এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

অচিরেই আমি রেখা ও আকৃতির বিশ্বে আশ্রয় নিলাম।অঙ্কনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে আমার লুপ্তপ্রায় শৈলীর এক বিশেষ সাযুজ্য আছে।এক মৃত মডেলের সঙ্গে কাজ।এটা একটা ঘটনা বৈকি।আমি এক মৃতের শিল্পী।কিন্তু চোখ!সেই মৃতের চোখ।আমি কি আদৌ আর চেয়ে দেখতে চাইব?আমার শরীর ও মনের ওপরে সেগুলি কি ছায়া ফেলবে না?আমি মনেও করতে চাইনা ঠিক কতক্ষণ সময় ধরে তার মুখের অনুলিপি করেছিলাম।সম্ভবত যতক্ষণ না ভোর হলো।যদিও জানি আমার সেই সৃজন খুব সন্তোষজনক ছিল না।আমি আঁকা শেষ করেই সেই কাগজটা ছিঁড়ে ফেললাম। কাজটা করতে গিয়ে আমার এতোটুকুও ক্লান্ত লাগছিল না।আমার সময়ের জ্ঞানও ছিল না।

প্রায় সকাল হয়ে এসেছিল।জানালার ফাঁক দিয়ে ফ‍্যাকাশে আলো ঘরে ঢুকে আসছিল।আমি ছবিটা এঁকেই চলেছিলাম যা আমার বিশ্রাম নেওয়ার থেকে অন্তত ভালো ছিল।কিন্তু সেই চোখ!কিন্তু সেই চোখ! সেই চোখদুটো আমায় ভর্ৎসনা করছিল তাদের কাগজে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি বলে!আমি যেন ক্ষমার অযোগ‍্য এক মহাপাপ করেছি।তার জীবন্ত চোখের স্মৃতি আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।তাই সমস্ত চেষ্টাই ব‍্যর্থ হলো।যতবার গভীরভাবে তার মুখের দিকে তাকালাম আমি তার মুখভঙ্গী মনে করতে পারলাম না।

হঠাৎ লক্ষ‍্য করলাম তার গালদুটি টকটকে লাল হয়ে উঠল।যেমন কসাইখানায় সাজিয়ে রাখা মাংসের রং হয়ে থাকে।তার প্রাণ ফিরে আসছে।তার আশ্চর্য বিস্ময়ান্বিত চোখ দুটিতে প্রাণের আলো জড়ো হয়ে টিমটিম করে জ্বলছে । একটা ফ‍্যাকাশে অসুস্থ আলো।তার তিরস্কারসূচক চোখ খুব ধীরে খুলে গেল।সে আমার মুখের দিকে তাকালো।
এই প্রথম সে আমার উপস্থিতি অনুভব করল। সে তাকাল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখ আবার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ঘটনাটি এক মুহূর্তের বেশি স্থায়ী হয়নি, তবু সেই ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টিই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল!তার চোখের সেই অভিব্যক্তি আমি ধরতে পেরেছিলাম। আমি তুলির সূক্ষ্ম টানে সেই অভিব্যক্তি এঁকে ফেললাম, এবং এইবার আমি আর ছবিটি ছিঁড়ে ফেললাম না।

আমি যেখানে বসে ছবি আঁকছিলাম সেখান থেকে উঠে তার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।প্রথমে আমার মনে হলো সে বেঁচে আছে।সে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।আমার ভালোবাসা আমারই আত্মাকে তার ভেতর প্রতিস্থাপিত করেছে।কিন্তু যে মুহূর্তে আমি তার কাছে গেলাম সেই মুহূর্তেই আমি মৃতদেহের গন্ধ পেলাম।একটা পচাগলা মৃতদেহ।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীট চলে বেড়াচ্ছিল তার শরীর জুড়ে।মোমবাতির আলোয় দেখলাম দুটো সোনালি মাছি তার ওপর চক্রাকারে উড়ছে।যদি সে সত‍্যিই মৃত তাহলে সে তাকাল কি করে?এটা স্বপ্ন?নাকি বাস্তবেই ঘটেছে?আমি সত‍্যিই জানতাম না।আমি চাইনা কেউ আমাকে এই প্রশ্ন করুক।কিন্তু আমার সমস্ত মনোযোগের বিষয় তার মুখখানি।না না তার চোখ!যা এখন আমার জিম্মায় আছে।আমি তার চোখের ভাষা কাগজে ধরে রেখেছি।তার শরীর যা নষ্ট হয়ে যাবে।অচিরেই কৃমিকীটে ও ইঁদুরের ভোজ‍্য হয়ে যাবে।তারপর মাটির নিচে চলে গেলে তার আর কোনো উপযোগিতা থাকবে না আমার কাছে।অথচ এখন থেকে সে আমার নিয়ন্ত্রণে।আমি তার দাস নই।আমি যখনই চাইব তার চোখের দিকে তাকাতে পারব। অতি যত্নে আমি ছবিটা নিয়ে আমার টিনের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম।যে বাক্সটিতে আমি আমার সমস্ত উপার্জনের টাকা রাখতাম।আর সেই টিনের বাক্সটা আমার ঘরের আলমারিতে লুকিয়ে ফেল্লাম।

