বিলাসী সিংহর নাতির বিয়ে

বিলাসী সিংহর নাতির বিয়ে

পরমার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

সেদিন অফিস থেকে ফিরে চা খেতে খেতে টিভিতে গব্বরের মানে শিখর ধাওয়ানের অবসর ঘোষণারখবরটা দেখছি, কাকতালীয়ভাবে সেইসময়েইআমাদের পাড়ার বন্ধু গব্বর এসে যে খবর শোনাল, তাতে ভয় হল, যে ওকেই না এ বার ভব সংসার থেকে অবসর নিতে হয়!

না, আমাদের দত্তবাগানের গব্বর সিংহ আদৌ,‘শোলে’ছায়াছবির দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডাকাত সর্দারের ভক্ত নয়। রামগড় কা ডাকু যখন কুখ্যাতির মধ্য গগনে, দত্ত বাগানের গব্বর তখনও বিশ বাঁও জলে, মানে ধরাধামে অবর্তীর্ণ হতে তার বিশ বছর বাকি। এ হেন ডাকসাইটে নামের ভার আমাদের গবার ঘাড়ে চাপার জন্য দায়ী হলেন, ওর ঠাকুরমা বিলাসী সিংহ। তিনি নিজেই রামগড়ী গব্বরের লেডি ভার্সন।

বিলাসী সিংহনিজের যৌবনে, শোলে দেখে সেই যে গব্বর অনুরাগিণীহলেন, সে অনুরাগ জীবনের অপরাহ্ণেএসেও, নিজস্ব তেজের মতো এখনও অটুট আছে।

ভাগ্যিস গবার বাবা, কাকা তার বেশ কয়েক বছর আগে জন্মে গ‍্যাছেন, নয়তো বিলাসী ঠিক গব্বর ওয়ান, গব্বর টু করে…।

সেই শখ তিনি মেটালেন বড় নাতির উপর দিয়ে। আর সমস্যার শুরু সেখানেই। সংসার নামক অরণ্যে গৃহিণীরাই সিংহী এবং সেই সিংহী যদি বিলাসীর মতো দাপুটে হন, তা হলে পুরুষদের সিংহ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সমূলে বিনষ্ট হয়ে যায়। বিলাসীর সিংহী বিক্রমে তাঁর কর্তা এবং পুত্রদের ব্যক্তিত্ব বস্তুটি বিকাশের তেমন অবকাশ পায়নি, আর গবা তো উনত্রিশ বছর বয়সে এসেও ঠাকুরমার আঁচলের তলা থেকে বেরোতে পারেনি।

গবা শুধু, নামেই গব্বর, স্বভাবে জব্বর ভীতু। গবা জীবনে স্কুল কেটে সিনেমা দেখেনি, পরীক্ষার সময় নিরীহ হল কালেকশনের ধার মাড়ায়নি, গার্লস স্কুলের বাইরে চক্কর কাটেনি।  নিজের ছায়া দেখে ভয় পাওয়া গবা, শেষে বলে কিনা, “ভাই, আমি প্রেমে পড়েছি।”

আমার এক হাত দূরে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ হলেও এতটা চমকাতাম না।

গবার জীবনে প্রধান নারী বলতে ঠাকুরমা বিলাসী সিংহ এবং পার্শ্ব নারী চরিত্রে মাতা শিবাণী সিংহ। বিলাসী দেবী, গত বছর নাতিচাকরিতে থিতুহওয়ার পর থেকে একটি দেশোয়ালি বিহারি লড়কির সঙ্গে গবার বিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন, তবে তাঁর পছন্দের লড়কি পাওয়া সোজা কথা নয় বলে বিয়েটা ঝুলে আছে। কিন্তু তা বলে বঙ্গালি লড়কি! গবা যে নিজের অফিস কলিগ, সুনেত্রার নয়ন বাণে নিজ হৃদয় বিদ্ধ করে বসে থাকবে তা কে জানত!

আমি বললাম, “শ্রীমান গবুচন্দ্র, তুমি একটি জলজ্যান্ত ললনাকে কোন সাহসে প্রেমের প্রস্তাব দিলে? তোমার তো ততটা দৌড় নয়!”

“ভাই, সুনেত্রাই ব্যাপারটা সামলে নিয়েছে মানে ওই আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আগামী রবিবার, সে বিলাসী সিংহীর মোকাবিলা করতে আমাদের বাড়িতে আসছে। কিছু একটা কর, তোর তো অনেক ব্যাঁকাচোরা বুদ্ধি।”

বুঝলাম সুনেত্রা সিদ্ধান্ত নিতেই অভ্যস্ত, ক্ল্যাশ অফ টাইটান্স আসন্ন এবং বিলাসী সিংহীর আরাধ্য দেবতা গব্বর সিংহই, এই সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

শেষে এই শর্মার লেখা, সুনেত্রার এক সংলাপেই, রোববার সকালে বিলাসী কাত হয়ে গেছিলেন।

“গব্বর সে বড়া মর্দ, বিলাসী দাদি সে বড়া মর্দানি আজ তক পয়দা নেহি…। অউরইয়ে নয়া জমানা কী বাসন্তী, বীরু কো নেহি, গব্বর সে মহব্বত করতি হ্যায়। আপ কিগব্বর কা হাত, মেরে হাত মে দে দিজিয়ে দাদি, নেহি তো হাম কিসি পানি কা ট্যাঙ্কি সে কুঁদকে জান দে দুঙ্গি অ্যান্ড ইউ গোয়িং জেল অ্যান্ড চাক্কি পিষিং, চাক্কি পিষিং…।”

গবার বিয়ের সানাই বাজল বলে, তবে বেচারা শেষে এক সিংহীর বদলে দুই সিংহীর খপ্পরে পড়ে গেল ভেবে দুঃখ হচ্ছে!

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn