অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি তা যেমন সত্য, তেমনই যা ভাবছি বা স্বপ্ন দেখছি তা-ও একই রকম সত্য। কিন্তু সত্যের এই অর্থের ব্যাপকতা অনেক সময় জীবনকে উৎকন্ঠায় ভরিয়ে তোলে এবং ক্লান্তিতে ভারাক্রান্ত করে। এই উৎকন্ঠা ও ক্লান্তি যেহেতু মানসিক, তাই মনের গভীরে তার সঞ্চার ধীরে ধীরে শূন্যতার বীজ বপন করে। মনের গভীরে শূন্যতাবোধের ক্রিয়ার ফলে এক সময় মানুষের সবকিছুই শূন্য মনে হয়। এই ধরণের অন্তর্লীন শূণ্যতাবোধ থেকে মনের গভীরে রক্তক্ষরণ হয় এবং তারই দুর্বিষহ যন্ত্রণা সাহিত্যে ধরা পড়ে। ব্যক্তিমানুষের মনোজগতের এই শূন্যতাবোধ এবং তার সঙ্গে জীবনের সুনির্দিষ্ট পরিধি অতিক্রম করার দুর্নিবার বাসনা উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পাশ্চাত্যে বিশেষ দার্শনিক তত্ত্বের রূপ নিচ্ছিল।

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাকে যে ভীতি ও যন্ত্রণায় কাতর করে রাখে, ব্যক্তিমানুষ তার থেকে নিরুদ্বেগ মুক্তি কামনা করে। কিন্তু কঠিন কঠোর জগতে মানুষের নিভৃত চিন্তায় এই প্রশ্ন জাগে যে সে কেন এত একা। এই একাকীত্বের যন্ত্রণা যেকে বাইরের কোনও শক্তি তাকে মুক্তি দিতে পারে না, কারণ এর জন্ম হয় মানব মনের গভীরতম স্থানে। পিরানদেল্লো-র ‘Cinci’ (১৯৩২) গল্পটিতে দেখি এই একাকীত্বের যন্ত্রণা থেকেই দেহ-পসারিণী জননীর সন্তান তারই সমবয়স্ক একটি কিশোরকে মর্মান্তিক আঘাত করে বসে। আবার রর্বাট মুশিল-এর মুশ্ ব্রাগার একটি পতিতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হত্যার পথ ধরেছিল এবং মৃত্যুদণ্ড শোনার পর বিচারালয়েই উপরে হাত তুলে ঘোষণা করেছিল যে সে তৃপ্ত। বিপরীত দিকে থেকে সার্ত্র-র ‘The Room’ গল্পে পিয়ের ও তার পত্নী ইভ আরও গভীরভাবে নিঃসঙ্গতায় বিভোর হয়ে অন্যদের মানসিক সুস্থতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে পরস্পরের মধ্যে নিজেদের জীবনের সঠিক অর্থ খুঁজতে বসে।

নীৎসের জরথুষ্ট্র বলেছিল — “For the old Gods came to an end long ago. And verily it was a good and joyful end of Gods!” (Thus Spake Zarathustra, 1883)। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে বহু নতুন সত্য উদঘাটিত হয়েছিল, যার অভিজ্ঞতা মানুষের আগে ছিল না। যখন থেকে ঘোষিত হয়েছিল ইশ্বর মৃত এবং বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ফলে প্রচলিত বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছিল, তখন থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নেই বিব্রত হতে লাগল। কারণ সে নিজেকে জন্ম-মৃত্যু, পরিবেশ ও অতীতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইচ্ছাশক্তি-বহির্ভূত প্রাণী হিসাবে খুঁজে পেয়েছিল। ব্যক্তিমানুষ যে যন্ত্রণায় ভুগছিল তার কোনও সমাধান খুঁজে পাচ্ছিল না, ফলে সে ক্রমেই নৈরাশ্য-পীড়িত হয়ে পড়ছিল। তার সেই নিভৃত যন্ত্রণাবোধের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের ভাবনাও প্রবল ছিল। ব্যক্তিমানুষের গুরুত্বকে অস্বীকার করে এতদিন পর্যন্ত যে ইশ্বরপ্রেম ও দার্শনিক তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল, কিয়েকেগার্ডের হাত ধরে তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠল নতুন দর্শন — ‘অস্তিত্ববাদ’। ব্যক্তি-সম্পর্কহীন প্রলিত নীতি-নিয়মকে অস্বীকার করে এবং ব্যক্তিমনের জিজ্ঞাসা ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরতার দ্বারা তিনি অস্তিত্ববাদের গোড়াপত্তন করেন। এর পর পশ্চিমী সভ্যতার সামনে থেকে যখন পুরনো নীতি ও মূল্যবোধের আবরণ খসে পড়ার ফলে এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তখন আবির্ভূত হলেন নীৎসে। তিনি সিদ্ধান্তে এলেন কোনও কিছুরই অপরিবর্তনীয় বা চিরস্থায়ী রূপ নেই। তাঁর মতে সব জীবনই ক্রম-অগ্রসরমান এবং বিবর্তনীয়, সুতরাং কোনও বস্তুরই বিশুদ্ধ ও চূড়ান্ত রূপ বলে কিছু নেই।

নীৎসের বক্তব্য অনুযায়ী যেহেতু এই জগতে ইশ্বর অনুপস্থিত এবং মানুষের জীবন মিথ্যাচার, নিষ্ঠুরতা ও বৈপরীত্যে ভরা, সুতরাং জীবনকে সুসহ করার জন্য জগতের উপর সুন্দরের একটি মোহময় আবরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি মনে করেন শিল্প ও সাহিত্যই হল সেই আবরণ। অস্তিত্ববাদী নীৎসের মতে যথার্থ শিল্পের মূল লক্ষ্য হল মায়া বা ইল্যুশনের জগত রচনা করা। ‘The Birth of Tragedy’ গ্রন্থে তিনি বলেছেন — “Art is not an imitation of nature but its metaphysical supplement raised up beside it in order to overcome it.” পৃথিবীতে ইশ্বরহীন পার্থিব জীবনকে সহনীয় করে তোলা সম্ভব হয় ডাইনোসীয় প্রমত্ততার দ্বারা, যা এক ধরণের মানসিক উল্লাসের জন্ম দেয়। এই উল্লাসের মধ্যে মানুষ দুঃখ ভুলে যাওয়া এবং সম্ভাব্য যন্ত্রণা থেকে নিস্তারের উপায় খুঁজে পায়।   

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুটি বিশ্বযুদ্ধের ফলে মানুষ ধ্বংললীলা প্রত্যক্ষ করে, যার অভিঘাতে সারা পৃথিবীতে ওলটপালট হয়ে যায়। মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছিল সে নিজের মধ্যে কতটা সীমাবদ্ধ ও কতটা অসহায়। এর থেকে জনসাধারণের মনের গভীরে ব্যক্তিগত অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্ন জেগে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে যখন মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের এবং নিজের কর্মের সঙ্গে ইচ্ছার বিচ্ছিন্নতাজনিত যন্ত্রণা থেকে ভুগছে, কোনও এক যান্ত্রিক নিয়মের অন্ধ দাসত্বের ফলে সে নিজেও যেন পণ্য উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে এবং কোনও কিছু ইচ্ছা করার স্বাধীনতাও হারিয়ে ফেলছে, তখন আবির্ভূত হলেন জাঁ পল সার্ত্র। তিনি ভাগ্য, ফ্রয়েডীর অবচেতনের প্রভাব ইত্যাদি সব কিছু অস্বীকার করে ব্যক্তিমানুষের স্বাতন্ত্র্য এবং অস্তিত্বের সার্থকতা ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন মানুষ নিজেই নিজের কর্তা, নিজের জীবনকে সে যতটুকু গঠিত করে তোলে তার জীবন ততটুকুই। তাঁর ‘লুসিফার অ্যাণ্ড দ্য লর্ড’ নাটকে গোয়েটজ্-এর মুখে ঘোষিত হল অস্তিত্ববাদের বাণী — “The silence is God. The absence is God. God is the loneliness of man. There was no one but myself; I alone decided on evil; and I alone invented God.”। এখানেই না থেমে সে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলল — “If God exists, man is nothing; if man exists . . .”। পরিশেষে গোয়েটজ্ বলেছে — “Heinrich, I am going to tell you a colossal joke; God does not exist.” (Lucifer and the Lord, Act 3, Scene 10)। যেহেতু ইশ্বরের অস্তিত্বের উপর মানুষের অনস্তিত্ব নির্ভরশীল সেহেতু বিপরীতক্রমে ইশ্বরের অনস্তিত্বের উপর মানুষের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সুতরাং ইশ্বরই যখন নেই, তখন এটাই একমাত্র সত্য যে মানুষ আছে। দুঃখ যত তীব্রই হোক, আর অস্তিত্ব যত বিপন্নই হোক, এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি “Once for each thing. Just once; no more. And we too/ just once. And never again.” (The Duino Elegies (The Ninth Elegy) : Rainer Maria Rilke, translated by J. B. Leishman)।

নীৎসের ধারণা ছিল মিথ্যাচার, নিষ্ঠুরতা ও প্রবঞ্চনায় ভরা ইশ্বরহীন পৃথিবীর উর্ধ্বে শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে এক গ্লানিহীন, দৈন্যহীন, সহনীয় জগত গড়ে উঠবে। তাই জীবন-বিচ্ছিন্ন ভাবতন্ময়তা বা আত্মহননের দিকে তাঁর কোনও আকর্ষণ ছিল না। তাঁর মতে প্রতিটি মানুষই হল এক অতিমানবের অগ্রদূত এবং শিল্পীর লক্ষ্য হল সৌন্দর্যের আস্তরণে ঢাকা মানব-জীবনের সত্য মূতির রূপায়ণ। নীৎসের পরবর্তীকালে ফরাসী দেশের মুক্তিকামী নাগরিক সার্ত্র মনে করতেন শিল্পীর দায়িত্ব হল ব্যক্তিগতভাবে সমকালীন সমস্যা সম্পর্কে সজাগ থাকা। তাঁর মতে শিল্পীর কর্তব্য হল বাহ্য প্রকৃতির বৈপরীত্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করে মনের ঐক্য আরোপ করে তাকে শিল্পসম্মত করে তোলা। একইভাবে সাহিত্যিকের কর্তব্য হল লেখায় জীবন-সত্যের রহস্য বিশ্লেষণ করা এবং মানবজীবনে প্রকৃত সত্যকে সাহিত্যের বিষয়বস্তু করা।

প্রপঞ্চবাদী হার্সেল-এর ভাবশিষ্য সার্ত্র ফ্রয়েডীয় অবচেতনে সম্পূর্ণ অনাস্থা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সেই বস্তুকেই জীবনের সত্য বলে ঘোষণা করেছিলেন যা আমাদের চেতনলোকে স্পষ্ট ও গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। এর কারণ চেতনলোকই বস্তুজগতের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। সার্ত্র দু’ধরণের চেতনার কথা বলেছেন। একটি হচ্ছে প্রাক্-আত্মবাচক চৈতন্য, যার সহায়তায় কোনও বস্তু সম্বন্ধে আমাদের সরল জ্ঞান জন্মায়। আর অন্যটি হচ্ছে আত্মবাচক চৈতন্য, যার সাহায্যে কোনও বস্তু সম্পকে আমাদের সচেতনতার বিষয়ে আমরা সজাগ হই। তবে আমরা শুধুমাত্র সেই বিষয় সম্পর্কেই সজ্ঞান হতে পারি যা আমাদের কল্পনায় এসেছিল। কিন্তু বস্তু ও চেতনার স্বরূপ ও সম্পর্ক অপরের অস্তিত্বের ফলে পরিবর্তিত হয়ে যায়। বিষয়ী ও বিষয়ের কোনও অপরিবর্তনীয় স্বরূপ নেই, বরং একের স্বাধীনতা অপরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যদিও স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মেই মানুষের প্রকৃত অস্তিত্বের সার্থকতা, চেতনলোকের গুরুত্বের স্বীকৃতি এবং জীবনের সত্যের প্রতিষ্ঠা। সার্ত্র-র মতে শিল্পীর দায়িত্ব জীবন-সত্যের সন্ধান ও রূপায়ণ। তাঁকে প্রয়োজনে প্রত্যক্ষ সত্যকে তথাকথিত মিথ্যার আবরণে আবৃত করতে হবে। এই ভাবে শিল্পকে গড়ে তোলার জন্য স্বাধীন ও সচেতন ব্যক্তির ভূমিকা পালন করতে গিয়ে শিল্পীকে প্রায় ইশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। যদিও তিনি উপন্যাসে লিখেছিলেন — এ কথা বলার সময় এসেছে যে ঔপন্যাসিক ইশ্বর নন, কিন্তু তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ঔপন্যাসিকও (যিনি নিজের ইচ্ছায় বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন) এক অর্থে ইশ্বর-সদৃশ। তাঁর ‘এত অব রিজন’-এ ম্যাথু-র চিন্তায় ও সক্রিয়তায় তার স্রষ্টারই অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। তাই ডব্লু জে হার্ভে একটি প্রবন্ধে বলেছেন তাত্ত্বিক হিসাবে সার্ত্র শিল্পীর সর্বময়তার সমালোচনা করলেও নিজের সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই তত্ত্বকে নিজেই খণ্ডন করেছেন।

সার্ত্র মনে করেন লেখকের লক্ষ্য হল পাঠক-সমাজ, লেখক-পাঠক সমবায় সম্বন্ধেই লেখকের মনোজগতের সত্য বাস্তব রূপ লাভ করে। তিনি শিল্পীর সর্বময় প্রভুত্ব মানেন না বা লেখকের অটোনমি স্বীকার করেন না। তিনি পাঠক ও শিল্পরসিকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা মেনে নিয়ে বলেছেন এ কথা সত্য নয় যে কোনও সাহিত্যিক নিজের জন্য কোনও কিছু লেখেন এবং অপরের জন্য ছাড়া কোনও শিল্প বা সাহিত্য নেই। সার্ত্র-র নন্দনতত্ত্বে পাঠক বা শিল্পরসিকের এই গুরুত্বই তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা নীৎসে-ও ভাবেননি। তিনি বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে লেখককে স্বীকার করলেও তার সর্বময় প্রভুত্ব মেনে নেন নি। তাই লেখক ও পাঠক উভয়ের দায়িত্ব স্বীকার করলেও মূল ভার অর্পণ করেছিলেন পাঠকের উপর। তাঁর মতে লেখকের দায়িত্ব প্রকাশ করা, আর পাঠকের দায়িত্ব সৃষ্টি করা। এই ধারণা অনুযায়ী দস্তয়েভস্কি ‘ক্রাইম অ্যাণ্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসের  রাস্কলনিকভ-এর জন্মদাতা ঠিকই, কিন্তু তিনি চরিত্রটিকে কেবলমাত্র নিজের কল্পলোক থেকে বাইরের জগতের মানুষের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। আসলে রাস্কলনিকভ-এর প্রকৃত অস্তিত্ব পাঠকের হৃদয়ে। সার্ত্র-র এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে পাঠকের মনোলোকই সাহিত্যের প্রকৃত জন্মভূমি। তিনি মনে করেন ভাষায় সমর্পিত হবার পর লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি ক্রমে একটি বিশুদ্ধ বস্তুতে পরিণত হয়, যা পাঠকের মনের আলোয় আলোকিত হয়ে বিভিন্ন রূপে প্রতিভাত হয়। আসলে অস্তিত্ববাদী সার্ত্র সাহিত্যের কোনও absolute value মানেন না, তিনি ব্যক্তির চেতনলোককেই বস্তুর গুণাগুণ নির্ণয়ের প্রকৃত অধিকারী মনে করেন।

সার্ত্র-র কাছে পাঠকই প্রকৃত সাহিত্যস্রষ্টা, সুতরাং পাঠকের সঙ্গে ঐক্যেই চরিত্রের সার্থকতা। লেখক যখন নিজের রচনার রসগ্রহণ করতে বসেন তখন রচয়িতা হিসেবে তিনি যে অনুভূতির অধিকারী ছিলেন তা আর থাকে না, তখন আর সকলের মতোই তিনিও একজন সাহিত্যের বিচারক মাত্র। এই ধারণার উপর দাঁড়িয়ে সার্ত্র বলেন লেখক ও পাঠক উভয়ের সহযোগীতায় যে সাহিত্যজগত সম্পূর্ণতা লাভ করেন সেখানে যদিও লেখক নির্বাসিত নন, তা হলেও সাহিত্যের প্রকৃত অস্তিত্ব পাঠকের স্বীকৃতিতে।

নীৎসের কাছে সাহিত্য নিছক বাস্তবের অনুকরণ ছিল না। তিনি সাহিত্যের ভিতর ইহজগতেই এমন অলৌকিক সৌন্দর্য ও আনন্দের সন্ধান পেয়েছিলেন যেখানে ইশ্বর-বিযুক্ত পৃথিবীর অশান্ত মানুষ বিশ্রাম পেতে পারে। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক-সাহিত্যিক সার্ত্র-ও সাহিত্যের মধ্যে বিশৃঙ্খল জগতের সুবিন্যস্ত রূপ কামনা করেছিলেন। তিনি সাহিত্যিকের সমকাল-চেতনার গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন। পাশাপাশি এটাও স্বীকার করেছিলেন যে সাহিত্যের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হয় পাঠকের হৃদয়ে এবং পাঠকের সৃজন কৌশলের উপরেই সাহিত্যের অস্তিত্ব নির্ভর করে। অতএব তাঁর কাছে সাহিত্য বা শিল্প নিছক অনুকরণ নয়। তিনি যেমন নিমিত্ত্ববাদে আস্থাশীল ছিলেন না, তেমনি নন্দনতত্বেও রসিকের কাছে শিল্পের চরম মূল্য সন্ধান করেছিলেন।  তিনি আশা করেছিলেন সাহিত্যিকের জগত এমন হবে যা সংসারের সকল মানুষের কাছেই পরিচিত মনে হবে। তাই তো তিনি লিখেছেন — “The function of the writer is to act in such a way that nobody can be ignorant of the world and that nobody may say that he is innocent of what it is all about.”

সাহিত্য সম্বন্ধে নীৎসে ও সার্ত্র-র বক্তব্য থেকে কয়েকটি সাধারণ সিদ্ধান্তসূত্র পাওয়া যায়। প্রথমত, যদিও লেখক সমকাল-সচেতন, তবু সাহিত্যে তিনি এমন এক মায়ার জগত গড়ে তুলবেন যা হবে চির-পরিচয়ের মধ্যে নব-পরিচয়ের জগত। দ্বিতীয়ত, সাহিত্য বাস্তবের হুবহু অনুকরণ নয়। তৃতীয়ত, বিষয় নির্বাচনে স্বাধীন ইচ্ছাবিশিষ্ট সাহিত্যিক ইশ্বরের মতো স্বাধীন, তবে তাঁর সর্বজ্ঞতা ও সর্বময়তা স্বীকার্য নয়। চতুর্থত, সাহিত্যিক তাঁর সৃষ্টিকর্মকে দৃষ্টিগোচর করালেও সাহিত্যের প্রকৃত স্রষ্টা হচ্ছেন পাঠক, কারণ তার চেতনলোকেই সাহিত্যের প্রকৃত অস্তিত্ব। পঞ্চমত, সাহিত্যের রচয়িতা হিসাবে লেখকের স্বাধীনতা যতটা, সাহিত্যের আস্বাদক ও বিশ্লেষক হিসেবে পাঠকের স্বাধীনতা তার চেয়েও বেশি।

