।। শুভাশিস ঘোষ ।।
জাতি হিসেবে বাঙালির গর্ব করার মতো এক অনন্য দিন—একুশে ফেব্রুয়ারি। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সেই পবিত্র ভূমিতে আজ যখন নানা প্রতিকূলতার ছায়া ঘনিয়ে আসে, তখন ইতিহাসের চাকা যেন উল্টো দিকে ঘোরানোর এক নির্মম প্রয়াস প্রত্যক্ষ করছে সমগ্র বঙ্গভাষী বিশ্ব। লজ্জার হলেও সত্য—যারা ধ্বংসের উল্লাসে মত্ত, তারাও আজ কথা বলে আমাদের মাতৃভাষাতেই। যে ভাষায় তারা ‘সোনার বাংলা’-কে বিভাজনের উল্লাসভূমিতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখে—সেটিও বাংলা; যে ভাষায় বাংলার জয়গান করলে হুঙ্কার তুলে দমন করা হয়—সেটিও বাংলা।
বিশ্বের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ শহিদের রক্তে রঞ্জিত যে ভূমি, সেই ভূমিতেই আজ বিভেদের উল্লাস—এ এক গভীর বেদনার সময়। আজকের বাংলাদেশ আবার পূর্ব পাকিস্তানের ছায়ায় ফিরে যাবে, নাকি পুনরায় বাঙালি জাতিসত্তার পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে—তার উত্তর সময়ই দেবে। গত কয়েক বছর ধরেই আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে উদযাপন করছি এক সংকটময় প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে।
পৃথিবীর সিংহভাগ বাঙালির মূল ঠিকানা—দুই বাংলা। সীমান্তের রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও ভাষা, সংস্কৃতি, বাসভূমি, ভালোবাসা—সবেতেই আমাদের পরিচয় ছিল অভিন্ন। খাদ্যাভ্যাসে, ধর্মাচরণে, অতিথি আপ্যায়নে—একটি যৌথ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে চলেছি আমরা। কেবল মাতৃভাষার আবেগের প্রশ্নে আমরা ঈর্ষার চোখে দেখতাম ওপার বাংলাকে।
কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে—রফিক, বরকত, সালাম, জব্বারদের উত্তরসূরিরা কোথায়? মৌলবাদী শক্তির সামনে কি মিলিয়ে যাচ্ছে ভাষা-চেতনার উত্তরাধিকার? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্র বিক্ষোভে নেমে আসে নির্মম গুলি। শহিদ হন রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার ও আরও অনেকে। সেই রক্তস্নাত পথেই ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণআন্দোলনে।
১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা স্বীকৃতি পায় পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। কিন্তু ততদিনে মাতৃভাষার আবেগ স্পর্শ করেছে সর্বোচ্চ সীমা। ভাষা আন্দোলন ক্রমে রূপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ থেকে ‘বাংলাভাষার রাষ্ট্র চাই’—এই স্লোগানই জন্ম দেয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নকে।
অনেক রক্ত, ঘাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নেয় ভাষাভিত্তিক বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ।
এই আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়েই ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাতিসংঘর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গোটা বিশ্বে পালিত হতে থাকে দিনটি।
প্রযুক্তির কল্যাণে আজ বিশ্ব এক ভুবনগ্রাম। তাই এপার বাংলার খবর যেমন ওপারে পৌঁছে যায় মুহূর্তে, তেমনই ওপারের সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তনের অভিঘাতও অনুভূত হয় এপার বাংলায়। রাজনৈতিক আধিপত্যের আড়ালে বহু সময়েই জনমানসের গভীরে প্রবাহিত বিপরীত স্রোত প্রকাশ্যে আসে না। অথচ সেই স্রোতই কোনো সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে, এপার বাংলার ছবিটাও কি খুব আশাব্যঞ্জক?
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অবদান প্রশ্নাতীত। তবুও স্বাধীনোত্তর ভারতে ক্রমশ কোণঠাসা হয়েছে বাঙালি—এ বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। আজ বাংলাভাষায় কথা বললেই অনেক সময় ‘বাংলাদেশি’ তকমা জুটছে। যে ভাষায় কথা বলতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেই ভাষার ভারতীয়ত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
বঙ্গভাষীর দুই প্রধান বাসভূমিতেই আজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংকটের মুখোমুখি।
তবে আশার আলো নিভে যায়নি। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল মানুষের সংখ্যা এখনও নেহাত কম নয়—ওপারেও, এপারেও। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার ভিত এখনও অটুট বহু মানুষের মধ্যে।
এই প্রেক্ষিতে এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এপার বাংলায় এক শ্রেণির মানুষ আজ মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন। তথাকথিত শিক্ষিতদের আড্ডায় ইংরেজি বা হিন্দির প্রাধান্য—বাংলা উচ্চারণে যেন কৌলীন্যহানি ঘটে! নতুন প্রজন্মের কত শতাংশ আজ বাংলা হরফে সাবলীল? ইংরেজি হরফে বাংলা লেখালেখি দেখে আমরা কি সত্যিই বিচলিত হই?
বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামফলক, গণপরিবহনের নির্দেশিকা, সরকারি বিজ্ঞপ্তি—সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষায় হওয়া কতটা জরুরি, তা কি আমরা ভাবি?
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ‘নবজাগরণ’ নামে এক সংগঠন এই প্রশ্নগুলো সামনে এনেছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় , তরুন মজুমদার প্রমুখ বিশিষ্টজন যুক্ত হয়েছিলেন সেই প্রয়াসে। কিন্তু পর্যাপ্ত সামাজিক সাড়া না মেলায় উদ্যোগটি স্তিমিত হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রশ্ন চূড়ান্ত সংকটে না পৌঁছালে তা বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয় না। আজকের বাঙালির বিপন্নতা কি তেমন কোনো পরিস্থিতির জন্ম দেবে?
আমরা কি সকল মাতৃভাষাকে সম্মান জানিয়েই নিজের মাতৃভাষার অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হব? নাকি সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকব?
এই প্রশ্নটাই হোক এবারের ভাষা দিবসের মূল ভাবনা।


