এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস
             সপ্তম পর্ব

লোকটা প্রায় উন্মাদের মত সারা শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল।
আমি আমার বাড়ির দিকে নির্দেশ করলাম।আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা বলে উঠল
-আমি জানি তুমি কোথায় থাকো।কেমন?
লোকটা যেখানে বসেছিল সেখান থেকে উঠে পড়লে আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে অতি কষ্টে সেই মৃতের স‍্যুটকেসটি চৌকাঠ পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসে দেখলাম বাড়ির সামনে একটি লজ্ঝড়ে মার্কা শববাহী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে যার সঙ্গে দুটি রোগা কালো কঙ্কালসার ঘোড়াকে যুতে দেওয়া হয়েছে।ন‍্যুব্জ লোকটি একটি লম্বা চাবুক হাতে চালকের আসনে বসে ছিল।সে আমার প্রতি ভ্রূক্ষেপও করল না।আমি বেশ কষ্ট করেই স‍্যুটকেসটা গাড়িতে কফিন রাখার নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে দিয়ে নিজেও লাফিয়ে উঠে পড়লাম ।সিটে হেলান দিয়ে বসার ফলে চারিপাশের দৃশ‍্য দেখা যাচ্ছিল বেশ।আমি স‍্যুটকেসটা নিজের কাছটিতে টেনে নিলাম।শেষ পর্যন্ত সেটি আমার বুকের ওপর রেখে দুহাতে জাপটে ধরে বসে রইলাম।লোকটার হাতের চাবুক শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস কাটছিল আর ঘোড়াগুলো,যাদের হাপরের মত শ্বাস বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় ধোঁয়ার স্তম্ভের মতো নাসারন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে আসছিল,তারা দীর্ঘ কিন্তু নরম লাফে চলতে লাগল।
ওদের চিকন দুটি সম্মুখ পদ, যেন কোনো তস্করের হাত,আইনের দণ্ডে যার আঙুল কেটে গরম তেলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।সে দুটি মাটিতে খুব আলতোভাবে, প্রায় নিঃশব্দে আঘাত করছিল। ভেজা বাতাসে তাদের গলায় ঝোলানো ঘন্টাধ্বণি অদ্ভুত শোনাচ্ছিল। কেন জানি না, এক অবর্ণনীয় স্বস্তি এমনভাবে আমার আপাদমস্তক চারিয়ে গিয়েছিল যে আমি আর শববাহনের চলাচল প্রায় অনুভবই করতে পারছিলাম না। কেবল বুকের ওপর রাখা স্যুটকেসটির ভার অনুভূত হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তার মৃতদেহের এই ভার এই নিথর লাশ আজীবন আমার বুকের ওপরে বিরাজ করছে। ঘন কুয়াশা দুপাশের দৃশ‍্যপট ঢেকে দিল।শববাহী গাড়িটি দুলকি চালে পাহাড় সমতল নদী পার হয়ে যাচ্ছিল।আমার চারিপাশে এক অভূতপূর্ব দৃশ‍্যপট যা আমি কখনো কোনো স্বপ্ন অথবা জাগৃতিতেও দেখিনি।
রাস্তার দুপাশে উচ্চাবচ পাহাড় খাঁজকাটা শৃঙ্গ এবং অদ্ভুত সব দমবন্ধ করা অভিশপ্ত গাছের সারির ভেতর ধুসর ত্রিভূজাকৃতি ঘনকাকৃতি অথবা প্রিজম আকারের অন্ধকার শার্সিবিহীন নীচু জানালাগুলি দেখা যাচ্ছিল।এবার নতুন এক দৃশ‍্যপট।আমার চারপাশে। অপূর্ব। আমি আগেও একবার দেখেছিলাম বটে।সেই জানলাগুলো যেন জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে চলা রোগীর অস্থির চোখের মত।দেয়ালগুলোর শীতলতা মানুষের হৃদয়ের মধ‍্যে সেঁধিয়ে তাকে বরফ করে তুলবে।দেখে মনে হচ্ছিল যেন এখানে কোনো জীবন্ত প্রাণী বাস করে না।হয়তো এগুলো তৈরি হয়েছিল কোনো ইথারীয় ছায়াদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য।
মনে হচ্ছিল, গাড়োয়ান হয় আমাকে কোনো বিশেষ পথে নিয়ে যাচ্ছে, নয়তো ইচ্ছে করেই কোনো অচেনা গলিতে ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার দু’পাশে শুধু কাটা গাছের গুঁড়ি আর বেঁকে যাওয়া গাছের ডালপালা দেখা যাচ্ছিল। সেই গাছগুলোর আড়ালে ছিল উঁচু-নিচু জ্যামিতিক আকৃতির ঘর।কিছু শঙ্কু আকৃতির, কিছু আবার কাটা কোণের মতো। সব ঘরেরই ছিল সরু, বাঁকা জানালা।সেখান থেকে কালো লিলি ফুল লতিয়ে এসে দরজা আর দেয়াল ধরে নিয়েছিল।
হঠাৎ করেই পুরো দৃশ্যটা ঘন কুয়াশার মধ‍্যে হারিয়ে গেল!সগর্ভা ভারী মেঘ পাহাড়ের চূড়াগুলোকে আগলে বসেছিল, আর ধুলিকণার মতো ভাসমান বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। অনেকক্ষণ চলার পর শববাহী গাড়িটি এক উঁচু, শুষ্ক পাহাড়ের কাছে এসে থামল। আমি স্যুটকেসটা সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম।
পাহাড়ের আড়ালে ছিল এক নির্জন, শান্ত আর মনোরম স্থান।এমন এক জায়গা, যা আমি আগে দেখিনি। তবু কেমন জানি চেনা লাগছিল।আমার কল্পনার অতীত ছিল না।মাঠটা কালো লিলির লতায় ছেয়ে ছিল যেন এযাবৎ কোনো মরণশীল প্রাণীই এখানে পদার্পণ করেনি।আমি সুটকেসটা নামিয়ে রাখলাম।বৃদ্ধ গাড়োয়ান মুখ ফিরিয়ে বললো,
এই জায়গাটা শাহ আব্দুল আজিমের কাছেই।এটার থেকে ভালো কোনো জায়গা আর নেই।এমনকি একটা পাখিও মিলবে না এখানে।তাই না? আমি গাড়ি ভাড়া মেটাবার উদ্দেশ‍্য পকেটে হাত ঢোকালাম।সেখানে কেবল একটি কিরান এবং একটি আব্বাসি মাত্র পড়ে ছিল।গাড়োয়ান বিরক্তিকর অট্টহাস‍্যের সঙ্গে বলল, আরে ছাড়ো তো!পরে দিও ক্ষণ।আমি জানি তুমি কোথায় থাকো।আমি তোমার জন‍্যে সবকিছু করতে পারি।এখন আমাকে একটা কথা বলো তো,যদ্দূর মনে হয়,কবর খোঁড়ার বিষয়ে আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞ।তুমি বুঝতে পারছ তো?লজ্জা পেয়ো না।চলো নদীর দিকে যাই।ওই সাইপ্রাস গাছটার কাছে। সুটকেসটার মাপে একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলি।তারপর আমি চলে যাব।
কল্পনাতীত তৎপরতায় সেই বৃদ্ধ গাড়োয়ান গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল।আমি সুটকেসটা তুলে নিলাম এবং দুজনে মিলে শুকনো নদীর প্রান্তে সেই গাছের গুঁড়িটার কাছে গেলাম।সে বললো,
এই জায়গাটা ভালো? কালবিলম্ব না করেই সে তার শাবল ও বেলচা তুলে নিয়ে মাটিতে গর্ত খুঁড়তে শুরু করে দিল।আমি সুটকেশটা মাটিতে নামিয়ে রেখে অবাক হয়ে তাকেই দেখছিলাম। বৃদ্ধ মানুষটি কি ভীষণ তৎপরতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে কাজটি করছিল।মাটি খুঁড়তে গিয়ে সে একটা চকচকে পাত্র আবিষ্কার করল আর সেটিকে একটা ময়লা রুমালে জড়িয়ে ফেলল। শেষে সেই গর্তের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, এই যে গর্ত!হাহ! এটা একেবারে বাক্সের মাপের। এক চুলও কমবেশি হবে না।হাহ্
তার মজুরি মিটিয়ে দিতে পকেটে হাত ঢোকালাম।সেখানে দুটি কিরাণ ও একটি আব্বাসী ছাড়া আর কিছুই ছিল না।বৃদ্ধ অট্টহাসির সঙ্গে বলে উঠল,
_আরে ব্যস্ত হয়ো না! ছাড়ো তো!আমি জানি তুমি কোথায় থাকো। তাছাড়া আমার পারিশ্রমিক আমি পেয়ে গেছি।এই যে এটা প্রাচীন রে শহরের একটি বায়ুরোধী কাঁচেরপাত্র!
কথাটা বলেই সে আবার হেসে উঠলো।হাসির দমকে তার শরীর ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো।একটা ময়লা রুমাল দিয়ে পাত্রটি ঢেকে বগলদাবা করে সে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। তারপর তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসল চালকের আসনে।তার হাতের চাবুক বাতাসের গায়ে শব্দ তুলতেই হেঁপো ঘোড়া দুটি হাঁটতে শুরু করল।ভেজা আবহাওয়ায় তাদের গলার ঘন্টি অদ্ভুত ভাবে বাজছিল,দেখতে দেখতে গাড়িটি ক্রমে ঘন কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

এতোক্ষণে একলা হতে পেরে স্বস্তি বোধ করলাম।একপ্রকার মধুর শান্তি আপাদমস্তক জড়িয়ে নিল আমায়।চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম,কালো কুচকুচে পাহাড়শ্রেনীতে ঘেরা একটা ছোট্ট জায়গা।সেখানে বেশ কিছু পুরনো শক্ত ইটের তৈরি প্রাচীন ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে।একটা নির্জলা নদীখাতও দেখা যাচ্ছিল।জায়গাটা বেশ একানেমতো নিরিবিলি আর আরামদায়কও।আমার ভাবতে ভালো লাগছিল যে,যখন ওই দীঘল চোখদুটি জেগে উঠবে তখন সে নিজেকে তার রূপ ও মেজাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই স্থানটিতে খুঁজে পাবে!
যে মেয়েটি আজীবন মানুষের সাথে দূরত্ব রেখেই জীবন কাটিয়েছে মৃত‍্যুর পরেও তাকে অন‍্যান‍্য মৃতের থেকে দূরেই থাকতে হবে।আমি সাবধানে সুটকেসটি তুলে নিলাম এবং গর্তের মাঝখানে রাখলাম। সেটি হুবহু সুটকেসের মাপেরই ছিল।এক চুলও কম নয়।আর একটিবার ফিরে তাকাবার সাধ হলো।এই শেষ দেখা। চারিপাশে চোখ বোলালাম।কোনো প্রাণের চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। আমি পকেট থেকে চাবি বার করে সুটকেসটা খুলে ফেললাম।

(ক্রমশ)

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত লোকটা প্রায় উন্মাদের মত সারা শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল।আমি আমার বাড়ির দিকে নির্দেশ করলাম।আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা বলে

Read More »

Privious Cover Stories

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত লোকটা প্রায় উন্মাদের মত সারা শরীর কাঁপিয়ে হাসছিল।আমি আমার বাড়ির দিকে নির্দেশ করলাম।আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা বলে

Read More »

সময়ের আলোকে একুশে ফেব্রুয়ারি

।। শুভাশিস ঘোষ ।। জাতি হিসেবে বাঙালির গর্ব করার মতো এক অনন্য দিন—একুশে ফেব্রুয়ারি। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সেই পবিত্র ভূমিতে আজ যখন নানা প্রতিকূলতার ছায়া

Read More »