকে ঠাকুমাও ছায়ার মতো থাকবে”।
কৈপুকুরের সরকার বাড়িতে রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই এক গা-ছমছমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করল। রাত তখন প্রায় একটা। হঠাৎ বাগান সংলগ্ন পাঁচিলের ওপাশে একটা ঝপাং করে শব্দ হলো। সুমন্ত আর কল্যাণ ওপরের ঘরে জেগে ছিল। জানলার পর্দা একটু সরিয়ে দেখল, কুয়াশার মতো অন্ধকারে তিন-চারজন ছায়ামূর্তি কালো পোশাকে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে এগোচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে অত্যাধুনিক টর্চ আর চকচকে খঞ্জর—যার বাঁটে খোদাই করা রক্তবর্ণ ত্রিশূল চিহ্ন।
নিচতলায় দাদু অতীশ তখন তাঁর ঘরের ইজি চেয়ারে স্থির হয়ে বসে। তিনি জানতেন ওরা আসবে। হঠাৎ সদর দরজায় সজোরে আঘাত পড়ল। কিন্তু দাদু বিচলিত হলেন না। তিনি আলমারি থেকে একটি প্রাচীন পিতলের ঘন্টা বের করে বাজাতে শুরু করলেন। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যেন সারা বাড়িতে এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল।
হামলাকারীরা যখন ড্রয়িং রুমের জানলা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল, তখনই ঘটল এক অলৌকিক কাণ্ড। সিঁড়ির মুখে হঠাৎ এক তীব্র নারকেল তেলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। হামলাকারীরা দেখল, ঘরের দেওয়ালে টাঙানো পূরবী দেবী এবং তাঁর ছেলে সমরের ছবি থেকে চোখ দিয়ে যেন রক্ত ঝরছে। ‘ত্রিশূল’ সংগঠনের সেই দুঁদে লোকগুলোও এই অলৌকিক দৃশ্যে থমকে গেল।
সুমন্ত ওপর থেকে দেখল, একজন লোক দাদুর ঘরের দিকে এগোচ্ছে। সে আর দেরি না করে ঘরের কোণে রাখা দাদুর সেই পুরনো ভারী লাঠিটা নিয়ে নিচে নেমে এল। কল্যাণ তার পিছু পিছু সেই মেডেলিন আর কম্পাসটা আঁকড়ে ধরে রাখল। তারা জানত, এই লড়াই শুধু অস্ত্রের নয়, এই লড়াই সরকার বংশের ঐতিহ্যের।
ঠিক যখন একজন আক্রমণকারী দাদুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, তখনই পেছনের দরজা দিয়ে ছায়ার মতো উদয় হলেন ইন্দ্র কাকু। তাঁর হাতে একটি আস্ত কাটারি। তিনি গর্জে উঠে বললেন, “অতীশদাকে ছোঁয়ার আগে আমার সাথে মোকাবিলা করো!”
এবার সুমন্তরা বুঝল, ইন্দ্র কাকু আসলে দাদুর নিযুক্ত করা এক অতন্দ্র প্রহরী, যিনি এতক্ষণ ছদ্মবেশে ‘ত্রিশূল’ বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন।
ইন্দ্র কাকুর কাটারির ভয় আর বাড়ির ভেতরে পূরবী দেবীর সেই অলৌকিক উপস্থিতির যুগলবন্দিতে ‘ত্রিশূল’ সংগঠনের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে গেল। তারা বুঝতে পারল, কৈপুকুরের এই সরকার বাড়ি কেবল ইট-পাথরের দেওয়াল নয়, বরং এটি এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
ত্রিশূল’ বাহিনীর নেতা—সেই কালো কোট পরা লোকটার সাগরেদ—চিৎকার করে উঠল, “পিছু হঠো! এ বাড়িতে শয়তান আর জ্যান্ত মানুষ এক হয়ে লড়ছে!”
তারা জানলা দিয়ে বাগানের দিকে লাফিয়ে পড়ল। ঝোপঝাড় মাড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো পাঁচিল টপকে অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল।
ইন্দ্র কাকু কাটারিটা নামিয়ে সুমন্ত আর কল্যাণের দিকে তাকালেন। তাঁর কপালে ঘাম। তিনি দাদুকে লক্ষ্য করে বললেন, “অতীশদা, ওরা এখনকার মতো পালালেও খুব একটা দূরে যায়নি। কৈপুকুরের মোড়ে ওদের একটা নীল রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ওরা শুধু ভোরের অপেক্ষা করছে।”
দাদু অতীশ ইজি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে সেই জটিল কম্পাসটি এখন স্থির হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে নির্দেশ করছে। তিনি সুমন্ত আর কল্যাণের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ওরা পিছু হটেছে মানেই ওরা বড় কোনো মরণপণ চালের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের হাতে সময় কম। সূর্য ওঠার আগেই আমাদের এই বাড়ি ছাড়তে হবে।”
মা পূর্ণা থরথর করে কাঁপছিলেন। তিনি ডায়েরি আর কল্যাণের কাছ থেকে মেডেলিন ও কম্পাসটা একটা ঝোলায় ভরে সুমন্তর হাতে দিলেন। “তোরা সাবধানে যাস বাবা। জিজীবিষার এই নকশা তোর বাবার মতো তোদেরও যেন কেড়ে না নেয়।”
সুমন্ত দৃঢ় গলায় বলল, “ভয় পেও না মা। ঠাকুমা যখন আমাদের পথ দেখাচ্ছে, তখন কিছু হবে না।”
দাদু ইশারায় ইন্দ্র কাকুকে বললেন গাড়ি বের করতে। বাড়ির পেছনের গোপন গেট দিয়ে তারা নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। কম্পাস আর মেডেলিনের সংযোগে এখন একটিই গন্তব্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— ‘পূরবী ভবনের তিনতলার ঠাকুরঘর যেখানে সুমন্তর ঠাকুমা দিনের বেশিরভাগ সময়টাই ধ্যান পূজা করে কাটাতেন’। অতীশ জানেন, ‘ত্রিশূল’ বাহিনীও সেখানে ওত পেতে থাকবে।

