সুরঞ্জিত সরকার
দ্বিতীয় পর্ব
জৈষ্ঠ্য মাসের এক তপ্ত দুপুরের দিন।
চারিদিক খাঁ খাঁ করছে। একেবারে জনমানব শূন্য মরুপ্রান্তরে পান্থশালার মতন দোতলা বাড়িটা হাঁ করে অনাগত কারুর জন্য যেন অপেক্ষা করছে।
পূরবী দেবীর দুই নাতি সুমন্ত ও কল্যাণ প্রায় বছর পাঁচেক পরে এই বাড়িতে এসেছে। পিসতুতো দাদা কল্যাণ রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ভূমি দফতরের রাজস্ব আধিকারিককে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে গেছে। সুমন্ত দোতলার শয়নকক্ষে বসে অপেক্ষা করছে। দাদার আসতে দেরী হচ্ছে দেখে সুমন্ত ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে স্মৃতিচারণা করছে। এমন সময় পিছন থেকে পিঠের উপরে একটু নরম ঈষৎ শীতল স্পর্শ অনুভব করল। ভাঙ্গা গলায় কেউ জিজ্ঞেস করছে, “দাদু ভাই তুমি এসেছো? আমাদের কথা এতদিন পরে মনে পড়লো? সুনীপা আর তুমি ভাল আছো তো ? ” একমুহুর্তে সুমন্তর সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। তাঁর গলা চিনতে ভুল হল না। এ তাঁর ঠাম্মির আদুরে ডাক। কিন্তু ঠাম্মির তো এখানে থাকার কথা নয়! সে কি জবাব দেবে এই ভাবতে ভাবতে আবার একই ডাক সে শুনতে পেল, “কি! দাদুভাই কিছু খেয়েছো? ঘরে কেউ কিচ্ছু এনে রাখে না। কি যে দেবো তোমাকে”? আজ সুমন্তর পিছনে ফিরে তাকানোর মত সাহস নেই। একপ্রকার বিহ্বল অবস্থায় সুমন্ত ভয় মিশ্রিত গলায় উত্তর দিল, ” ঠাকুমা তোমাদেরকে কি কখনো ভুলতে পারি? কর্মজীবনের ঠেলায় অনেক দূরে চলে গেছি কিন্তু মনের দূরত্ব একবিন্দু বাড়ে নি। “
সুমন্তর ঠাকুমা দুঃখ করে বলল, ” দাদুভাই তোমার জন্য জৈষ্ঠ্যের খরা দুপুরে সেদিন অনেক অপেক্ষা করেছিলাম। ভেবেছিলাম একবার দেখা হবে। কিন্তু ভাগ্য আমার সাথ দেয় নি। তোমার দাদুকে খালি বলতাম, একবার ফোন করে কথা বলিয়ে দিতে। আমায় শুধু বলত, সুমন্ত এখন ভোটের কাজে ব্যস্ত । ভোট শেষ হলে একদিন ফোন করবে “।
এই কথা শুনে সুমন্তর চোখ ছলছল করে উঠল। সামনে দেওয়ালে টাঙানো ঠাকুমার ছবির দিকে অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে বলতে লাগল, “যেখানেই থেকো , ভাল থেকো ঠাম্মি। কিছু ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা কোরো।”
পিছন ফিরে তাকাতেই হতচকিয়ে দেখে কল্যাণদা ও দুজন অপরিচিত লোক দাড়িয়ে আছে। সুমন্তর দাদা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল , “তোকে কখন থেকে ডাকছিলাম। তুই কি সব বিড় বিড় করে বলছিলিস?”
দপ্তরের লোকজন সার্ভে করে চলে যাওয়ার পর সুমন্ত তাঁর দাদার দিকে বিস্ময় দৃষ্টে জানালো , ” জানো ঠাকুমা এসেছিল । অনেক দুঃখ কষ্টের কথা বলেছে আমাকে। প্রথমে খুব ভয় করছিল বটে। তারপর সব কথা শোনার পর মন খারাপ লাগছিল”।
একথা শুনে সুমন্তর দাদা হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, “বাইরে রোদের তাপটা কমেছে । চল, পাশের শম্ভু কাকুদের বাড়িতে দেখা করে ফিরে যাই”।
দুজনে সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে সুমন্ত বলে উঠল, “দেখেছো দাদা ভুলেই গেছিলাম। আজকের দিনে ঠাকুমা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ঠাকুমার ছবিটাতে একটা ফুলের মালাও দেওয়া হল না। সত্যিই আমরা অপদার্থ নাতিরা! “
কল্যাণ একটু ভেবে বলল, ” কি co-incidence রে ! আমি কয়েকদিন আগেও মনে করে রেখেছিলাম। কাজের চাপে সব ভুলে গেছি। তাহলে মনে হয় দিদা তোর কাছে ……”।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দোতলার ঘর থেকে কিছু একটা জিনিস ভাঙার শব্দ ভেসে এল। দুজনেই থমকে দাঁড়ালো। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ” কিরে আওয়াজটা শুনলি?
দাদা কল্যাণ মুখটা ফ্যাকাশে করে বলল, ” উপরে যাবি”? সুমন্ত বলল, ” চল একবার দেখে আসি”। দুজনেই উপরে উঠে দরজা পেরিয়ে ঢুকতে গিয়ে আচমকা কিছু একটা তড়িতের বেগে চলে যেতে অনুভব করল। ভয়ে দুই ভাই এর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে তখন। দুজনে শক্ত করে একে অপরের হাত ধরে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখে ঠাকুমার ছবিটা নীচে পড়ে আছে। চারিদিকে মেঝেতে কাচের টুকরোর ছড়াছড়ি। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলেও ঠাকুমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে সুমন্ত একটা ঝাড়ু দিয়ে কাচগুলোকে ঘরের একপাশে করতে লাগল। কল্যাণ দিদার ছবিটাকে টেবিলের উপর রেখে ঝুলবারান্দার রেলিং থেকে বিলের দিকে একমনে তাকিয়ে ভাবতে লাগল।
” ইট কাঠ পাথরের ইমারতগুলো রেখে,
একে একে সবাই চলে গেছে
কোন্ সে ভিন প্রানীদের গ্রহে;
অজানা জগতে হয়তো শান্তির খোঁজে।
আমরা রয়ে যাবো তপ্ত ধূসর রোদ মেখে
গোধূলির ম্লান পটে। কে জানে ?
কোন সে ভোরে আপনজনেরা বলবে ডেকে,
সময় হয়েছে । চল এবার ফিরে।”
কিছুক্ষন পর কল্যাণ ধড়ফড় করে সুমন্তর কাছে এসে বলল, ” ভাই আর একটু হলেই নীচে পড়ে যেতাম। রেলিং টা ধরে নীচের দিকটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ নড়বড় করতে করতে উপরের স্ল্যাবটার কিছু অংশ ভেঙে নীচে পড়ে গেল। আমি কোনক্রমে নিজেকে সামলে নিয়েছি। এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক লাগছে না। টেবিলের দিকে তাকিয়ে সুমন্তকে জিজ্ঞেস করল, তুই কি দিদার ছবিটা অন্য কোথাও রেখেছিস?”
