আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

বিতস্তা ঘোষাল

খুব ছোটোবেলায় আমাগো এক দ্যাশ ছিল কথাটা প্রায়ই শুনতাম। তখন ভাবতাম বাংলা দেশ থেকে যারা বাধ্য হয়ে এদেশে চলে এসেছেন তাঁরাই বুঝি এমন কথা ভাবেন।আরেকটু বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম শুধু তাঁরা নন, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দারা যে যেখান থেকে কলকাতায় এসেছেন তাঁরা তাঁদের সেই জেলাকেই দেশ বলে অভিহিত করেন, ভুলেও কলকাতার বাসিন্দা বলেন না নিজেদের, এমনকি এই ভারত নামক যে দেশটি এত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বলিদানে স্বাধীন হয়ে স্বতন্ত্র দেশ হয়ে উঠল সেটাও তাঁর দেশ নয়। সম্প্রতি নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে দেখছি ফেসবুকে একদল মানুষ আরেকদলকে উদ্দেশ্য করে লিখছেন এদেশ থেকে বিদেয় হও।এমনকী ভিন রাজ্যে বাংলা ভাষায় বা মাতৃভাষায় কথা বললে পিটিয়ে মেরে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন? তাঁরা সবাই তো একটি ঘটনার জন্য দায়ী নন। আবার তেমনি  হিন্দুদের মেরে উৎসব করার পাশাপাশি যারা সেই মধ্যযুগ থেকেই এদেশের বাসিন্দা সেই মুসলিমদের তাড়িয়ে দিলেও কি এই সব সমস্যা চিরকালের জন্য দূর হবে?আর এখানেই মনে প্রশ্ন আসে আমরা কারা? আমরা ওরা এই বিভাজন বাদ দিয়ে আমরা কি ভারতীয় নই?

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় দেখেছি অধিকাংশ মানুষ নিজেদের পরিচয় ভারতীয় বলার থেকে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ নিজের রাজ্যের বা জাতের পরিচয়ে। একমাত্র ক্রিকেট খেলার মুহূর্তগুলোতে তাও ভারতীয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনাদেখা যায়, কিন্তু তাও অঞ্চল ভিত্তিতে। বহু জায়গাতে এও দেখেছি পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে তাদের পতাকা ওড়ে, শ্লোগানও ওঠে তাদের সমর্থনে।কেউ ভালো খেললে একশো বার তাকেই সমর্থন করা উচিত, কিন্তু একই সময় ভারতকে গাল দিলে খারাপ লাগে বৈকি।সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে আমার পরিচিত এক  ৮২ বছরের মহিলা আজও মনে করেন তাঁর দেশ জন্মসূত্রে  বর্ধমান, বিবাহ সূত্রে মুর্শিদাবাদ। আর কলকাতা! সে আবার থাকার জায়গা নাকি! অথচ ৩০ বছর ধরে তাকে বোঝানোই গেল  না আমাদের দেশ একটাই।তার নাম ভারত। এ অভ্যাস বিভিন্ন মানুষের মধ্যেই। শিক্ষিত অশিক্ষিত নিরক্ষর স্বাক্ষর বেশিরভাগ এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত, এভাবেই বড়ো হয়েছেন।  

আবার যদি অন্য দিক দিয়ে বিচার করি, দেখা যায় উত্তর পূর্ব ভারতের যেমন অরুনাচল প্রদেশ, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম কিম্বা ত্রিপুরা থেকেও যদি কেউ বাকি ভারতে পড়াশোনা, বা কর্ম সূত্রে যায় তবে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এয়্যারপোর্ট সর্বত্রই তাদের হেনস্থা করা হয়,তারাও যে ভারতের অন্তর্ভুক্ত তা বাকি জনতা ভুলেই যান। ঠিক যেমন এখন কাশ্মীর থেকে বিভিন্ন প্রদেশে থাকা মানুষের হচ্ছে।তারাও যে ভারতীয় তা ভুলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের ইতিহাস দেখলেই এর পিছনের সাইকোলজি দেখা যায়। প্রাচীন ভারতে যখন কোনো জাতিভেদ ছিল না, এত রাজ্য এত প্রদেশও গড়ে ওঠেনি তখনো যদি দেখি ছোটো ছোটো রাজারা নিজেদের অস্তিত্ব বোঝাবার জন্য সেই অঞ্চলের নাম দিয়েই নিজের পরিচয় দিতেন। রামায়ণ মহাভারত পড়লেই তার হাজার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। মিথিলা রাজ, কোসল রাজ, অযোধ্যার রাজা ইত্যাদি। আর ছিল বংশ দিয়ে পরিচয়। যেমন মৌর্য, চালুক্য , সূর্য , চন্দ্র, পাল, সেন, কুরু বংশ, পাণ্ডব, যাদব, প্রভৃতি। আর ছিল আদিবাসি যারা আজ তপশিলি, উপতপশিলি বলে চিহ্নিত।

অর্থাৎ ভারতীয় বলে কোনও ধারণা তখন ছিল না। যদিও মহাভারতে কৃষ্ণের মুখে অখণ্ড ভারত গড়ার কথা এবং ভারতীয় হবার কথা শোনা গেছিল।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আমাদের বাকি কোনো মহাকাব্য বা শাস্ত্র বা পুঁথিতে এই অখণ্ড ভারতের কনসেপ্ট সেভাবে ছিল না। অথচ ছিল সনাতন, হিন্দু ধর্ম, শৈব ধর্ম।এর পর এল বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, বৈষ্ণব প্রমুখ ধর্ম। এই পরবর্তী ধর্মগুলো কিন্তু হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই উৎপন্ন হয়েছিল।ব্রাহ্মণ্য বাদের বিরুদ্ধে বাঁচার অক্সিজেন জুগিয়েছিল এই ধর্মগুলো, নারীদের বাইরে এনেছিল, শিক্ষার, মর্যাদা নিয়ে বাঁচার কথা বলেছিল। ফলে মানুষ বিশেষ করে দুই শ্রেণীর মানুষ রাজা ও নিম্নবিত্ত প্রজারা এই ধর্মগুলোকে আপন করে নিয়েছিল।

এর পর এল মুসলিম ও খ্রিষ্টান।একের পর এক মুসলিম শাসকদের এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাসক হিসাবে অবতীর্ণ হওয়া, নিম্নবিত্তদের ধর্ম বদলে বাধ্য করল। অবশ্য নানান সুযোগ সুবিধা দিয়েই এটা করা হচ্ছিল, তার পেছনে একটা সহজ রসায়ন ছিল।বিভিন্ন কর থেকে ছাড়, এবং থাকার জন্য বাসস্থান দেওয়া। অবশ্য সর্বক্ষেত্রে এমন ছিল না। বশ্যতা স্বীকার করানো,সম্পত্তি দখল করে নেওয়া ইত্যাদিও ছিল।

কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ করলেই বোঝা যায় তারা বা যেকোনো শাসক এদেশ আক্রমণ করলেও কখনোই ভারতীয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করেনি, বা কোনো একজন রাজার হাতেই পুরো দেশ চলে গেছে এমনটিও ঘটেনি। ফলে স্থানীয় আঞ্চলিক স্তরেই এই প্রভাব থেকে গেছে। বাইরে থেকে আগত শত্রুর সঙ্গে যেমন এদেশের মানুষকে লড়তে হয়েছে,তেমনি নিজেদের দেশের মানুষের সঙ্গেও সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হয়েছে। ঘুরী বা তুঘলক যেমন মন্দির ভেঙে লুঠ করেছে ঠিক তেমনই মরাঠী বর্গীদের হানাতেও মানুষ ভয়েআতংকে থেকেছে।এর পর সুলতান বংশ এদেশের অনেকটাই দখল নিলেও মোঘল বংশের আকবরই বোধ হয় এক মাত্র সম্রাট প্রায় সমস্ত হিন্দুস্তানের সম্রাট হতে পেরেছিলেন।এবং চেষ্টা করেছিলেন একই রকম পরিকাঠামো সবার জন্যই গড়ে তুলতে।কতটা সফল আর ব্যর্থ হয়েছিলেন তা ইতিহাস পড়লেই জানা যায়। তবে হিন্দুস্তানের বেতাব বাদশা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি কিছুটা হলেও।

এই যে প্রথম বিদেশি শক্তি পারস্যরাজ আখামেনিয়, এবং তারপর গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের আক্রমণ থেকে আকবরের আগে পর্যন্ত সময়টা দেখলেই বোঝা যায় এ দেশ কখনোই শুধু হিন্দু শুধু বৌদ্ধ, বা জৈন বা শৈব বা মুসলিমদের ছিল না। শক, হুন, গ্রীক, পাঠান সব জাতি এসে এখানে বার বার আক্রমণের পাশাপাশি মিশেও গেছে, ধর্ম পরিবর্তন হয়েছে, সেই নামেই চিহ্ণিত হয়েছে।কিন্তু কখনোই নিজেদের ভারতীয় বলেনি।অথচ ইবন বতুতা, বা চিন থেকে আগত একাধিক পরিব্রাজক ও সাধকদের বা লুঠেদের কাছে এই দেশটা হিন্দুস্থান বা সিন্ধু প্রদেশ ভারত নামেই পরিচিত ছিল, প্রমাণ তাঁদের লেখা পুঁথি।

