ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

শ্যামলী রক্ষিত 

চতুর্থ পর্ব

দীপালী চলে যাওয়ার পর থেকেই মিতাকে যেন এক অদৃশ্য বিষণ্ণতার ভারী প্রলেপ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। গভীর এক দুঃখবোধে সে আপাদমস্তক ডুবে আছে। কঠিন এক কষ্টের ভেতর ঘোরাফেরা করছে তার সমস্ত মনপ্রাণ—শরতের অচেনা মেঘেদের মতো এক অস্থায়ী উন্মাদনা। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে সে একা, অপেক্ষা করছে কখন তুষার ঘুম থেকে উঠবে।

এত বড় একটি ফ্ল্যাটে একাকী, নিঃশব্দ যাপন যে কতটা অসহ্য—তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মিতা। টিংকু যখন বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন থেকেই এই নিঃসঙ্গতার ব্যথা সে তীব্রভাবে অনুভব করেছে। এরকম করে বেঁচে থেকে আদৌ কোনও লাভ আছে কি? হয়তো নেই। কিন্তু উপায়ও তো কিছু নেই। ছেলেকে তো বাইরে ছাড়তেই হবে—এখানে তো কিছুই নেই! এখানে থেকে সে-ই বা করবে কী?

এইসব পাঁচরকম ভাবনা ভেবেই চলেছিল সে। কিন্তু বুকের মধ্যে ধিকিধিকি করে জ্বলছিল সুদীপার মুখটা। এক আতঙ্ক ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল শরীরের প্রতিটি কোষে—যদি সুদীপার মতো তাকেও কেড়ে নেয় করোনা! বলাই যায় না—এ পর্যন্ত পৃথিবীতে কত ডাক্তার তো মারা গিয়েছেন! প্রতিটি মুহূর্তে যাদের মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে হচ্ছে, তাদের কাছে জীবন আর মৃত্যুর দূরত্ব যেন প্রায় শূন্য। তাহলে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কোথায়?

এই ভয়ংকর সময়েও তার চরিত্রে এতটুকু পরিবর্তন এল না! বেঁচে থাকাটাই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে মন থেকে নীচতা দূর হল না। এদিকে সুদীপার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে সে! দীপালী তো তার তেমন আপনজন নয়। বেঁচে থাকতে যদি কাছের মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা বোঝা না যায়, তবে মৃত্যুর পর হাহুতাশ করে কী লাভ?

এই মুহূর্তে বারবার সুদীপার কথাই মনে পড়ছে তার। যদি সে আরও একটু সতর্ক হত! আরও ভালো করে বোঝাত, আরও বেশি সময় দিত—তাহলে হয়তো এমনটা ঘটত না। প্রথম দিন থেকেই সুদীপার সঙ্গে তার এক আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। খুব মিষ্টি মেয়ে ছিল সে। সেদিন অনেক কথা বলেছিল দু’জনে। যদিও প্রায়ই কথা হত, কিন্তু সেদিন দু’জনেই ভীষণ সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছিল।

মিতা বারবার বোঝাতে চেয়েছিল—

“দেখো সুদীপা, কারও ওপর অভিমান করে কোনও কাজ কোরো না। ভুল করে জেদ করে নিজের জীবনে এত বড় ঝুঁকি নেবে কেন? কত মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে! এই ভয়ংকর মহামারিতে প্রত্যেকেই অনিশ্চিত জীবনের দিন গুনছে। সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে তো আমাদেরই ঝাঁপিয়ে পড়তে হচ্ছে। এটাই আমাদের জীবন, আমাদের জীবিকা—জানি। কিন্তু তাই বলে নিজের জীবনটাকে কেন এতটা ঝুঁকির মুখে ফেলবে? আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার আগে একবার ভেবো না?”

সুদীপা বলেছিল—

“আগে-পিছে ভাবার আর আছে কী, দিদি? আমাদের জীবনের কী দাম আছে বলুন?”

—“এমন কথা কেন বলছ? তুমি একজন সিনিয়র সিস্টার। তোমার কাজে হাসপাতালের সবাই ভীষণ সন্তুষ্ট। সবার মুখে তোমার নাম। কোনও রোগী একবার তোমার সাহচর্য পেলে বারবার তোমাকেই চায়। বলে—‘সুদীপা সিস্টার খুব ভালো।’ এমন সুন্দরভাবে ইনজেকশন পুশ কর যে বোঝাই যায় না! পাকাদরদী হাত, তার সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার। শুধু একজন নয়—সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে। এত সফল সার্ভিস লাইফ তোমার! এই সময় অন্তত একটু সাবধানে থাকতে হবে। তোমার তো তোমার বাচ্চার কথাটাও মনে রাখতে হবে!”

এরপরই সুদীপার মুখ থমথমে হয়ে গিয়েছিল। চোখের পাতায় ফুটে উঠেছিল জলের রেখা। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল সে। মিতার খুব খারাপ লাগছিল। এত হাসিখুশি মেয়েটা এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছে—মানে ক্ষতটা গভীর।

হাসপাতালে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই দেখছে তাকে—ঠোঁটে হাসি লেগে থাকা মুখ, অপূর্ব এক স্নিগ্ধতার রেখা। সেদিনই পরিচয়ের পর কত গল্প করেছিল তারা! কবে যে তাদের সম্পর্ক এত নিবিড় হয়ে উঠেছিল—নিজেরাও বুঝতে পারেনি। মিতা কোনওদিন মনে রাখেনি যে সে ডাক্তার আর সুদীপা সিস্টার।

কিন্তু সেদিন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে ভীষণ কষ্টে আছে। এখন বুঝতে পারছে—তার বুকের ভেতর তোলপাড় চলছিল। গভীর ক্ষত নিয়ে নীরবে বসেছিল সে। মিতা অপেক্ষা করছিল—নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় দিচ্ছিল তাকে।

অবশেষে সুদীপা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল—

“মেয়েটাকে কতদিন চোখে দেখিনি দিদি! এক বছর হতে চলল করোনা নিয়ে আমাদের লড়াই চলছে—ততদিন বাড়ি যাইনি। শাশুড়ি মায়ের কড়া নির্দেশ—হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসা যাবে না। চাকরি করছ, যেতেই হবে—কিন্তু বাড়িতে ঢুকে আতঙ্ক ছড়াবে, তা হবে না। দরকার হলে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকো। কিন্তু বিনুকে কোথাও যেতে দেব না। তোমরা মা-মেয়ে যেতে পারো।”

পরদিন ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরে সে দেখেছিল—মুখের উপর দরজা বন্ধ। কলিং বেল বাজিয়েও, ফোন করেও কোনও সাড়া নেই। ভেতর থেকে মেয়ের কান্না শুনতে পাচ্ছিল সে। বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল—কিছুই করতে পারেনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সামনে আমগাছের ছায়া দীর্ঘ হতে হতে ঢেকে দিল তাকে। তারপর সন্ধ্যা নামল—রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলল। চারপাশে নিস্তব্ধতা। অন্ধকারের কড়াল বাহু ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে আর পারেনি—ফিরে গিয়েছিল হোস্টেলে।

সারারাত ছটফট করেছে সে। এক ফোঁটা ঘুম আসেনি চোখে।

—“একজন শিক্ষিত, স্বাবলম্বী মেয়ে হয়ে এত অত্যাচার সহ্য করছ কেন? দরকার হলে কোর্টে যাও, সেপারেশন নাও”—বলেছিল মিতা।

সুদীপা উত্তর দিয়েছিল—

“মেয়েটা তার বাবাকে খুব ভালোবাসে। ওকে ছাড়া থাকতে পারবে না। ও তো বাচ্চা—এখনও এসব বোঝে না। ছোট থেকে ওর বাবাই বেশি সময় দিয়েছে। তাই ও বাবান্যাওটা। জোর করে নিয়ে এলে ওর শরীর খারাপ হবে। আর এই পরিস্থিতিতে আমিও তো ওকে ছুঁতে পারব না! আতঙ্কে কাঁপব। তার চেয়ে ও যেখানে ভালো আছে, থাকুক। আমার কষ্ট হোক—সয়ে যাবে। এখন বাঁচা-মরা আমার কাছে সমান।”

এরপর আর কী বলবে বুঝতে পারেনি মিতা। মাথা ঝিমঝিম করছিল। চোখ ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল। সেই মিষ্টি হাসি ভরা মুখটা মনে পড়ে বুকের ভেতর হাহাকার উঠছিল।

এত কিছু দেখেও কোনও শিক্ষা হল না! তারপরও দীপালীর সঙ্গে এমন ব্যবহার করল কী করে—ভাবতেই নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার।

(চলবে )

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

অশোক ও ধর্মরাজনীতি

অহিংসার রাজপথে ভারত ধর্মপ্রচার, শিলালিপি, বিশ্বদৃষ্টি নবকুমার দাস  ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ Coming soon

Read More »

আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

বিতস্তা ঘোষাল খুব ছোটোবেলায় আমাগো এক দ্যাশ ছিল কথাটা প্রায়ই শুনতাম। তখন ভাবতাম বাংলা দেশ থেকে যারা বাধ্য হয়ে এদেশে চলে এসেছেন তাঁরাই বুঝি এমন

Read More »

Privious Cover Stories

অশোক ও ধর্মরাজনীতি

অহিংসার রাজপথে ভারত ধর্মপ্রচার, শিলালিপি, বিশ্বদৃষ্টি নবকুমার দাস  ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ Coming soon

Read More »

আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

বিতস্তা ঘোষাল খুব ছোটোবেলায় আমাগো এক দ্যাশ ছিল কথাটা প্রায়ই শুনতাম। তখন ভাবতাম বাংলা দেশ থেকে যারা বাধ্য হয়ে এদেশে চলে এসেছেন তাঁরাই বুঝি এমন

Read More »