সুরঞ্জিত সরকার
সপ্তম পর্ব
পূর্ণা দেবী নকশাটি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন এই দিনটি আসবে। তিনি ছেলে ও ভাগনাকে সতর্ক করে বললেন, “এই নকশা যার হাতে থাকে, তার জিজীবিষা অর্থাৎ বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রবল হয় ঠিকই, কিন্তু তার চারপাশের মানুষের জীবন সংকটে পড়ে। তোরা কি সত্যিই এই বিপদে পা দিবি?
পূর্ণা কাঁপাকাঁপা হাতে চায়ের কাপটা নিয়ে নিচে শ্বশুরমশাই অতীশের ঘরে ঢুকলেন। ঘরের আবহাওয়া এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতায় ভরা। উনি জানলার দিকে মুখ করে বসে ছিলেন।
পূর্ণা টেবিলের ওপর কাপটা রাখতেই অতীশ মুখ না ঘুরিয়েই শান্ত গলায় বললেন, “ওরা কি ওপরের ঘরে ডায়েরিটা নিয়ে বসেছে পূর্ণা?”
পূর্ণা শিউরে উঠলেন। উনি যে সবটা জানেন, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “আপনি… আপনি জানতেন ওরা ওটা নিতে যাবে?”
অতীশ এবার ঘুরে তাকালেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর রহস্যের মিশ্রণ। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “চাবিটা বদল করা খুব একটা কঠিন ছিল না ওদের পক্ষে। কিন্তু জিজীবিষার নকশাটা পড়া অত সহজ নয়। সরকার বংশের ওই জটিল গোলকধাঁধায় ওরা যত ঢুকবে, ততই বিপদে পড়বে। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম ওদের রক্তে সেই তেজটুকু আছে কি না।”
পূর্ণা আর থাকতে না পেরে শ্বশুরমশাই এর পায়ের কাছে বসে পড়লেন। “কেন এই খেলা খেলছেন বাবা? এই নকশা আর ডায়েরি তো আমাদের পরিবারে শুধু ধ্বংসই এনেছে। সুমন্ত আর কল্যাণকে এর মধ্যে টানবেন না।”
অতীশ চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, “আমি ওদের টানছি না পূর্ণা, ওদের উত্তরাধিকারই ওদের টেনে নিচ্ছে।”
অতীশ পকেট থেকে একটা পুরনো পকেট ঘড়ি বের করে সময় দেখলেন। তারপর বললেন, “ইন্দ্রকে আমি পাঠিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ও যা দেখেছে তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। পূরবী ভবনের আশেপাশে আরও কিছু লোক ঘোরাঘুরি করছে। ওই নকশাটার পেছনে বড় কোনো মাথা খেলছে।”
তিনি পূর্ণার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যা হওয়ার তা হবেই। তুমি শুধু লক্ষ্য রেখো ওরা যেন আজ রাতে বাড়ি থেকে না বেরোয়। নকশার প্রথম ধাপটা বাড়িতেই আছে, বাইরে নয়।”
পূর্ণা বুঝতে পারলেন শ্বশুরমশাই নাতিদের আটকাতে চান না, বরং তাদের আরও গভীরে পাঠাতে চান।
পূর্ণা যখন উপরে সুমন্ত ও কল্যাণের ঘরে ঢুকলেন, তখন তাঁর চোখেমুখে একাধারে আতঙ্ক আর বিস্ময়। ছেলে ও ভাগনা তখনও নীল ডায়েরির সেই গোলকধাঁধার মতো নকশাটার ওপর ঝুঁকে পড়েছিল।
পূর্ণা রুদ্ধশ্বাসে বললেন, “তোরা যা ভেবেছিস তার চেয়েও বিপদ অনেক গভীরে। দাদু সব জানেন। এমনকি তোরা যে চাবিটা বদলেছিস, সেটার ওজনের তফাতও তাঁর চোখ এড়ায়নি।”
সুমন্ত আর কল্যাণ একে অপরের দিকে তাকাল। সুমন্ত বিড়বিড় করে বলল, “তার মানে দাদু সত্যিকারের আমাদের ওপর নজর রাখছিল! কিন্তু কেন?”
পূর্ণা ওদের পাশে বসে নকশাটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ” তোদের দাদু বলেছে, এই নকশা পড়ার ক্ষমতা সরকার বংশের রক্ত ছাড়া আর কারো নেই। এটা কোনো গুপ্তধন নয় রে, এটা একটা উত্তরাধিকারের পরীক্ষা। সুমন্ত সাবধান! ” কল্যাণের দিকে তাকিয়ে আরও বললেন, “তোর মামাও ঠিক এই নকশাটা নিয়েই একদিন বেরিয়েছিল, কিন্তু রোগ ভোগ করে আর জীবন পথে ফেরেনি।”
কল্যাণের হাতটা ডায়েরির ওপর শক্ত হলো, “মামা কি তবে এই রহস্যের শেষ দেখতে গিয়েছিল?”
পূর্ণা শ্বশুরমশাই এর সতর্কবানী শুনিয়ে বললেন, “দাদু বলেছে আজ রাতে যেন তোরা বাড়ির বাইরে না যাস। নকশার প্রথম পাঠ নাকি এই বাড়ির ভেতরেই আছে, বাইরে কোথাও নয়।”
সুমন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠল, “বাড়ির ভেতরে? তার মানে এই পূরবী ভবন বা আমাদের বর্তমান বাড়ি—এই দুইয়ের মধ্যেই কোনো গোপন যোগসূত্র আছে। কল্যাণদা, দেখ তো নকশার এই কোণটা, এটা কি আমাদের ঠাকুরঘরের কোণের মতো দেখতে লাগছে না?”
কল্যাণ জানালা দিয়ে একবার নিচে তাকাল। “মামী, দাদু ইন্দ্র কাকুকে পাঠিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দাদুর মতে ইন্দ্র কাকু একা নন। তার মানে এই নকশার গুরুত্ব পরিবারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।”
পূর্ণা শক্ত গলায় বললেন, “তোরা যা-ই করিস, দাদুর চোখের আড়ালে করিস না। দাদু আসলে তোদের তৈরি করছেন।”
আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হলো, তারা আজ রাতে বাড়ির বাইরে যাবে না। পরিবর্তে, নকশার সাথে বাড়ির স্থাপত্যের মিল খুঁজতে তারা পূরবী ভবনে দাদুর সেই পুরনো লাইব্রেরি ঘরটি পরীক্ষা করবে, যেখানে দাদু খুব একটা কাউকে ঢুকতে দিত না।
সুমন্ত বলল, “নকশার ওই হরিনের শিং এর মত চিহ্নটা আমি কোথাও দেখেছি। শিং গুলো সম্ভবত লাইব্রেরি ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আছে।”
কল্যাণ বলে উঠল, ” চল বেশী দেরী না করে খাবার পর দ্বিতীয়বার পূরবী ভবন অভিযান শুরু হোক।”
পূর্ণা দাদুর খাবারটা নীচে দিয়ে এসে ছেলেদের জন্য ভাত বাড়তে শুরু করলেন। দুপুরের খাবারের টেবিলে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। পূর্ণা বারংবার ছেলে ও ভাগনার চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সুমন্ত আর কল্যাণ দ্রুত হাতে খেয়ে উঠে পড়ার জন্য মরিয়া।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে দাদু যখন নিজের ঘরে দিবানিদ্রার আয়োজন করলেন, সেই সুযোগে সুমন্ত আর কল্যাণ আবার সাইকেল নিয়ে বেরোলো। কড়া রোদে পূরবী ভবন এখন আরও বেশি ভুতুড়ে লাগছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পুরনো কাঠের কড়কড়ানি শব্দে বাড়িটা যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
লাইব্রেরি ঘরের দরজাটা ভারি সেগুন কাঠের। বহু বছর কেউ ঢোকেনি বলে মরচে ধরা কবজাগুলো আর্তনাদ করে উঠল। ভেতরে ঢুকতেই এক রাশ ধুলো আর পুরনো কাগজের ভ্যাপসা গন্ধ ওদের স্বাগত জানাল। দেওয়াল জোড়া আলমারিতে সারি সারি চামড়ায় মোড়া বই।
সুমন্ত টর্চের আলো ফেলল ঘরের উত্তর দিকের দেওয়ালে। সেখানে একটি প্রকান্ড কাঠের হরিণ শিং টাঙানো রয়েছে। শিংগুলো ধুলোয় ধূসর হয়ে থাকলেও তার গঠনটা অদ্ভুতভাবে ডায়েরির নকশার সেই আঁকাবাঁকা রেখাগুলোর সাথে মিলে যাচ্ছে।
কল্যাণ উত্তেজিত হয়ে বলল, “সুমন্ত দেখ, শিংগুলোর বিন্যাস আর নকশার ওই ‘জিজীবিষা’ লেখাটার ঢং একদম এক!”
কাছে গিয়ে সুমন্ত খেয়াল করল, হরিণের শিংটি দেওয়ালের সাথে শক্তভাবে আঁটা নয়। সে সন্তর্পণে একটি শিং ধরে ডান দিকে ঘোরাতেই দেওয়ালের ভেতর থেকে একটা খটখট শব্দ হলো। অবাক হয়ে ওরা দেখল, হরিণের শিংয়ের ঠিক পেছনের দেওয়ালে একটা ছোট গোপন খোপ খুলে গেছে। ভেতরে রাখা আছে একটি রুপোলি রঙের প্রাচীন মেডেলিন (Medallion), যার ওপর খোদাই করা আছে দ্বিমুখী ঈগল।
সুমন্তের মনে পড়ে গেল, ছোটবেলায় দাদুর হাঁটুতে মাথা দিয়ে শুয়ে শোনা সেই গল্পটা। দাদু গম্ভীর গলায় বলত, “এই দ্বিমুখী ঈগল সাধারণ কোনো চিহ্ন নয় রে সুমন্ত, এটা আমাদের সরকার বংশের জিজীবিষার প্রতীক। একটা মুখ বর্তমানকে দেখে, আর অন্যটা অতীতের অতল গহ্বরকে। যেদিন এই ঈগল তার আসল মালিককে খুঁজে পাবে, সেদিনই বংশের সব অন্ধকার ঘুচবে।”
লাইব্রেরি ঘরের ধুলোমাখা অন্ধকারে মেডেলিনটা হাতে নিয়ে সুমন্তর গা ছমছম করে উঠল। দাদুর সেই কথাগুলো এখন যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে।
মেডেলিনটা উল্টেপাল্টে দেখতেই কল্যাণ ফিসফিস করে বলল, “সুমন্ত, ঈগলের একটা চোখের জায়গায় দেখ ছোট একটা নীল পাথর বসানো। আর অন্য চোখটা একদম ফাঁকা। তার মানে কি আরও একটা পাথর আমাদের খুঁজে বের করতে হবে?”
নকশার সাথে মেডেলিনটার খাঁজগুলো মেলাতেই বোঝা গেল, ওটা আসলে একটা ‘কি-স্টোন’ (Key-stone), যা কোনো বড় রহস্যের চাবিকাঠি।
ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির বাইরে বারান্দায় কারো ছায়া পড়ল। কল্যাণ দ্রুত মেডেলিনটা পকেটে পুরে নিল। জানলার কাঁচ দিয়ে দেখা গেল, ইন্দ্র কাকু নন, বরং অন্য এক অপরিচিত ব্যক্তি বাগানে দাঁড়িয়ে ওপরের জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার পরনে কালো কোট আর চোখে চশমা।
জানলার ওপাশে সেই কালো কোট পরা লোকটা এখন বাগানের জঙ্গল ঠেলে লাইব্রেরি ঘরের জানলার একদম নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা পুরনো দিনের বাইনোকুলার। লোকটা যেন ঠিক জানে যে ওপরের ঘরে সুমন্তরা কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে। ইন্দ্র কাকু যে কেন সামনে আসছেন না, সেটা ভেবেই কল্যাণের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সুমন্ত ইশারায় কল্যাণদাকে মেঝের ওপর বসে পড়তে বলল। সে জানে, দাদু যদি এই মেডেলিনটা এখানে রেখে থাকেন, তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো পরীক্ষা আছে। সে ফিসফিস করে বলল, “দাদু বলেছিল এই ঈগল মান-মর্যাদার প্রতীক। তার মানে এটা হাতছাড়া করা মানে সরকার বংশের অপমান। লোকটা যেই হোক, মেডেলিনটা আমরা ওর হাতে পড়তে দেব না।”
বাইরে থেকে লোকটার গলার স্বর শোনা গেল, সে ফোনে কাউকে বলছে, “হ্যাঁ, ওরা লাইব্রেরিতে ঢুকেছে। মনে হচ্ছে ঈগলটা ওদের হাতেই। অতীশ বাবুকে আর কতক্ষণ আটকে রাখা যাবে জানি না, আপনারা দ্রুত পূরবী ভবনের দিকে টিম পাঠান।”
সুমন্ত ও কল্যাণ বুঝতে পারল, দাদু হয়তো এই লোকগুলোর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই মেডেলিনটা ওদের দিয়ে উদ্ধার করালেন। দাদু নিজে আসলে এই শক্তিশালী চক্রের নজরবন্দি হয়ে থাকতে পারেন, তাই নাতিদের মাধ্যমে এই উত্তরাধিকার নিরাপদ জায়গায় সরাতে চাইছেন।
কল্যাণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, “এই অপরিচিত ব্যক্তিটি কে? দাদু কি তবে ইন্দ্র কাকু ছাড়াও অন্য কাউকে নিয়োগ করেছে? নাকি সরকার বংশের এই মেডেলিনটি উদ্ধারের খবর বাইরের কারোর কাছে পৌঁছে গেছে”?
(চলবে)


