সাহিত্যপথের নতুন বাঁক
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
আলব্যের কামু তাঁর ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’-এ বলেছেন — “Man stands face to face with the irrational. He feels within him his longing for happiness and for reason. The absurd is born of this confrontation between the human need and the unreasonable silence of the world.” অবিশ্বাস ও সহায়হীনতায় গড়া এই জীবন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যুক্তি দিয়ে যে জগতের কার্য-কারণ বিশ্লেষণ করা যায় তা আমাদের পরিচিত জগত। কিন্তু যে জগতে মানুষ হঠাৎ তার সব মোহ ও আনন্দ হারিয়ে ফেলে, সেখানে সে একজন বহিরাগত। এই নির্বাসনের যন্ত্রণা থেকে তার মুক্তি নেই, কারণ সে যেমন তার অতীতের স্মৃতি হারিয়েছে, তেমনই ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কেও সে আশাহত। মানুযের সঙ্গে তার জীবনের এই বিচ্ছিন্নতার বেদনা থেকেই ‘absurdity’-র বোধ জন্ম নেয়।
বর্তমান যুগের মানুষ ধর্ম, অলৌকিক, অতীন্দ্রিয় লোক, অধিবিদ্যা প্রভৃতির থেকে আশ্রয়চ্যুত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। পুরনো মূল্যবোধের বিপর্যয় এবং চিরাচরিত বিশ্বাসের বাস্তুভূমি থেকে নির্বাসিত মানুষের যন্ত্রণাকাতরতা এবং যুদ্ধের মানবতাবিরোধী ধ্বংসলীলা মানুষকে ধনতান্ত্রিক সমাজবিন্যাস সম্পর্কে আশাহত করেছে। তারই প্রকাশ দেখা যায় কিয়েকেগার্ড, নীৎসে, হার্সাল, হাইডেগার প্রভৃতির দর্শনে এবং সার্ত্র-র সাহিত্যচিন্তায়। এই অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা চারদিকে বিরাজমান অসামঞ্জস্য ও অর্থহীনতার মধ্যে জীবনের চূড়ান্ত মূল্য সন্ধান করতে গিয়ে কেউ ব্যক্তিমানুষের একক ধর্মবিশ্বাসের উপর আস্থা রেখেছেন, আবার কেউ মানুষের existence-কে প্রধান করে দেখিয়েছেন।
অস্তিবাদী দর্শন ব্যক্তিকেন্দ্রিক subjective idealism-এর ভিত্তির উপর নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেহেতু পুরাতন ইশ্বরের মৃত্যু ঘটেছে, অতএব একক মানুষ নিজেই নিজের ইশ্বর। অর্থাৎ ব্যক্তির উপর কোনও অসীম শক্তিধরের নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে ব্যক্তিকেই তার স্রষ্টার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সার্ত্র কিন্তু তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনকে মানবতাবাদ থেকে আলাদা করেননি। বস্তুত অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা কোনও অসীম শক্তিধর বা অলৌকিকে আস্থাশীল ছিলেন না এবং সঙ্ঘবদ্ধ সামাজিক জীবন সম্পর্কেও উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু তাঁরা একক ব্যক্তির অনন্ত সম্ভাবনা সম্পর্কে এক সুদৃঢ় প্রত্যয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।
কামু ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে নীৎসে-র দর্শনকে স্বীকার করার থেকে সংশোধনেই বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ‘মিথ অব সিসিপাস’-এ বলেছিলেন — “Everything which exalts life adds at the same time to its absurdity.” তবে তিনি এই বইতে আত্মহত্যাকে কাপুরুষের সিদ্ধান্ত বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি নিজের অন্তরের সত্যবোধ ছাড়া প্রচলিত নীতি সম্পর্কে বিদ্রোহাত্মক দৃষ্টিভঙ্গী রক্ষার গুরুত্ব মেনেছিলেন। ‘দি াউটসাইডার’-এ মার্সোর সঙ্গে ধর্মযাজকের কথোপকথনে তিনি জীবন সম্পর্কে এক সাধারণ মানুষের আগ্রহকে ফুটিয়ে তুলেছেন — “A life in which I can remember this life on earth. That’s all I want of it.” তবে মার্সোর এই জীবনের প্রতি আসক্তি মানবজীবনের প্রচলিত ছক বা মূল্যবোধের সঙ্গে একতাবদ্ধ নয়। জীবন, মৃত্যু যৌনাচার প্রভৃতি সবকিছুকেই সে নিরাসক্তের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। আসলে সে প্রচলিত ধারার ছকে-বাঁধা জীবনে একজন বহিরাগত, যাকে ধর্মীয় উপদেশ বা প্রেয়সী সম্পকে আকর্ষণ জীবনের প্রতি উন্মুখ করে তুলতে পারেনি।
জাঁ পল সার্ত্র-এর মতে কামুর দর্শন হল — “Philosophy of the absurd.” তাঁর মতে মানুষের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক চিন্তা এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ব্যর্থতার ভাবনা থেকে এই দর্শনের জন্ম। আসলে সার্ত্র-র মতো অস্তিত্ববাদী হোক বা কামুর মতো অ্যাবসার্ডবাদী হোক, সাহিত্যিকরা সকলেই সমকাল, সমাজ-জীবন ও মানুষের মূল্য সম্পর্কে সচেতন। অর্থাৎ তাঁরা সকলেই মূলগতভাবে জীবনবাদী। নীৎসে বা কামু জীবনের পরম মূল্য সম্বন্ধে সংশয়াচ্ছন্ন থাকলেও তাঁদের জীবনবোধ অবশ্য পুরোপুরি ইহলৌকিক। ‘Superman’ বা ‘Outsider’ উভয়েই সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ। শুধু ‘দি আউটসাইডার’-এর মার্সো-ই নয়, ‘দ্য প্লেগ’-এর বার্ণাদ রিউ-ও সংগ্রামী মানুষ, যে প্রেম-প্রীতি, সুখ-দুঃখ প্রভৃতিতে আলোড়িত হয়।