রাত বয়ে যাচ্ছিল।, চুপিসারে পা টিপেটিপে! মনে হচ্ছিল, সে তার ক্লান্তি থেকে কিছুটা সেরে উঠেছে।দূর থেকে ভেসে আসছিল মৃদু শব্দ যেন কোনো পাখির স্বপ্নভঙ্গের শব্দ অথবা লতাগুল্মের বেড়ে ওঠার গোপন ফিসফিস শব্দ।
আকাশের ফ্যাকাশে তারাগুলি মেঘের স্তূপের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আমি অনুভব করলাম সকালের হালকা বাতাস আমার মুখে লাগছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে একটি মোরগের ডাক ভেসে এলো।
এখন এই শরীরটার কি গতি করব আমি?ইতিমধ‍্যেই পচন শুরু হয়ে গেছে।প্রথমে মনে হলো আমার ঘরের ভেতরেই তাকে পুঁতে ফেলি।তারপর মনে হলো বাইরে নিয়ে গিয়ে এমন কোথাও ফেলে দিই যেখানে কালো লিলিরা ফুটে আছে।কিন্তু সকলের অগোচরে এই সমস্ত পরিকল্পনা কার্যায়িত করতে গেলে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা, পরিশ্রম ও সাবধানতার প্রয়োজন ছিল। আমি আর এতোটা ঝুঁকি নিতে চাইছিলাম না। আমি চাইছিলাম না যে, কোন অচেনা লোক তাকে দেখতে পাক। সে কারণে সমস্ত কাজটাই আমাকে একলা হাতে করতে হয়েছিল। আমি নিজের জন্য কিছুই ভাবছিলাম না কারণ এরপরে জীবনে আর কিই বা বেঁচে ছিল! কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টা তাকে কেন্দ্র করে, আমি বাদে কেউ যেন তার মৃতদেহের প্রতি চোখ তুলে দেখার সুযোগ না পায়। সে আমার ঘরে এসেছিল এবং তার শীতল শরীর ও ছায়া আমায় সমর্পণ করেছিল যাতে কেউ তাকে না দেখে, যাতে কোনো আগন্তুকের নজর তার শরীরকে অপবিত্র করতে না পারে।

শেষ পর্যন্ত মাথায় একটা ভাবনা খেলে গেল।যদি তার শরীরটাকে টুকরো করে একটা স‍্যুটকেসে ভরে ফেলি? আমার পুরনো একটা স‍্যুটকেসে। অনেক দূরে সকলের নজরের বাইরে নিয়ে গিয়ে পুঁতে ফেলব।এইবার আমার মনে কোন দ্বিধার উদয় হলো না। আমি আলমারি থেকে একটা হাড়ের হাতলওলা ছুরি বার করে আনলাম এবং খুব সাবধানে সেই পাতলা কালো পোশাকটি ছিঁড়ে ফেললাম। যা মাকড়সার জালের মত তার শরীরটাকে আটকে রেখেছিল কি বলবো তার শরীরকে আগলে রাখা শেষতম বস্ত্রটিওও ছিড়ে ফেললাম। আমার মনে হল সে যেন আরো খানিকটা লম্বা হয়ে গেছে। তারপর আমি তার শরীর থেকে তার মাথাটা আলাদা করে ফেললাম। গলা থেকে শীতল রক্তের বিন্দু ঝরে পড়ল। এমনিভাবে আমি তার হাত পা এবং পুরো শরীরটাই কেটে ফেললাম। তারপর মাথা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স‍্যুটকেসের ভেতর গুছিয়ে রেখে তার কালো পোশাকটি দিয়ে ঢেকে দিলাম।

শেষ পর্যন্ত স‍্যুটকেসে তালা দিয়ে চাবিটা নিজের পকেটে রাখলাম। কাজ সম্পন্ন হতে একটু যেন স্বস্তি পেলাম । সুটকেসটা হাতে তুলে তার ওজন পরখ করে বেশ ভারী মনে হল। এর আগে কখনো এতটা ক্লান্ত বোধ করিনি আমি বুঝতে পারলাম এই সুটকেসটা আমি একা কখনোই বহন করতে পারবো না। আবার মেঘ করে এলো। হালকা বৃষ্টিও হচ্ছিল। আমি ঘরের বাইরে বেরোলাম।এমন কোন শক্তির খোঁজে যে আমাকে সুটকেসটা তুলতে সাহায্য করবে।ধারে পাশে কারোকে পেলাম না যখন,খুব ভালো করে দেখলাম তখন দেখতে পেলাম একটু দূরে কুয়াশার ভেতরে এক ন‍্যুব্জদেহ বৃদ্ধ বসে আছে। একটি সাইপ্রাস গাছের নিচে বসে ছিল। আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না কারণ একটি বড়সড়ো ওড়না দিয়ে তার মুখটি ঢেকে রেখেছিল। আমি ধীরে ধীরে তার সামনে এগিয়ে গেলাম তাকে কিছু বলার আগেই তার দিক থেকে একটা শুকনো বীভৎস হাসি ভেসে এল যাতে আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সে বলল যদি আপনি কোন কুলির সন্ধানে আছেন তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।আমার কাছে একটা শববাহী গাড়িও আছে আমি প্রতিদিন শাহ্ আব্দুল আজিমের দিকে লাশ নিয়ে যাই ও সেখানেই তাদের কবর দিই।আমার কাছে প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত কফিন আছে।

আমিও জানতাম সেটা একটা ধার্মিক পরিসর। যেখানে রেজা সাহেবের মকবরাও আছে। তেহরানের দক্ষিণ অংশের রেও- প্রদেশে ভগ্নস্তূপের পাশেই ছিল জায়গাটা।।

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn