সুরঞ্জিত সরকার
সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল। হৃদপিণ্ডের শব্দ যেন নিজেদের কানেই তখন ড্রামের মতো বাজছে।
সিঁড়ি দিয়ে ভারি বুট জুতোর শব্দ ক্রমশ ওপরে উঠে আসছে। দাদুর হাঁটার শব্দ এটা নয়, কারণ দাদু সবসময় চটি পরে। সুমন্ত কল্যাণের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। টর্চটা আগেই নিভিয়ে দিয়েছে ওরা। ঘরের নীল পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সামান্য আলোয় দেখল, দরজার চৌকাঠে একটা দীর্ঘকায় মানুষের ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে। এই মূহূর্তে নিস্তব্ধতাই প্রধান হাতিয়ার।
লোকটা ঘরে ঢুকেই পকেট থেকে একটা জোরালো সার্চলাইট জ্বালল। আলোর তীব্রতায় সুমন্তদের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড়। লোকটা সোজাসুজি আলমারির দিকে না গিয়ে নীল পর্দার দিকে এগিয়ে গেল। মনে হচ্ছে সে জানে সিন্দুকটা ঠিক কোথায় লুকানো আছে।
আগন্তুক সিন্দুকের পাল্লাটা খুলতেই থমকে দাঁড়াল। হয়তো সে বুঝতে পেরেছে কেউ কিছুক্ষণ আগেই এখানে হাত দিয়েছে।
সে নিচু গলায় বিড়বিড় করে উঠল, “তাহলে ওটা এখানে নেই? “
গলার স্বরটা খুব চেনা অথচ অচেনা।
কল্যাণ ফিসফিস করে সুমন্তর কানে বলল, “খুব চেনা লাগছে। লোকটাকে পিছন থেকে দেখে ছোটকাকুর মতো লাগছে। তাই না?”
আগন্তুক বিরক্তিভরে সিন্দুকের ভেতরটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু সুমন্তরা আগেই ডায়েরিটা বের করে সিন্দুকের ভেতরে থাকা অন্য একটি কাগজের স্তূপের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল। লোকটা যখন জানলার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ফোনে কাউকে নির্দেশ দিচ্ছিল, সেই সুযোগে সুমন্ত ইশারায় কল্যাণকে পেছনের বারান্দার দিকে যাওয়ার পথটা দেখাল।
বারান্দার দিকের দরজাটা দিয়ে বাইরে বেরোনোর একটা সরু রাস্তা আছে যেটা সরাসরি বাগানে গিয়ে মেশে। কিন্তু দরজার কবজায় মরচে ধরা থাকায় খুলতে গেলেই শব্দ হওয়ার ভয়। ওদিকে আগন্তুক ফোনের কথা শেষ করে এবার আলমারির দিকেই নজর দিচ্ছে।
সুমন্ত আর কল্যাণ আলমারির আড়ালে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। আগন্তুক যখন তার সার্চলাইটটা ঘরের চারদিকে ঘোরাচ্ছিল, তখন জানলার একটা ভাঙা কাঁচ দিয়ে আসা বিকেলের ম্লান আলো সরাসরি তার মুখে পড়ল।
আলোটা পড়তেই সুমন্ত আর কল্যাণের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এই তীক্ষ্ণ নাক আর কপালের কাটা দাগটা তো তাঁদের খুব চেনা! লোকটা তাঁদের ছোটকাকা নয়, বরং পাশের বাড়ির ইন্দ্র কাকু। যিনি সবসময় দাদুর সাথে দাবা খেলতেন আর খুব অমায়িক ব্যবহার করেন। তাঁর মতো একজন মানুষ কেন এভাবে লুকিয়ে পূরবী ভবনে সিন্দুক খুঁজবেন, সেটা ভেবেই দুই ভাইয়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
ইন্দ্র কাকু পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে একটা কল করলেন। ওপাশ থেকে কেউ ধরতেই তিনি চাপা অথচ ক্রূর গলায় বললেন, “সিন্দুক খোলা রয়েছে কিন্তু ডায়েরিটা কোথাও নেই। মনে হচ্ছে বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল। আমি এখনই বেরোচ্ছি।”
ফোনটা শেষ করেই ইন্দ্র কাকু হঠাত থমকে দাঁড়ালেন। তিনি সম্ভবত ঘরের বাতাসে সুমন্তদের পারফিউমের গন্ধ বা কোনো হালকা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ টের পেয়েছেন। তিনি খুব ধীর পায়ে আলমারির দিকে এগোতে শুরু করলেন। কল্যাণের মনে হলো ওর হার্টবিট এখন ইন্দ্র কাকুও শুনতে পাচ্ছেন।
ইন্দ্র কাকু যখন আলমারির ঠিক কোণায় পৌঁছে গেছেন, তখনই বাইরের বাগানে একটা ডাস্টবিন ওল্টানোর জোরে শব্দ এল। ইন্দ্র কাকু চমকে জানলার দিকে ঘুরে গেলেন। সেই কয়েক সেকেন্ডের সুযোগে সুমন্ত আর কল্যাণ আরও একটু অন্ধকারের গভীরে সেঁধিয়ে গেল।
ইন্দ্র কাকু বিড়বিড় করে বললেন, “কেউ নেই বোধহয়, মনের ভুল।” এরপর তিনি ঘর থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে তাঁর নেমে যাওয়ার শব্দ পাওয়া যেতেই কল্যাণ ফিসফিস করে বলল, “ইন্দ্র কাকুও কি নীল ডায়েরির রহস্য জানেন?”