কামু-র ‘দ্য প্লেগ’-এ দেখি প্লেগ থেকে সদ্য মুক্ত ওরান শহরের জনগণের উল্লাস লক্ষ্য করে মানবপ্রেমিক চিকিৎসক বার্ণাদ রিউ সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে এই সুখ ক্ষণস্থায়ী। কারণ প্লেগের জীবানু শেষ হয় না; বাড়ি-ঘরের কোণ, আসবাবপত্র, সুখের উপকরণ তথা মধ্যবিত্তের সুখাভিলাষের গভীরে তা লুকিয়ে থাকে। একদিন কালান্তক রূপে তার প্রকাশ হবেই। প্লেগ রোগ মানুষে মানুষে বিচ্ছেদ, অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা নিয়ে এসেছিল। তাই এক অর্থে প্লেগ হল বিচ্ছিন্নতা ও বঞ্চনার অপর নাম। মানুষের জন্য রিউ-এর যে সংগ্রাম, তার পিছনে আছে সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রতি ভালবাসা। রিউ হল এক বিদ্রোহী যে জননী ও পত্নীকে হারিয়েও ওরান-কে প্লেগ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। কামু তাঁর জীবনদর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছেন — “instead of killing and dying in order to produce the being that we are not, we have to live and let live in order to create what we are.” কামু মনে করেন হত্যা করা বা আত্মহনন কোনওটাই সত্যিকারের বিদ্রোহীর লক্ষণ নয়, বাঁচা ও বাঁচতে দেওয়াই হল প্রকৃত সংগ্রাম। মৃত্যুশাসিত জীবনে ইচ্ছামৃত্যু লাভ করাও এক ধরণের ব্যক্তিস্বাধীনতা, অস্তিত্ববাদীদের এই ধারণা অ্যাবসার্ডবাদী কামুর ছিল না। তাঁর মতে সেই সিসিফাস সুখী, যে ঢালু পাহাড়ের উপর একটি পাথর গড়িয়ে তুলতে গিয়ে বারবার নিষ্ফল হলেও উদ্যম হারিয়ে ফেলে নি।
‘দ্য রেবেল’ গ্রন্থে কামু বলেছিলেন — “Art is the activity that exhalts and denies simultaneously. “No artist tolerates reality,” says Nietzsche. That is true, but no artist can get along without reality. Artistic creation is a demand for unity and a rejection of the world. But it rejects the world on account of what it lacks and in the name of what it sometimes is.” শিল্পী ইহসচেতন এবং জগতের সংগতি ও ঐক্যবিধান করেন। তিনি জগতের উপর মায়ার চাদর বিছিয়ে দেন না, বরং তার ভিতরের অসংগতিকে ঐক্যরূপ দেন। যার কোনও তাৎপর্য নেই তার থেকে কোনও শিল্পই জন্ম নিতে পারে না। ইহজগতেই সুন্দরকে সৃষ্টি করা সম্ভব এবং তা করতে গেলে একই সঙ্গে বাস্তবের কিছু উপাদানকে বর্জন এবং কিছু উপাদানকে মহিমান্বিত করতে হবে। কামু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন — “Art disputes reality, but does not hide from it.”
কামুর রচনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তিনি প্রথমে শিল্পীকে বিদ্রোহীর বেশে দেখেছেন, তার পর উপন্যাসকে একটি আদর্শ শিল্প-রূপে গণ্য করেছেন। কারণ তাঁর মতে লেখক বাস্তব থেকে পালিয়ে না গিয়ে বাস্তবের কিছু উপাদানকে গ্রহণ ও কিছু উপাদানকে বর্জনের দ্বারা অখণ্ড ঐক্যমূর্তি দান করেন। তিনি বলেন বর্তমানের জগতে যেখানে কোনও কিছুর মধ্যেই অখণ্ড প্রবাহ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে , বা প্রেম নেই জেনেও মানুষ যখন জীবনে প্রেমের কামনা করে তখন নীতিমূলক গল্পের কোনও সারবত্তা নেই। মানুষের জীবনের বৈপরীত্য এইখানে যে পৃথিবী থেকে পালাতে না চেয়েও (বা মৃত্যু কামনা না করেও) সে পৃথিবীকে বর্জন করতে চায়। আসলে না পাওয়ার বোধ থেকেই মানুষের যন্ত্রণাভোগ ও নির্বাসনের দুঃখবোধ। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাসের জগত আমাদের পরিচিত এই জগত, মানুষগুলোও আমাদের চেনা। ‘The Rebel’-এ কামু বলেছেন — “Their universe is neither more beautiful nor more enlightening than ours.”
নীৎসে বলেছিলেন এ জগতের উর্ধ্বে ওঠার জন্য আমাদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। তাঁর ধারণা ছিল শিল্পের জগত শুধু মায়ার জগত নয়, মিথ্যার জগতও বটে; তবে সেই মিথ্যায় চাতুর্য আছে। কামু কিন্তু এই মতের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি শিল্পীর বিষয়-নির্বাচনে স্বাধীনতা, শিল্পে সুন্দরের গুরুত্ব ও ঐক্যহীন জীবনে ঐক্য রক্ষার মূল্য স্বীকার করেছেন এবং শিল্পের জগত থেকে মিথ্যাচারকে বর্জন করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে নিছক অনুকরণের দ্বারা নয়, গ্রহণ ও বর্জনের দ্বারা শিল্পে বাস্তবের ভূমিকাকে সার্থক করে তুলতে হবে। কামু বাস্তবতার পক্ষপাতী হলেও ‘crude reality’-র পক্ষে নন। তাঁর মতে বাস্তবে যেখানে ঐক্য নেই শিল্পীকে সেখানে বাস্তবজীবনের নতুন অবয়ব দান করতে হয়। রোমান্টিকদের কল্পনা-প্রবণতায় কামুর আস্থা ছিল না, আবার বাস্তবের অনুকরণের প্রতিও তাঁর তীব্র আপত্তি ছিল। তাঁর মতে বাস্তবের অনুকরণ হল ‘sterile repetition of creation’।
কামু ‘দ্য রেবেল’-এ বলেছেন — “Beauty, no doubt, does not make revolution. But a day will come when revolution will have need of beauty.” তিনি সাহিত্যে রূপ ও বিষয়ের সমান মূল্য স্বীকার করতেন। তিনি প্রচারধর্মী ও বিষয়-প্রধান সাহিত্যের প্রতি বিরক্ত ছিলেন, আবার সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা সম্পর্কেও তাঁর বিরাগ ছিল। তিনি এক দিকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় অবিশ্বাসী, অন্য দিকে মার্ক্সীয় ইতিহাস-চেতনায় আস্থাহীন। তাঁর নায়কেরা প্রচলিত নিয়ম ও সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলেও কেউই বিপ্লবী নয়। তিনি বিপ্লবের সঙ্গে সৌন্দর্যের বৈরীতার সম্পর্ক স্বীকার করেন না, কারণ জাগতিক অবিচারের উর্ধ্বে মানুষের সুবিচারের আদর্শ সৃষ্টির ক্ষমতায় তাঁর বিশ্বাস ছিল। তাঁর সুস্পষ্ট বোধ ছিল — “To create beauty, he must simultaneously reject reality and exalt certain of its aspects.”
একজন অ্যাবসার্ডবাদী হিসাবে কামু শিল্প-সাহিত্যে প্রচলিত অর্থে বাস্তবতা বা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার গুরুত্ব স্বীকার করতেন না, আবার শিল্পীকে পলাতক বলেও ভাবতেন না। তিনি সাহিত্যে বিষয় ও রূপের ঐক্যসম্পর্কে বিশ্বাস করেছেন, সৌন্দর্যের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন এবং উপন্যাসে ও নাটকে অ্যাবসার্ডিটি-কে বিষয়ীকৃত করেছেন; কিন্তু শিল্পরূপের ক্ষেত্রে আদ্যন্ত বিশিষ্ট রূপ রচনার প্রচলিত প্রথা বর্জন করেননি। কামু জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে মানতেন, তবে অ্যাবসার্ডবাদীরা নাটকে যে কাজ করেছেন তিনি নিজের রচনার শিল্পরূপের ক্ষেত্রে ঠিক সে ধরণের কাজ করেন নি। তিনি বরাবর কার্য-কারণের ন্যায়শাস্ত্র অনুমোদিত সম্পর্ক রক্ষা করেছেন, যেমন করেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। জীবনের খণ্ডতা ও উদ্দেশ্য-শূন্যতা সম্বন্ধে হেমিংওয়ে যে সিদ্ধান্তে এসেছেন তার সঙ্গে তাঁর উপন্যাসের পূর্ণবৃত্তরূপের কোনও সাদৃশ্য নেই। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ উপন্যাসে তিনি জীবনের উদ্দেশ্যহীনতাকে তীক্ষ্ণ গদ্যে রূপ দিয়েছেন, কিন্তু সমগ্র কাহিনীর বিন্যাস-পদ্ধতিকে অ্যাবসার্ড বলা চলে না। একইভাবে মার্ক টোয়েন বা উইলিয়াম ফকনার-ও উপন্যাসের রূপে জীবনের অ্যাবসার্ডিটিকে ধরতে চেষ্টা করেননি। কিন্তু নাটকের জগতে বক্তব্য প্রকাশের তাগিদে ইওনেস্কো, আদামভ, হ্যারোল্ড পিন্টার, জাঁ জেনে, অ্যালবি, আরাবেল প্রমুখরা যুক্তি ও ভাষার প্রয়োগে সনাতন ন্যায়শাস্ত্রের বন্ধন এবং সাহিত্যের স্থির আদর্শকে একেবারেই বিনষ্ট করে দিয়েছেন। লেসলি ফিডলার যুক্তি দেখিয়েছিলেন পুরনো ইশ্বরের সঙ্গেই পুরনো উপন্যাসেরও মৃত্যু হয়েছে। ঔপন্যাসিক মিস সোনটাগ বলেছিলেন অর্থহীন জীবনের উপন্যাসে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বা অর্থের অনুসন্ধান অযৌক্তিক। অনেকটা একই রকম কথা বলেছেন জন অলড্রিজ। তাঁর মতে জীবনের উপরিতলের সত্যতা নিয়ে আমাদের আর চলে না, জীবনের অন্তর্গত বিশৃঙ্খল বৈচিত্র্যের কথাও ভাবতে হয়। তাই নতুন শিল্পরূপও এখানে প্রয়োজনীয়।
যে সত্য ও বাস্তব নিয়ে ঔপন্যাসিকরা প্রধানত কাজ করেন ম্যাক্স প্লাঙ্ক, আইনস্টাইন প্রভৃতি বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাবের পর তার মর্মাথই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ব্যক্তির উপলব্ধিগত সত্যই যখন চূড়ান্ত, তখন সর্বজনীন নিরপেক্ষ সত্য বলে কিছু নেই। ‘প্রসেস অ্যান্ড রিয়ালিটি’ গ্রন্থে আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড অভিমত প্রকাশ করেছেন — “Apart from the experience of subjects there is nothing, nothing, nothing, bare nothingness.” অ্যাবসার্ড নাটকে এই বিষয়কেন্দ্রিক সত্যেরই রূপায়ণ ঘটেছে। অ্যাবসার্ড নাটকের রচয়িতারা ট্র্যাজেডির আদর্শ বর্জন করেছিলেন, কারণ তাঁদের মতে এ হল সেই অতীতের নাট্যকলা যখন মানুষের পরম-একে এবং জাগতিক নীতি-নিয়মের সুশৃঙ্খলায় বিশ্বাস ছিল। তাই তাঁরা ট্র্যাজেডির বদলে উদ্ভট, অসমঞ্জস বা অ্যাবসার্ড-কে বেছে নিলেন।
মার্টিন এসলিন বলেছেন গতানুগতিক নাট্যরীতির সঙ্গে অ্যাবসার্ড নাটকের তফাত প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে। প্রথমত, সনাতন পদ্ধতির নাটকের চরিত্রগুলি নাট্যকারের দ্বারা পরিকল্পিত এবং সচেতনভাবে উদ্দেশ্যের অভিমুখী। কিন্তু অ্যাবসার্ড নাটকের চরিত্রগুলি খুব একটা পরিচিত নয় এবং তাদের উদ্দেশ্যও অস্পষ্ট। দ্বিতীয়ত, প্রাচীন রীতির নাটকের পাত্র-পাত্রীর সংলাপ সুসংগঠিত, কিন্তু অ্যাবসার্ড নাটকের সংলাপ যেন অর্থহীন ঠেকে। তৃতীয়ত, প্রথানুগ কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুগ্রথিত হয়ে থাকে, কিন্তু অ্যাবসার্ড নাটকের শুরু হয় যে কোনও জায়গা থেকে এবং তার সমাপ্তিও অনির্দিষ্ট।
সব অ্যাবসার্ড নাট্যকারই সূচনা বা সমাপ্তির ক্ষেত্রে একই ধরণের রচনাপদ্ধতি অনুসরণ করেননি। তবে সম্ভবত অ্যালবি ছাড়া অন্য সকলেই একই জাতের অসমাপ্তির ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন। এই প্রসঙ্গে স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ এবং ইউজিন ইওনেস্কোর ‘অ্যামিডি’ নাটকের পরিসমাপ্তির উল্লেখ করা যায়। কিন্তু এডোয়ার্ড অ্যালবি-র ‘দ্য জু স্টোরি’ নাটকে জেরীর অদ্ভুত ধরণের আত্মহত্যা এবং পিটারকে বাঁচাবার চেষ্টা যেন সমগ্র নাটকটির বিষয়বস্তু ও সংলাপের মধ্যে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটিয়ে দিয়েছে। আবার ইওনেস্কোর ‘অ্যামিডি’, ‘রাইনোসেরস’ ও ‘দ্য চেয়ারস’ নাটক তিনটিতে পরিস্থিতিগত অস্বাভাবিকতার প্রকাশ ঘটেছে। যেমন ‘অ্যামিডি’ নাটকে অ্যামিডির আকাশমার্গে ওড়া, ‘রাইনোসেরস’ নাটকে ডেইজি ও বেরেঞ্জার ছাড়া অন্য সকলের গণ্ডার হয়ে যাওয়া প্রভৃতি পরিস্থিতিগত উদ্ভট অবস্থার সূচক। ঠিক সেভাবেই ‘দ্য চেয়ারস’ নাটকে নামগোত্রহীন বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ও বাগ্মী ছাড়া অদৃশ্য চরিত্রগুলির অসাধারণ সক্রিয়তা এবং বাগ্মীর অর্থহীন শব্দ ব্যতীত অন্য কোনওভাবে আত্মপ্রকাশে চূড়ান্ত অক্ষমতা একই অবস্থা সূচিত করে।
অ্যাবসার্ড নাটকের চরিত্রগুলির নিজস্ব পরিচয় যে কতটা রহস্যাবৃত এবং কাজকর্মেও যে যুক্তি বা শৃঙ্খলার কতখানি অভাব তার উদাহরণ মেলে অ্যালবি-র ‘দ্য আমেরিকান ড্রিম’ এবং ‘দ্য জু স্টোরি’ নাটকে। প্রথম নাটকের ড্যাডি ও মোমি বা দ্বিতীয় নাটকের জেরি ও পিটার বিশেষ কোনও ব্যক্তি নয়। আসলে এরা যুগের সৃষ্টি এবং এদের নাম যে কোনও একটা কিছু হতে পারত। কিন্তু ইওনেস্কোর মেডিলিন, অ্যামিডি, বেরেঞ্জার, ডেইজি প্রভৃতি চরিত্ররা অনির্দিষ্ট কেউ নয়, এদের একটা নির্দিষ্ট গোত্র-পরিচয় আছে। এই সব চরিত্রের আচরণে যুগচিহ্ন স্পষ্ট হলেও এদের একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিজীবন আছে।
মানুষের ব্যক্তি-পরিচয়ের অর্থশূন্যতা অ্যাবসার্ড নাটকের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই ধারার প্রধান নাট্যকারদের মধ্যে ইউজিন ইওনেস্কোর ঝোঁক যান্ত্রিকতার দিকে, হ্যারল্ড পিন্টারের পারদর্শিতা অর্থহীন সংলাপ রচনায় এবং এডোয়ার্ড অ্যালবির বৈশিষ্ট্য ভাবাবেগ প্রবণতায়। এর থেকে প্রমাণ হয় এই নাট্যকারেরা সকলেই নাটক রচনায় এক রীতি ও পদ্ধতি ব্যবহার করেননি। তবে অস্তিত্ববাদীদের মতো অ্যাবসার্ডবাদীদেরও বিষয়কেন্দ্রিক সত্যতা ও বাস্তবতা সম্পর্কে আগ্রহ ছিল। সম্ভবত সমকালের বিজ্ঞানচেতনা থেকে তাঁরা বাস্তব সম্পর্কে এই নতুন তত্ত্ব লাভ করেছিলেন। তাছাড়া নিজেদের দেশ ও সমাজের নিষ্ঠুরতা যেমন এঁদের মনে প্রচলিত নীতি ও মূল্যবোধের যাথার্থ্য সম্পর্কে সংশয় জাগিয়েছিল, তেমনই জীবনের আপাত-অসংগতি ও সামঞ্জস্য সম্পর্কেও অবিশ্বাসী করে তুলেছিল। বেকেট, ইওনেস্কো ও আদামভ একদা নিজেদের দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসবাস করতেন। বোধহয় এই নির্বাসনই তাঁদের সমকালীন মানুষের নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকার যন্ত্রণাকে নাট্যরূপ দিতে উৎসাহী করেছিল।
আঁতোয়া আর্তো অ্যাবসার্ড নাটককে ‘Theatre of cruelty’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন নাট্যকারদের প্রতিটি রচনায় পিছনে উদ্দেশ্য-সচেতনতা ও সমকালীন মানুষের চিন্তার উপর আঘাত করে তাদের জীবন সম্পর্কে সজাগ করে দেওয়ার সক্রিয় প্রয়াস থাকে। ইওনেস্কো তাত্ত্বিক দিক থেকে উদ্দেশ্যমনস্কতার বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, কিন্তু অ্যালবির মন্তব্য অনুসরণ করলে আর্তো-র কথার সত্যতাই প্রমাণিত হবে। অ্যালবি ‘দ্য আমেরিকান ড্রিম’-এ মার্কিন পদ্ধতির জীবন-রসিকতার সমালোচনা করেছিলেন এবং ‘দ্য জু স্টোরি’-তে বুর্জোয়া সুখভোগের অর্থশূন্যতাকে কটাক্ষ করেছিলেন। তিনি একবার ‘ট্রান্সআটলান্টিক রিভিউ’ পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে সোজাসুজি জানিয়েছিলেন — “The responsibility of the writer is to be short of demonic social critic — to present the world and the people in it as he sees it and say ‘Do you like it? If you don’t like it change it.’” পরবর্তীকালে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন নাট্যকারদের অন্যতম দায়িত্ব হল জনসাধারণকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া এই প্রত্যাশায় যে তারা হয়ত তাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে।
অ্যালবির ধারণার সঙ্গে কামু বা ইওনেস্কোর ধারণার মূলগত পার্থক্য অতিশয় স্পষ্ট। নাটকের উদ্দেশ্য নিয়ে একদা কেনেথ টাইনানের সঙ্গে ইওনেস্কোর মতদ্বন্দ্ব হয়েছিল। ‘অবজার্ভার’ পত্রিকায় ১৯৫৮ সালের ২৯ জুন তারিখে প্রকাশিত ‘দ্য প্লেরাইটস রোল’ লেখাটিতে ইওনেস্কো বলেছিলেন টাইনান শিল্পীকে মানবজাতির ত্রাতার ভূমিকায় দেখতে চান। কিন্তু জগতবাসীর কাছে ত্রাণের বাণী শোনাতে আসেন ধার্মিকেরা, নীতিবিজ্ঞানীরা এবং রাজনীতিবিদেরা। নাট্যকার নাটকের জন্যই নাটক লেখেন এবং জীবন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য দেন, তিনি নীতিকথা প্রচার করেন না। আদর্শমূলক নাটক অর্থহীন। ইওনেস্কো মনে করতেন কোনও সমাজব্যবস্থা বা রাজনৈতিক অবস্থা আমাদের জীবনযন্ত্রণা বা মৃত্যুভীতি থেকে বাঁচাতে পারে না এবং জাগতিক কামনা থেকে উদ্ধার করতে পারে না। সুতরাং শূন্যগর্ভ শ্লোগান ও গালভরা নীতিকথায় গড়ে ওঠা এই জীবন যেমন অর্থহীন, তেমনই জীবনে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সংলাপগুলিও অর্থহীন। তাই সাহিত্যে জীবনের খণ্ডরূপের যথার্থ ছবি ফুটিয়ে তুলতে হবে এবং সেই কারণেই ছকে বাঁধা সংলাপও ভেঙে ফেলতে হবে। মানুষের জীবনে এমন অনেক সত্য আছে যা সে অপরের কাছে বলতে পারে না। এই সত্যই নাটকে রূপ নেবে। এই ধারণা থেকেই ইওনেস্কো নাট্যরচনার প্রচলিত পদ্ধতির বিরোধীতা করেছিলেন এবং অ্যাবসার্ড নাটক লিখতে প্রয়াসী হয়েছিলেন ।
ইওনেস্কো একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন তিনি কখনওই বিষয়গত বাস্তবতার স্বার্থে নাটকের রূপরচনার কৌশলকে বিসর্জন দেননি। সাহিত্য যেহেতু জীবনেরই রূপ, সুতরাং একালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জীবনের পটভূমিতে গল্প-উপন্যাস-নাটকের ভাষাগত ও রীতিগত পরিবর্তন ভীষণরকম জরুরী। অ্যাবসার্ডবাদীরা সকলেই সমকালের মানুষের বিচ্ছিন্নতা, আত্মিক যন্ত্রণা, নৈতিক বিপর্যয় ও বিস্ময়-কাতরতাকে তাঁদের নাটকের বিষয়বস্তু বলে স্বীকার করেছেন। তাঁরা অন্তর দিয়ে এই যুক্তিনির্ভর ও সুসংগত জীবনের অন্তঃসারশূন্যতার তাৎপর্য উপলব্ধি করেছেন। তাই তাঁরা লেখনীকে বিদ্রূপে শাণিত করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে অসঙ্গত তার মাধ্যমে বর্তমান কালের মানুষের বিস্ময়-ব্যাকুল মানুষের প্রশ্নকে তুলে ধরেছেন। অতএব আর্তো যে cruelty-র কথা বলেছেন তা অ্যাবসার্ড নাটকের বৈশিষ্ট্য হতে বাধ্য। ধনতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা যেখানে জীবনের সনাতন মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটিয়ে মানুষকে প্রতি মুহূর্তে বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার অভিশাপে ক্লিষ্ট করে তুলেছে, সেখানে বাস্তবানুগ সাহিত্যেও cruelty-র প্রকাশ অনিবার্য। তার প্রকাশ কখনও স্পষ্ট, কখনও তীর্যক ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ।
আরাবেল রচিত ‘দি অটোমোবাইল গ্রেভইয়ার্ড’ নাটকে আমরা দেখি এক বারবণিতা নিজের বৃত্তিতে সমর্পিতচিত্ত, সে বলেছে ধর্মের নির্দেশ যেহেতু প্রতিবেশীদের প্রতি সদয় হওয়া তাই কেনই বা সে অপরের কাছে নিজের দেহকে তুলে ধরবে না। এই বক্তব্য যেন সনাতন রীতির যাথার্থ্য সম্পকে একটি বিদ্রূপাত্মপ প্রশ্নচিহ্ন। পাশাপাশি আরাবেল-এর ‘দ্য টু একজিকিউশনার্স’ নাটকে সামাজিক ন্যায়নীতির অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য থেকে জন্ম নেওয়া সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে দেখি মোরিস তার মাতা ফ্রাঁসোয়া-র সমালোচক, যেহেতু সে তার পিতাকে নির্যাতন করে। আবার নিগৃহীত পিতাকে রক্ষা করতে গিয়ে মাতার আদেশের বিরোধিতা করাও সনাতন রীতির পরিপন্থী। সুতরাং ক্ষেত্র-বিশেষে প্রচলিত নীতি-নিয়মই মানুষকে এমন বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় যার পরিণামে সমস্ত নীতির ব্যাপারটাকেই তার অ্যাবসার্ড মনে হয়।
যাঁরা objective reality প্রচার করতে চান এবং সাহিত্যকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের প্রচার-মাধ্যম মনে করেন তাঁদের উদ্দেশ্যে অ্যাবসার্ডিস্টরা বলেন মানুষের অন্তর্লোকে যে সমস্যার উদ্ভব হয় তাকে রূপায়িত করাও শিল্পীর উদ্দেশ্য। বাস্তবতার পৃষ্ঠপোযক বলে পরিচিত সাহিত্যিকরা অসঙ্গত ও অসমঞ্জস বাস্তবকে শিল্পরূপ দেওয়ার সময় যে সঙ্গতিপূর্ণ ও সুসমঞ্জস ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেন তার বিরুদ্ধে অ্যাবসার্ডবাদীরা অভিযোগের আঙুল তোলেন। তার উপরে আমাদের অন্তরের গভীরের chaotic multiplicity তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় অ্যাবসার্ড নাটকে বাস্তবতার অর্থ ও তাৎপর্যই যেন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। মার্টিন এসলিন বলেছেন অ্যাবসার্ড নাটকের বাস্তবতা মানুষের জীবনের এক জাতীয় অন্তরঙ্গ বাস্তবতা। এই নাট্যকারেরা মানুষের বহিরঙ্গ জীবনসত্য রূপায়ণের থেকে তার গভীর অবচেতন-লোকের স্বরূপ সন্ধানেই বেশি তৎপর।
মানুষের অন্তর্লোক সব সময় জাগতিক কার্য-কারণের সম্পর্ক অনুযায়ী পরিচালিত হয় না, সেখানে নানা বিপরীতের ভাবসমন্বয় ঘটে এবং ভিন্নমুখী তরঙ্গের সংঘাত হয়। বিচিত্র সমন্বয় ও সংঘাতে গড়া মানুষের অন্তরের গোপনতম প্রদেশ বিংশ শতাব্দীর শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভাবিত করেছে। মগ্নচৈতন্যের রূপকার সুররিয়ালিস্টদের শিল্পচর্চায় তার প্রমাণ রয়েছে। তাঁরা নানা ভাবে অ্যাবসার্ডিস্টদের প্রভাবিত করেছিলেন। তা ছাড়া অ্যাবসার্ডিস্টরা তাঁদের পূর্ব-ঐতিহ্য লাভ করেছিলেন বিদূষক বা ভাঁড় জাতীয় চরিত্র থেকে, যাদের মুখে আপাতবিচারে অসঙ্গত মন্তব্যের অন্তরালে সুগভীর জীবনবোধের প্রকাশ ঘটত। শেক্সপীয়র প্রভৃতি নাট্যকারদের রচনায় এই ধরণের চরিত্রের দেখা মেলে।
মানুষের জীবনের অ্যাবসার্ডিটি সম্পর্কে কাফকার দার্শনিক বিশ্বাস ছিল স্পষ্ট। তাঁর ‘মেটামরফোসিস’-এ পতঙ্গে রূপান্তরিত গ্রেগর সামসা সাধারণ মানব-জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সে ছিল সাধারণ বোধ ও অনুভূতির অধিকারী। তাই জীবন, সমাজ, পরিবেশ ও মানুষের ধনতান্ত্রিক স্বভাব সম্পর্কে সে সচেতন ছিল। রূপান্তরিত অবস্থায় সে আরও প্রখরভাবে হৃদয়ধর্মের অধিকারী। কাফকা যেন ধনতন্ত্র-শাসিত সমাজের বিবেকহীন আত্মমগ্নতা থেকে দূরে অবস্থান করে স্থিতধী সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল’-এ বিনা অপরাধে অভিযুক্ত যোসেফ কে যখন জ্যোৎস্নারাতে দুই নির্বাক ঘাতকের হাতে প্রাণ হারায় তখন তার মুখ থেকে বিস্ময় ও ঘৃণামিশ্রিত একটি কথাই বেরিয়েছিল — “Like a dog?” বস্তুত বিচার যখন প্রহসন মাত্র, স্নেহ-ভালবাসার সম্পর্ক যখন আর্থিক সুযোগ-সুবিধার উপর নির্ভরশীল এবং অনুভূতিহীন মানুষ যখন আত্মপ্রতারণায় তৎপর তখন একটি কুকুর, একটি গণ্ডার বা একটি পোকার সঙ্গে মানুষের জীবনের কোনও তফাত নেই।
আমাদের সমাজ-জীবনের অভ্যন্তরের অসঙ্গতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার জন্য উদ্ভট চরিত্র পরিকল্পনা করা এবং তার মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে অসমঞ্জস ধারণার প্রকাশ ঘটানো অ্যাবসার্ডিস্টদের নিজস্ব পদ্ধতিরূপে স্বীকৃত। চিরকালাবধি প্রচলিত সামাজিক আদর্শ ও নীতিতত্ত্বে একালের অনেক চিন্তাবিদই আস্থা হারিয়েছিলেন। তাই ব্রেশট্-এর মতো সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নাট্যকারেরা সামাজিক অনাচারের পটভূমিতে ব্যক্তিজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা ও সংগ্রামের সত্যরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে ইওনেস্কো প্রমুখ অ্যাবসার্ডিস্টদের রচনায় ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সামাজিক ন্যায়-নীতির বিপর্যয় ও অনাচারের ব্যাঙ্গাত্মক ছবি রূপলাভ করেছে। ব্রেশট্ বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্রের পথেই মানুষের মুক্তি সম্ভব, তাঁর নাটকে সেই আশাবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। পক্ষান্তরে অ্যাবসার্ডবাদীরা ব্যষ্টির যন্ত্রণা ও দুঃখময় পৃথিবীকে বাস্তববাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে জীবনের গতানুগতিকতা ও বিশ্বাসের মর্মে আঘাত হানতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁরা কখনই নৈরাশ্যের প্রচারক ছিলেন না। ‘অ্যাসার্ড ড্রামা — পেঙ্গুইন প্লেজ’ (১৯৫৮) বইটির ভূমিকায় মার্টিন এসলিন্ বলেছেন — “It is true that basically the Theatre of the Absurd attacks the comfortable certainties of religious or political orthodoxy. It aims to shock the audience out of complacency, to bring it face to face with the harsh facts of the human situation as these writers see it. But the challenge behind this is anything but one of despair.”
১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর সানফ্রান্সিসকো অঞ্চলের প্রায় চৌদ্দশো দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর সামনে বেকেট-এর ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ অভিনীত হয়েছিল। নাটক দেখে এই লোকগুলির বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, কেউ বলেছিলেন ‘Godot is society’, আবার কেউ বলেছিলেন ‘He is the outsider’। এখানে বিস্ময়কর ব্যাপার হল এরা নাট্যরসিক না হওয়া সত্বেও বেকেট-এর নাটকটির তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যেটি বছর দুয়েক আগে লণ্ডন শহরের নাট্যমোদীদের কাছে অস্পষ্ট ও অর্থহীন ঠেকেছিল। প্রচলিত পদ্ধতির ছকে বাঁধা নাটক দেখে অভ্যস্ত জনগণ সাধারণ ভাবে সব অ্যাবসার্ড নাটকেই অর্থহীনতা ও অসঙ্গতি ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পান না। নাটক ও দর্শকের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতার ফলে প্রচলিত নাট্যরীতির প্রধান সূত্রগুলিরই পরিবর্তন ঘটল। এর ফলে নাটকের সঙ্গে দর্শকের অন্তরঙ্গভাবে একাকার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আর রইল না। ব্রেশট্ নাটকের চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের identified হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দূর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, কেননা আবেগে অপেক্ষা মননের দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল। অ্যাবসার্ডিস্টরা এই identification দূর করতে প্রয়াসী হলেন। তাঁরা দর্শকের সামনে কতকগুলি বিচ্ছিন্ন সূত্র তুলে ধরতে চাইলেন। শুধু তাই নয় তাঁরা পাঠকের ভিতরে শিল্পের সমগ্র মূর্তি নির্মাণের কৌশলকে জাগ্রত করে তুলতে যত্নবান হলেন, অর্থাৎ পাঠককে চিন্তাশীল স্রষ্টা করে তুলতে চাইলেন। অস্তিত্ববাদী সার্ত্র-ও বিশ্বাস করতেন পাঠকই সাহিত্যের যথার্থ স্রষ্টা।
অস্তিত্ববাদীরা বা অ্যাবসার্ডবাদীরা কেউই ট্র্যজেডিতে বিশ্বাস করতেন না। ট্র্যাজেডির বদলে তাঁরা দর্শকদের সামনে নিয়ে এলেন নতুন ধরণের কমেডি (‘হাউ টু গেট রিড অব ইট’), মেলোড্রামা (‘দ্য টু একজিকিউশনার্স’) ও ট্র্যাজিক ফার্স (‘দ্য চেয়ারস’)। এগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়ে দর্শকরাও নাটক থেকে নতুন অর্থগত তাৎপর্য সন্ধান করলেন। যেমন রোজ জিম্বার্ডো অ্যালবি-র ‘দ্য জু স্টোরি’ নাটকে জেরির মধ্যে যীশুর প্রতীক এবং কুকুরটির মধ্যে নরকের প্রহরী বলে বর্ণিত কুকুরের প্রতীক খুঁজে পেয়েছেন। অ্যালবি দর্শকের এই স্বাধীনতা মানতেন। তাই তিনি বলেছিলেন, সমকালের সঠিক মূর্তি নাটকে রূপায়িত হতে দেখে দর্শকেরা নিজেদের পরিবেশ পরিবর্তনের কথা ভাববেন, নাট্যকার অবশ্যই সেরকম আশা করতে পারেন। সেই আশা থেকেই অ্যাবসার্ডিস্টরা প্রাচীন নাট্যরীতি ও সংলাপ রচনার কৌশল ভেঙেছেন। সমকালের পাঠক বা দর্শকরা যেহেতু তাঁদের বিশ্বাসের জগত থেকে চিরকালের মত নির্বাসিত হয়েছেন, তাই শুধু তাঁদের আবেগকে উজ্জীবিত করেই নয়, চিন্তাশক্তির উজ্জীবনের জন্যই অ্যাবসার্ডিস্টরা সচেতনভাবে এই নাট্যকৌশল উদ্ভাবন করেছেন। তাঁরা যেন দর্শক ও পাঠকদের প্রতিকূল বাস্তব ও সামাজিক ন্যায়নীতির অর্থশূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
অ্যাবসার্ডিস্টরা পাঠকের মানসিকতা ও চিন্তাশক্তির কাছে আবেদন জানান। প্রাত্যহিক জীবনের উৎকন্ঠা ও চিন্তার দাসত্ব থেকে মানুষকে বের করে আনাই তাঁদের কাম্য। কাফকা তাঁর চরিত্র গ্রেগর সামসা ও যোসেফ কে-র মাধ্যমে এবং কামু তাঁর চরিত্র মার্সো-এর মাধ্যমে জীবনের নিষ্ঠুরতা, ঔদাসীন্য, ন্যায়-নীতির বিপর্যয় ও বিচার ব্যবস্থার নামে প্রহসনের পরিণতিকে মননসমৃদ্ধ সাহিত্যরূপ দান করেছিলেন। মাটিন এসলিন বলেন অ্যাবসার্ড সাহিত্য বাস্তব-সচেতন পাঠকের মনে এই বোধ জাগাতে পারে যে — “the dignity of man lies in his ability to face reality in all its senselessness; to accept it freely, without fear, without illusion, and to laugh at it.”
অ্যাবসার্ডিস্টরা বিভিন্ন প্রসঙ্গে সাহিত্য সম্পর্কে যে ধারণা ব্যক্ত করেছেন তা সর্বক্ষেত্রে অভিন্ন নয়, কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে তাঁদের সকলের বিশ্বাস একই রকম ছিল। তাঁরা সকলেই মনে করতেন সাহিত্যিকের কাজ হল তাঁর সমকালীন মানবজীবনকে সাহিত্যে রূপায়িত করা। কিন্তু যে বাস্তবকে তাঁরা রূপায়িত করবেন তা যেমন দেখেছেন পুরোপুরি সেই বাস্তব নয়। সাহিত্যিককে লিখতে গিয়ে অনেক কিছু বর্জন করতে হবে। তাঁর বাস্তবতা objective নয়, বরং বিষয়গত বা subjective। পাশাপাশি সাহিত্যিক মানুষের মহিমাকে ক্ষুণ্ণ করবেন না বা তাকে পলায়নী মনোবৃত্তিসম্পন্ন করবেন না। তিনি জীবনকে নির্ভয়ে ও নির্মোহ চিত্তে সহ্য করতে শিক্ষা দেবেন। অ্যাবসার্ডিস্টরা সকলেই এই ধারণা পোষণ করেন যে সাহিত্যিক পাঠকের মননের জগতকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হবেন। তাঁদের মতে অ্যাবসার্ড নাটকের রচয়িতার উদ্দেশ্য হবে দর্শক ও চরিত্রের মধ্যে অবকাশ সৃষ্টি করে তার চিত্তলোককে সৃজনক্ষম করে তোলা। তাঁরা মনে করেন ট্র্যাজেডি বা প্রাচীন পদ্ধতির কমেডি নয়, একালের শিল্পরূপ হবে মেলোড্রামা, ট্র্যাজিক ফার্স বা নতুন ধরণের কমেডি।