সুমন্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জানাল , ” না তো “।
-” তাহলে ছবিটা গেল কোথায় ? ” দুজনের মনে তখন একটাই সংশয় তাহলে কি তারা এই বাড়িতে কোন অলৌকিক শক্তির কবলে পড়েছে ? এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে কোন আলোচনা না হলেও দুই ভাই তখন মনে মনে ঠাকুর নাম জপ করতে শুরু করেছে।
সুমন্ত জানালার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে। বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল, ” দাদা , তুমি কি লক্ষ্য করেছো? দক্ষিণ দিকের জানালাটা একটু আগে বন্ধ ছিল। এখন খোলা”।
কল্যাণ তাড়াতাড়ি করে গিয়ে জানলাটা আবার বন্ধ করে দিল। জানলা দরজা বন্ধ করার পর ঘর প্রায় অন্ধকার। পড়ন্ত বিকেলের কিঞ্চিত রোদের আলো জানালার কাচ দিয়ে ঘরে ঢুকছে। দুই ভাই নিচে নামার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ঠিক এই সময় দরজায় কড়া নাড়ার মত শব্দ শুনতে পেল। একটু ঘাবড়ে গিয়ে সুমন্ত নিজের মনে বলল , ” এ বাড়িতে আবার কে এলো ? বেরোতে পারলে বাঁচি বাবা ! তারপর যে খুশি আয়”। তাড়াতাড়ি করে দুজনে নীচে নেমে দরজা খুলতেই উঠোনে ঠাকুমার ছবিটা দেখতে পেল। কিন্তু কোনও লোক নেই।
কল্যাণ ছবিটা দেখে ভাবছে এটা এখানে কিভাবে এলো? এই উঠোনেই ঠাকুমাকে শেষ বারের মত শোয়ানো হয়েছিল। তাহলে দরজায় কে আওয়াজ করল? এসব ভেবে ভাতৃদ্বয়ের হাত পা একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। কতক্ষণে এই বাড়ি থেকে বাইরে বেরোবে সেই চিন্তা করছে। কল্যাণ মেঝের দিকে আঙুলের ইশারায় ভাইকে বলল, ” ঠাকুমার পায়ে শেষ বারের মত যে আলতা পড়ানো হয়েছিল এখনো সেই লাল দাগ রয়ে গেছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না “?
—–” সবার অলক্ষে এ বাড়িতে যে কিছু একটা ঘটে চলেছে, সে বিষয়ে আর কোন দ্বন্দ্ব নেই ” ।
একথা শুনে কল্যাণ ভাইকে বলল, ” সদলবলে একরাত থাকতে পারলে পুরো ঘটনার উদঘাটন করা যেত”। সুমন্ত দাদার হাতটা টেনে ধরে মেন গেটের দিকে যেতে যেতে বলতে লাগল , ” চল, পাশের বাড়িতে একবার কথা বলে ফিরে যাই। আমাদের সাথে আজ এমন সব ঘটনা ঘটল যে কাউকে বললে বিশ্বাস তো করবেই না উল্টে আমাদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে। এর চেয়ে বরং কাউকে কিছু না বলে বাড়িটা বিক্রী করে দেওয়াই ভাল হবে”।
—–” মন্দ বলিস নি । এত কিছু প্রত্যক্ষ করার পর এই বাড়িতে ভবিষ্যতে থাকাটা একটু চাপ হয়ে যাবে”। সকাল থেকে তীব্র গরমে দুই ভাইয়ের আনন একেবারে লোহিতবর্ণ হয়ে উঠেছে। জামাকাপড় ঘামে ভিজে জপজপ করছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে পূরবী ভবনের ভাঙ্গা লোহার মেন গেটটা তালা দিয়ে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল।
রুমাল দিয়ে শ্রান্ত দেহের স্বেদ মুছতে মুছতে দুজনেই শূন্য দৃষ্টিতে বাড়িটার দিকে আপাদমস্তক হাঁ করে তাকিয়ে আছে। এ বাড়ি নিজেরা না বানালেও পূর্বপুরুষের ভিটার প্রতি নিগূঢ় মায়াটানে পড়ে গেছে দুই ভাই। ” সবকিছুই একদিন ছেড়ে চলে যেতে হয়” এ কথা তারা মনে প্রানে বিশ্বাস করে। তাই বাড়ি বিক্রির বিষয়ে দুই ভাই সহমত। এতক্ষণে বাইরে গ্রীষ্মের দাবদাহ অনেকটা কমে গেছে। রাস্তা ঘাটে দু একটা টোটো রিকশা বেরোতে দেখা যাচ্ছে।
( চলবে )