দুই ভাই আলমারির আড়ালে শ্বাস রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। সিঁড়ি দিয়ে ইন্দ্র কাকুর ভারী পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সদর দরজা বন্ধ হওয়ার একটা ভোঁতা আওয়াজ আসতেই পূরবী ভবন আবার সেই আগের মতো নিঝুম হয়ে গেল।
ওদিকে কৈপুকুরের বাড়িতে ঘটে গেছে এক নিঃশব্দ ঘটনা। দাদু অতীশ যখন স্নানঘর থেকে বেরিয়ে মালাটা পরেছিলেন, তখনই তিনি বুঝেছিলেন রুদ্রাক্ষের ভারটা আজ একটু অন্যরকম। চাবিটা তিনি বহু বছর ধরে স্পর্শ করে আসছেন, তাই তার সামান্য ওজনের হেরফেরও ওঁর আঙুল এড়ায়নি। তিনি মুচকি হেসেছিলেন—সুযোগ সন্ধানী ছেলেদের কাণ্ড দেখে।
কল্যাণ জানলার পর্দা একটু ফাঁক করে দেখল ইন্দ্র কাকু গেট দিয়ে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে না গিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। সুমন্ত ফিসফিস করে বলল, “দেখলে? ইন্দ্র কাকু কিন্তু চট করে চলে গেলেন না। উনি কি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন?”
নিশ্চিত হওয়ার জন্য ওরা আরও দশ মিনিট অপেক্ষা করল। ঘর এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। সুমন্ত পা টিপে টিপে সিন্দুকের কাছে গেল। কাগজের স্তূপ সরিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত নীল ডায়েরিটা বের করে নিল। ডায়েরির মলাটটা চামড়ায় মোড়া, তার ওপর রুপোলি হরফে কিছু একটা লেখা যা ধুলোর কালচে আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে।
ডায়েরিটা হাতে নিতেই কল্যাণ খেয়াল করল, ইন্দ্র কাকু সিন্দুকটা ঘাঁটার সময় একটা ছোট কাগজ মেঝেতে ফেলে গেছেন। কাগজটা তুলে নিতেই সুমন্তর চোখ ছানাবড়া! ওটা একটা চিরকুট, যাতে লেখা ছিল। “সবাইকে বিশ্বাস করতে নেই, এমনকি নিজের রক্তকেও নয়। ইন্দ্র, ওদের গতিবিধির ওপর নজর রেখো।”
সুমন্ত ঢোক গিলে বলল, “কল্যাণদা, দাদু সব জানেন! উনি ইচ্ছে করেই আমাদের এই পথে আসতে দিয়েছেন। ইন্দ্র কাকু আসলে দাদুর হয়ে আমাদের ওপর নজর রাখছেন, আমাদের ধরতে নয়।”
কল্যাণ ডায়েরিটা জামার ভেতর লুকিয়ে বলল, “কিন্তু দাদু কেন সরাসরি আমাদের কিছু বলছেন না? কেন এই চোর-পুলিশ খেলা? চল, এখান থেকে আগে বেরোতে হবে।
সুমন্ত ও কল্যাণ ঠিক করল তারা কোনো ঝুঁকি নেবে না। ইন্দ্র কাকু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই দাদুর পাতা জালে পা দেওয়া। তারা নিঃশব্দে ঠাকুমার ঘরের পেছনের একফালি বারান্দায় বেরিয়ে এল।
পূরবী ভবনের পেছনের পাঁচিলটা বেশ উঁচু, কিন্তু তার গায়ে একটা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ ডালপালা মেলে দেওয়ালটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। সুমন্ত প্রথমে গাছের ডালে পা দিয়ে পাঁচিলের মাথায় উঠল, তারপর হাত বাড়িয়ে কল্যাণকে টেনে তুলল। ডায়েরিটা কল্যাণের বুকে সজোরে চেপে ধরা। তারা যখন ওপাশে লাফিয়ে পড়ল, তখন একঝাঁক পাখি শব্দ করে উড়ে গেল—যেন তাদের পালানোর সাক্ষী থাকল আকাশ।
মা পূর্ণা নিজের ঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন। দুই ছেলেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি শিউরে উঠলেন। সুমন্ত কোনো কথা না বলে জামার ভেতর থেকে সেই নীল ডায়েরিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। ডায়েরিটা দেখে পূর্ণা দেবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “তোরা এটা আনতে পারলি? কিন্তু দাদু কি জানতে পেরেছে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে নিচতলা থেকে দাদু অতীশের গম্ভীর গলা শোনা গেল— “পূর্ণা! এক কাপ চা দিয়ে যাবে? আজ শরীরটা বড় ভার ভার লাগছে।”
দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকাল। দাদুর গলার স্বরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন তিনি জানতেন ঠিক এই সময়েই ছেলেরা ডায়েরি নিয়ে ঘরে ফিরবে।
কল্যাণ ডায়েরিটা খুলতেই দেখল প্রথম পাতায় কোনো লেখা নেই, শুধু একটা জটিল নকশা আঁকা। আর তার নিচে একটি ছোট চিরকুটে লেখা “চুরি করা চাবিতে সিন্দুক খোলে, কিন্তু রহস্যের দরজা খুলতে গেলে সাহস লাগে। তোরা প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিস।”
সুমন্ত বুঝতে পারল, এতক্ষণ তারা যা করেছে সবটাই ছিল দাদুর সাজানো একটি লিটমাস টেস্ট।
কল্যাণ বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ” তাহলে ইন্দ্র কাকুর ভূমিকা কি শুধুই নজরদারি ছিল, নাকি তিনি অন্য কোনো গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত?