অ্যাবসার্ডবাদীদের নিজেদের মধ্যে চিন্তাধারা ও রচনাকৌশলের দিক থেকে সাদৃশ্য থাকলেও কিছু স্বাতন্ত্র্যজনিত বিভিন্নতাও ছিল। তাত্ত্বিক দিক থেকে মতপার্থক্যই এর মূল কারণ। যেমন কামু বা হেমিংওয়ে দর্শনের দিক থেকে অ্যাবসার্ড নাট্যকারদের থেকে অভিন্ন। কিন্তু তাঁরা কেউই কাহিনির রূপনির্মাণের ক্ষেত্রে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার সংকলন করেননি বা অসংলগ্ন বাক্যও ব্যবহার করেননি। অথচ ইওনেস্কো প্রমুখ নাট্যকারেরা এই পদ্ধতিতেই দর্শক বা পাঠকের চিন্তাজগতে উদ্দীপনা জাগাতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল প্রাচীন জীবনাদর্শের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের প্রকাশরীতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। আবার কামু এবং ইওনেস্কো মনে করতেন সাহিত্যিক শুধুই জীবনরূপের স্রষ্টা, তিনি কোনও কিছুকেই প্রচারের চেষ্টা করবেন না। কিন্তু অ্যালবি মনে করতেন নাটকের দ্বারা শিল্পী জনসাধারণকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে দেবেন এই আশায় যে পছন্দ না হলে তারা পরিবর্তন করে নেবে। অ্যালবি অবশ্য চিন্তাধারায় বরাবরই অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। তাঁর ‘The Zoo Story’ নাটক থেকে মনে হয় তিনি এক ধরণের ন্যায়শাস্ত্র অনুমোদিত সিদ্ধান্ত ও আবেগে আস্থাশীল ছিলেন। পক্ষান্তরে বেকেট বা ইওনেস্কো কোনও রকম ভাবপ্রবণতা বা নৈয়ায়িক-সুলভ কার্য-কারণ সম্পর্কের শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী ছিলেন না।
দর্শনের দিক থেকে অ্যাবসার্ডবাদীদের post-existential দার্শনিক বলা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে অ্যাবসার্ডবাদীদের দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। একটি শ্রেণীতে পড়েন কাফকা, কামু বা হেমিংওয়ে-র মতো লেখকেরা, যাঁদের ক্ষেত্রে অ্যাবসার্ড দর্শনের ভিত্তিটাই ছিল প্রধান। অন্য শ্রেণীতে পড়েন বেকেট, ইওনেস্কো, আদামভ প্রভৃতি নাট্যকারগণ, যাঁরা কেবলমাত্র তত্ত্ব-প্রতিষ্ঠায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিচ্ছিন্নতা ও অসংলগ্নতাকে সাহিত্যরূপে মূর্ত করতে চেয়েছেন।
অস্তিত্ববাদীদের সঙ্গে অ্যাবসার্ডবাদীদের পার্থক্য কালগত নয়, যা কিছু পার্থক্য সেটা ভাবগত। উভয় শ্রেণীর তাত্ত্বিকেরাই সমকালীন মৃত্যু-তাড়িত, শূন্যগর্ভ জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও অর্থহীনতার দিকটি প্রচার করেছিলেন। তাঁদের সকলেরই লেখায় মানবতার দিক উজ্জ্বল। জীবন ও সাহিত্যের সত্যতা সম্পর্কে অস্তিত্ববাদীরা এবং অ্যাবসার্ডবাদীরা একই মত পোষণ করেন যে জীবনের উপরিতলের বাস্তব নয়, বিষয়গত বাস্তবই হল সাহিত্যের সত্য। কিন্তু সাহিত্য সম্পর্কে অস্তিত্ববাদীদের সঙ্গে অ্যাবসার্ডবাদীদের মত-পার্থক্য একেবারে স্পষ্ট। প্রথমত, অস্তিত্ববাদীদের কাছে সাহিত্য হল বাস্তবজগতকে সুসহ করার জন্য অবাস্তব সৌন্দর্যের জগত। অন্য দিকে অ্যাবসার্ডবাদীরা সাহিত্যকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন বলে মনে না করলেও জীবনসংগ্রামে প্রতারিত ব্যক্তির পলায়নের কল্পলোক বলেও ভাবেন না। দ্বিতীয়ত, উপন্যাস বা নাটকের সূচনা বা সমাপ্তির ব্যাপারে অস্তিত্ববাদীরা সনাতন রীতির অনুসারী। কিন্তু বেশির ভাগ অ্যাবসার্ডবাদীই রচনার সূচনা ও সমাপ্তির মধ্যে সংযোগ রক্ষা করার আবশ্যকতা মানেন না। তৃতীয়ত, সার্ত্র প্রভৃতি অস্তিত্ববাদীরা পাঠক বা দর্শকদের ভূমিকার গুরুত্বের উপর যতটা জোর দিয়েছিলেন অ্যাবসার্ডবাদীরা ততটা দেননি। তবে ইওনেস্কো, অ্যালবি প্রমুখ নাট্যকারেরা সাহিত্য উপলব্ধিতে পাঠকের সৃষ্টিক্ষমতার উপর নির্ভর করতেন এবং দর্শকের মননশীলতায় বিশ্বাস করতেন।
অ্যাবসার্ডবাদীরা সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্কে যুক্ত। কিন্তু তাঁরা প্রচলিত শিল্পরূপে আস্থাহীন এবং জীবন পর্যালোচনায় বাস্তবসচেতন ও কৌতুক-মিশ্রিত দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী। ইউজিন ইওনেস্কো, হ্যারল্ড পিন্টার প্রভৃতি নাট্যকারের অভিমত হল – একটি পরিস্থিতি এবং কয়েকটি চরিত্র হলেই নাটকের জন্ম হতে পারে। কিন্তু অ্যাবসার্ডবাদীরা জীবন সম্পর্কে নির্লিপ্ত নন, কারণ সমকালীন মানুষের জীবনসমস্যাই তাঁদের রচনার উপজীব্য। আবার অ্যাবসার্ডবাদীরা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতারও সমর্থক নন, কারণ তাঁরা subjective reality-তে বিশ্বাসী। তাঁরা সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীদের মতো ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক আলোচনা না করলেও এ দু’য়ের সম্পর্কের বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং একক ব্যক্তির মধ্যেই সামাজিক সংকটের স্বরূপ রূপায়িত করেছিলেন। অন্য সাহিত্যিকদের মতোই অ্যাবসার্ডবাদীরাও মানবজীবনের বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যসিদ্ধিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন না। কিন্তু তিনি পরোক্ষে সমাজ-সমালোচকের ভূমিকা গ্রহণ করেন, কারণ জীবনের অসংলগ্নতা, নিষ্ঠুরতা, উদাসীনতা ইত্যাদি তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তু। মার্টিন এসলিন এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে — “Theatre of the Absurd does not provoke tears of despair but laughter of liberation.”