নীৎসে ও সার্ত্র উভয়েই প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার ও অর্থহীনতায় ভরা এই জীবনে সামগ্রিক ঐক্য সন্ধান করেছিলেন শিল্প-সাহিত্যের ইল্যুশনের জগতে। নীৎসের বক্তব্য ছিল এই জগতের যাবতীয় দুঃখকে ইল্যুশনের আবরণে আবৃত করে সহনীয় করে তুলতে হবে। এই ইল্যুশন সৃষ্টির প্রধান শিল্পরূপ হিসাবে তিনি ট্র্যাজেডিকে গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে সার্ত্র-র বিশ্বাস ছিল সাহিত্যের প্রকৃত জন্ম সত্য উপলব্ধির জগতে। তিনি পাঠকের মনের সৃজনধর্মের উপরশ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শিল্পের ক্ষেত্রে স্রষ্টার ভূমিকা সম্বন্ধে হেগেল যেরকম শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করতেন তা সার্ত্রর ছিল না। তবে সার্ত্র-র শিল্পী ঐক্যহীন ও খণ্ডীভূত জগতের বৈচিত্র্যের মধ্য থেকে কল্পনার সহায়তায় অখণ্ড শিল্পমূর্তি গড়ে তোলেন, implicit meaning of the world উদঘাটিত করেন এবং পাঠকের সৃজনশক্তি উদ্রেক করেন। মনে রাখতে হবে সার্ত্র সাহিত্যিকের ভূমিকাকে নগণ্য বলেননি, তবে তার শ্রেষ্ঠত্ব কিছুটা খর্ব করেছেন। আসলে তিনি মনে করেন পাঠক লেখকের থেকে কম স্বাধীন বা কম সৃজনশীল নয়।  অস্তিত্ববাদীরা সাহিত্যে সমকাল-চেতনা কামনা করেন, কিন্তু তথাকথিত বাস্তবের অনুকরণ পছন্দ করেন না। তাঁরা শিল্প-সাহিত্যের জগতে ইহলোকের নির্ভেজাল অনুকরণ সমর্থনযোগ্য মনে করেন না, অথচ কল্পনার স্বেচ্ছাবিহারও পছন্দ করেন না। অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল ভিত্তি জীবনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রিলকের প্রশ্নেই অস্তিত্ববাদীর প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছিল –  শুধু একবারের জন্য যে পৃথিবীতে এসেছি সেখানে হৃদয় যতই ব্যথিত হোক না কেন জীবনকে কি বরবাদ করা যায়? নীৎসে বা সার্ত্র কেউই তা চাননি। এই জীবনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই সার্ত্র বলেছিলেন সাহিত্যিকের দায়িত্ব তার পরিচিত জগতকেই মনের রসায়নে জারিত করে নতুন মূর্তিতে সামনে মেলে ধরা। নীৎসে ও সার্ত্র উভয়েই সাহিত্যিককে জীবনমুখী ও ইহসচেতন হতে বলেছেন। এই অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা জীবনের উপরিতলের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে শিল্পে সংহত করার পক্ষপাতী। যে মানুষকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা এবং আত্মসংগ্রামে লিপ্ত বলে মনে হয় সেই মানুষের জীবন শিল্পীমানসের ছোঁয়ায় নবপরিচয়ে সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে এটাই ছিল তাঁদের কামনা।

Your thoughts on this Post?

Facebook
Twitter
LinkedIn

Letest Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

Privious Cover Stories

জিজীবিষা 

সুরঞ্জিত সরকার সিন্দুকের দরজাটা আলগোছে ভেজিয়ে দিয়ে সুমন্ত দাদাকে নিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটার পেছনে ছায়ার মতো সরে গিয়ে লুকিয়ে গেল।

Read More »

অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

রঞ্জন চক্রবর্ত্তী স্বপ্ন ও বাস্তবকে নিয়ে সুররিয়ালিস্টদের যে জগত সেখানে আপাত সত্যের উপরেও ভিন্ন ধরণের সত্যের অস্তিত্ব আছে। তাঁদের কাছে যা দেখছি বা যা করছি

Read More »

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার : সাদেঘ হেদায়েত বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস পর্ব : পাঁচ আমার নিজের শরীর থেকে তার শরীরে উত্তাপ সঞ্চারিত করতে হবে। তাকে আমার প্রাণের উত্তাপ

Read More »