ব্রিটিশরা এসে শাসন করার সময় এটা স্পষ্টভাবে বুঝেছিল এই দেশ আসলে বিভিন্ন ভাষা জাতি বর্ণের সংমিশ্রন। তাদের একত্রে কোনো নাম নেই। একের পর এক রাজ্য মুসলিম শাসকদের হাতে চলে যাওয়ায় এই বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন রাজাদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের ক্ষোভ যেটুকু ছিল তাকেই কাজে লাগিয়ে তারা দেশটাকে শাসন করতে চেয়েছিল।কিন্তু পূর্বের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো দেশটাকে খ্রীষ্টান বানাবার প্রচেষ্টা তারা না করায় সব পক্ষই কোনো না কোনো ভাবে তাদের সমর্থন করেছিল নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে।আর তারা যে সফল হয়েছিল তার পরিচয় ৩০০ বছরের ইতিহাস।এমনকি যদি আমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকেও দেখি তাহলেও দেখা যায় তা গোঁড়াতে শুরু হয়েছিল স্থানীয়, ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজ্য বাঁচাবার তাগিদে।নিজেদের অস্তিত্বর সংকট হলে তবেই তারা লড়াই করেছে, নতুবা চুপ থেকেছে। অনেক পরে মাত্র হাতে গোণা ক’জন মানুষের কথাই বলা যায় যাঁরা জাত ধর্ম ভুলে সব মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন।কিন্তু ততদিনে শাসক দ্বিজাতি-তত্ত্বর বীজ বপন করে ফেলেছে মানুষের মনে, যার ফল এই উপমহাদেশের তিনটিরাষ্ট্রেরই মানুষ ভোগ করছেন। আর হিন্দু- মুসলিম এই বিভাজন এতটাই মানুষের মনের গভীরে শিখর বিছিয়ে রেখেছে যে যেকোনো সময়ই তার বহির্প্রকাশ ঘটছে। এর ফলে কোথাও কিছু হলে নিরপরাধ হিন্দুও যেমন রক্তাত্ব হচ্ছে কাফের বলে, মুসলিমও তেমন আক্রান্ত হচ্ছে গদ্দার বলে। আমরা কেউ একবারও ভেবে দেখছি না আসলে রক্তাত্ব হচ্ছি ভারতীয়রাই। তা মণিপুর, মুর্শিদাবাদ, কাশ্মীর, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ যেখানে খুশি, যখন খুশি হতে পারে।

সদ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাষার অস্মিতা, প্রতিটি রাজ্য এই অস্মিতাকে প্রমোট করতে গিয়ে অন্য ভাষা-ভাষীদের হেনস্থা করে চলেছে অহরহ।যেকোনো ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে।আদান-প্রদানেই তা জল হাওয়া পেয়ে পরিপূর্ণ হয়।এই মুহূর্তে অন্যর ভাষার ওপর জোর করে আরেকজনের ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ফলে নীরবে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ভারতের বহু ভাষা।বাধ্য করা হচ্ছে নতুন একটি ভাষায় কথা বলতে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো যত্ন আইন প্রচেষ্টা নেই কারোরই। যেন এটাই অনিবার্য। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখলেআখেড়ে যে ভারতীয় হিসাবে আমাদেরই উপকার সেটাই ভুলে গেছি আমরা।

তার পরেওযেকোনো ধর্ম, জাত, লিঙ্গ বাদ দিয়েও সারা পৃথিবী এই ভারতীয় পরিচয়েই চেনে আমাদের। বাইরে গেলে আমরা আর হিন্দু, মুসলিম, জৈন, বৌদ্ধ, গুজরাতি, মরাঠি, বাঙালি থাকি না। যেকোন ফর্ম ফিল আপ করতে গেলেও কাস্ট এবং জাতি হিসাবে এ কেবল ভারতীয়ই লিখতে হয়।পরিবার, স্কুল, কলেজ, সরকার এবং রাষ্ট্র যতদিন না এই বিষয়টা আইন করে বাধ্যতা মুলক করবে, এই পরিচয়টায় যতদিন না আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠব ততদিন বিভাজন, ঘৃণা, হত্যা, বিভেদ, বিশেষ সুযোগ সুবিধা, তোষণ ইত্যাদি চলবে।এবং একদল রাজনীতিবিদ সেটার সুযোগ নিয়ে হিংসাকে বারুদে সেঁকে আমাদের একেবারেই যারা আম জনতা তাদের নিয়ে খেলবে। 

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

অশোক ও ধর্মরাজনীতি

অহিংসার রাজপথে ভারত ধর্মপ্রচার, শিলালিপি, বিশ্বদৃষ্টি নবকুমার দাস  ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ Coming soon

Read More »

আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

বিতস্তা ঘোষাল খুব ছোটোবেলায় আমাগো এক দ্যাশ ছিল কথাটা প্রায়ই শুনতাম। তখন ভাবতাম বাংলা দেশ থেকে যারা বাধ্য হয়ে এদেশে চলে এসেছেন তাঁরাই বুঝি এমন

Read More »

Privious Cover Stories

অশোক ও ধর্মরাজনীতি

অহিংসার রাজপথে ভারত ধর্মপ্রচার, শিলালিপি, বিশ্বদৃষ্টি নবকুমার দাস  ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ Coming soon

Read More »

আমরা ভারতীয় এই পরিচয় কবে দেব ?

বিতস্তা ঘোষাল খুব ছোটোবেলায় আমাগো এক দ্যাশ ছিল কথাটা প্রায়ই শুনতাম। তখন ভাবতাম বাংলা দেশ থেকে যারা বাধ্য হয়ে এদেশে চলে এসেছেন তাঁরাই বুঝি এমন

Read More »